26/08/2026
একবার ভাবুন তো—আপনার সামনে এমন একজন মানুষ এসে দাঁড়িয়েছেন, যাঁকে আশ্রয় দিলে আপনার সাজানো সুখের সংসার, ধন-সম্পদ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এমনকি নিজের জন্মভূমি পর্যন্ত চরম ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অথচ এতকিছু জানার পরেও আপনি যদি তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন—'আপনি আসুন, আমাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আমরা আপনাকে আগলে রাখব'—তবে সেই অনুভূতির নাম কী?
মদিনা তখন আজকের মতো শান্ত, স্নিগ্ধ কোনো শহর ছিল না। আওস আর খাযরাজের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে জনপদটি তখন ক্ষতবিক্ষত, প্রতিটি ধূলিকণায় লেগে ছিল বংশপরম্পরার দীর্ঘশ্বাস আর প্রতিশোধের আগুন।
ঠিক এমন এক ক্রান্তিলগ্নে মক্কার গিরিপথে, আকাবার গভীর অন্ধকারে রচিত হলো এক ইতিহাস। ইয়াসরিবের কিছু ব্যাকুল হৃদয় প্রিয় নবীজি ﷺ-এর পবিত্র মুখ থেকে সত্যের বাণী শুনলেন। সেই ঘোর অমানিশায় তাঁরা এমন এক অঙ্গীকার করলেন, যার অপর পিঠে লেখা ছিল নিজেদের জীবনের ঝুঁকি; তারা অঙ্গীকার করেছিলেন নিজেদের পরিবার ও সন্তানের মতো করে নবীজিকে রক্ষা করবেন। সেই এক রাতের আত্মনিবেদনে বদলে গেল তাঁদের চিরচেনা পরিচয়—গোত্রীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁরা হয়ে উঠলেন আসমানের অধিপতির নিকটজন। ইতিহাস তাঁদের স্মরণে রাখল 'আনসার' নামে।
হিজরতের পর মক্কার মুহাজিররা যখন একে একে মদিনায় এলেন, তাঁদের সম্বল বলতে ছিল কেবল চোখের পানি আর বুকে জমা একরাশ ক্লান্তি। অর্থ-সম্পদ, ভিটেমাটি, ব্যবসা, চেনা পরিজন—সব পেছনে ফেলে জাগতিক ভাবে সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁরা।
কিন্তু মদিনা তাঁদের পরদেশি হতে দিল না। আনসাররা তাঁদের জন্য শুধু ঘরের দরজাই খোলেননি, উজার করে দিয়েছিলেন হৃদয়ের সবটুকু মায়া। সা‘দ ইবনে রাবী (রা.) যখন তাঁর মুহাজির ভাই আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-কে বললেন, “আমার সমুদয় সম্পত্তির অর্ধেক আজই আপনি নিজের করে নিন। এমনকি আমার দুই স্ত্রীর মধ্যে যাঁকে আপনার পছন্দ হয় বলুন, আমি সানন্দে তাঁকে তালাক দিয়ে দেব—যেন ইদ্দত শেষে আপনি তাঁকে বিয়ে করে নতুন সংসার পাততে পারেন”—তখন মদিনার আকাশ এক অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয় ত্যাগের সাক্ষী হয়েছিল।
একবার সা‘দ (রা.)-এর জায়গায় নিজেকে কল্পনা করুন—রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি কতখানি ভালোবাসা থাকলে একজন মানুষ সারাজীবনের অর্জিত সম্পদ এক নিমিষে এভাবে ভাগ করে দিতে পারে!
আসলে ভালোবাসার গভীরতা সুখের দিনে মাপা যায় না; তার আসল ওজন টের পাওয়া যায় কঠিনতম সংকটের মুহূর্তে। হুনাইনের প্রান্তরে যখন যুদ্ধের তীব্রতায় চারপাশ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল, মুহূর্তেই আনসারদের বজ্রকঠিন ‘লাব্বাইক’ ধ্বনি আর অটল বীরত্বে রচিত হয় ঘুরে দাঁড়ানোর এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস।
যুদ্ধ শেষে যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী মক্কার নওমুসলিমদের মাঝে গনীমতের উট ও বকরির একটি বড় অংশ বণ্টন করলেন, তখন আনসার তরুণদের কারো কারো মনে নিঃশব্দে এক চিলতে কষ্টের ছায়া পড়ল। নবীজি ﷺ বিষয়টা বুঝতে পেরে পরম স্নেহে তাঁদের কাছে ডেকে মায়াভরা কণ্ঠে বললেন, “হে আনসাররা! সারা দুনিয়া যখন উট আর বকরির পাল নিয়ে ঘরে ফিরবে, তোমরা কি তখন আল্লাহর রাসূলকে সাথে নিয়ে ঘরে ফিরতে খুশি নও?”
সেদিন আনসারদের চোখের পানিতে দাড়ি ভিজে গিয়েছিল। ভালোবাসার চূড়ান্ত স্বীকৃতি দিয়ে নবীজি ﷺ ঘোষণা করলেন—“গোটা দুনিয়া যদি একদিকে যায় আর আনসাররা অন্য উপত্যকা বেছে নেয়, তবে আমি মুহাম্মাদ আনসারদের উপত্যকাতেই হাঁটব।”
আনসারদের ত্যাগ আর আত্মনিবেদনের গল্পগুলো আসলে শুধুই ইতিহাসের পাঠ নয়; এগুলো আমাদের অন্তরে এক তীব্র আলোড়ন তোলে। হৃদয়ের কোনো এক নিভৃত কোণ থেকে হঠাৎ একটি আকুল প্রশ্ন ভেসে আসে—
আমি যদি সেদিন মদিনার ধূলিমাখা পথে দাঁড়িয়ে থাকতাম?
যদি প্রিয় নবীজি ﷺ ক্লান্ত পায়ে আমার মাটির দরজায় এসে করাঘাত করতেন?
আমি কি পারতাম আমার সমস্ত পার্থিব প্রাচুর্য, নিরাপত্তা আর সংসার এক নিমেষে তাঁর পায়ের নিচে সঁপে দিতে?
হয়তো এই ভাবনাই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক বেদনা জাগিয়ে তোলে। মনের অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে হৃদয় বলে ওঠে—ইশ! আমিও যদি সেদিন মদিনায় থাকতাম, আমিও যদি থাকতাম আনসার সাহাবীগণের দলে!
তথ্যসূত্র:
সহিহ বুখারি: হাদিস ৩৭৮১ (মুওয়াখাত প্রসঙ্গ)
সহিহ বুখারি: হাদিস ৪৩৩০, ৪৩৩২ (হুনাইনের ঘটনা ও আনসারদের মর্যাদা)
সহিহ বুখারি: হাদিস ৩৭৮৫ (আনসারদের প্রতি ভালোবাসা)
সীরাত ইবনে হিশাম ও আর-রাহীকুল মাখতূম (হিজরত ও মদিনার সামাজিক প্রেক্ষাপট)