15/08/2026
বৃষ্টিভেজা_রাত
নওশীন জেরীন
সূচনা পর্ব
"এক্সকিউজ মি মিস, আপনি বোধহয় আমার সিটে বসেছেন।"
আযান হলো কিছুক্ষণ আগে। বাসের জানালায় হেলান দিয়ে বসে থাকা ইরিনের ধ্যান ভাঙে অপরিচিত পুরুষালি কন্ঠস্বর পেয়ে। চোখ তুলে তাকালো ও, কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক৷ এক কাধে ব্যাগ নিয়ে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সে ওকে এমনভাবে দেখছে যেন ও এক অবাক বিষ্ময়। এই বিষ্ময়ের কারণ ইরিনের মস্তিষ্ক অবধি যায় না৷
"এক্সকিউজ মি, আপনাকে বলছিলাম।"
পুনরায় যুবকটির কথায় ইরিনের ধ্যান ভাঙলো দ্বিতীয়বারের মতো। ও যুবকটির দিকে পূর্ণদৃষ্টি স্থাপন করে বললো, "আসলে বাসে উঠে জানালার পাশে না বসলে আমার বমি আসে। আপনি যদি কষ্ট করে একটু ওখানে বসেন, তবে আমার সুবিধা হতো।"
যদিও কথাটি একেবারেই সত্যি নয়। আসল কারণটি ছিল জানালার পাশে বসে প্রকৃতি দেখা। বিপরীতে থাকা মানুষটির প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ও। কিন্তু যুবকটি সে-রকম কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে কেবলমাত্র "ইট'স ওকে" বলে পাশের সিটে বসে পড়লো। ইরিনও আর কিছু বলার প্রয়োজনব
বোধ করলো না। প্রকৃতি দেখায় মনোনিবেশ করলো।
ভার্সিটির ছুটিতে যশোরে খালামণির বাসায় ঘুরতে এসেছিল ইরিন। ইচ্ছে ছিল আরো কয়েকদিন থেকে যাওয়ায় কিন্তু আগামী পরশু পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে বিধায় আজই ঢাকা ফেরত যেতে হচ্ছে।
গড়াই নদীর উপরের ব্রীজ পার হওয়ার কিছুক্ষণ পরই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি, সন্ধ্যা ছয়টা বেজে গিয়েছে অথচ বৃষ্টি থামার কোনো নাম-গন্ধ নেই। "অবশ্য ভালোই হয়েছে, বাসে বসে বসে বৃষ্টি বিলাশের অভিজ্ঞতাটাও হয়ে গেল আমার।" এমন চিন্তা করেই নিজের মনতে স্বান্তনা দিল ইরিন। বৃষ্টির কারণে পরিবেশটা বেশ ঠান্ডা হয়ে উঠেছে। হঠাৎই শরীরে ঈষৎ কাঁপুনি দিয়ে দিয়ে উঠলো।
পায়ের কাছে থাকা ব্যাগ থেকে একটা মোটা কাপড়ের ওড়না বের করার জন্য উদ্যোত হতেই ইরিনের নজর গেল পাশে বসে থাকা যুবকটির ঘুমন্ত মুখশ্রী। আবারো কিছুক্ষণ যুবকটিকে নিয়ে গবেষণা করা শেষ ইরিনের কাছে মনে হলো, ছেলেটা দেখতে খুব একটা খারাপ না, ভালোই বলা চলে।
কিন্তু হঠাৎই এক কান্ড ঘটে গেল। যুবকটি চোখ খুললো, ইরিনকে নিজের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে বেশ বিব্রত হলো। ভ্রু কুঁচকে বললো, "কিছু বলবেন?"
কিছুক্ষণের জন্য মস্তিষ্ক যেন কাজ করান বন্ধ করে দিল। আহাম্মকের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ও বললো, "না কিছুনা।"
এটুকু বলেই আবারো জানালার দিকে মুখ করে গায়ে ভালোভাবে চাদর জড়িয়ে নিলো। যদি ইরিন একবার ডানে ফিরত তাহলে বোধহয় ও যুবকটির ঠোঁটে এক চিলতে হাসি দেখতে পেত।
নিজের সহকর্মী অফিসার ডাক্তারদের সাথে ক্যাম্পিংয়ের জন্য যশোর এসেছিল আরশ। সকলে একসাথে হাসপাতালের নিজস্ব বাসে করে আসায় নিজের গাড়িটা আনা হয়নি ওর। এদিকে, হঠাৎ করেই বাবা বলে উঠলেন পরশু মেয়ে দেখতে যাবেন। তাইতো একপ্রকার বাধ্য হয়ে বাসে করে ফিরতে হচ্ছে। কিন্তু বাসে উঠে যে এত বড় চমক পেতে হবে সেটা বোধহয় ও কল্পনা করেনি।
যে মেয়েটির সাথে ওর বিয়ের কথাবার্তা চলছে সে আর কেউ নয় বরং ইরিন। আরশের বড় বোন একবার ইরিনের ছবি দেখিয়েছিলো বিধায় ও ইরিনকে চিনতে পেরেছে। যদিও পরমুহূর্তেই আরশ বুঝতে পারলো যে ইরিন ওকে চেনেনি। তাই আরশ নিজেও আর কথা বাড়ায়নি। কি দরকার দীর্ঘ সময়ের এই যাত্রাপথে মেয়েটাকে অস্বস্তিতে ফেলার?
সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি যশোর। মাগুরা যাওয়ার পথে দু'প্রান্তে থাকা সারি সারি গাছগুলো যেকোনো পথচারীর দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হবে, যেটা হয়েছে ইরিনের ক্ষেত্রে। গত আধা ঘন্টা যাবৎ ও বাহিরের গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে অথচ ওর খেয়ালই নেই যে আরশও অনেকক্ষণযাবৎ ওকেই দেখেই চলেছ।
আরশ ইরিনকে উদ্দেশ্য করে বললো,"আপনাকে বোধহয় আমি চিনি।"
আগুন্তকের প্রশ্নে ইরিন বেশ অবাক হয়। বেশ কৌতূহল নিয়ে ও জিজ্ঞেস করলো,"আমাকে কীভাবে চেনেন?"
"আপনি ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে যান প্রায়ই, তাইনা?"
ইরিনের কপালে ভাজ পরছে, কৌতূহল আরও বাড়ছে৷ আবারো জিজ্ঞেস করলো,"হ্যাঁ কিন্তু আপনি কীভাবে জানেন?"
"আমি সেখানকার ডাক্তার। আপনাকে সেখানে এত বেশি দেখেছি যে চেহারা খুব ভালোভাবে মনে আছে।"
ইরিনের ফুপি অসুস্থ অনেক দিন যাবৎ। তাকে দেখতে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই হাসপাতালে যায় ইরিন। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,"আপনি ডাক্তার?"
অপর পাশ থেকে উত্তর এলো,"হ্যাঁ।"
এই স্বল্প কথপোকথনের মধ্যে দিয়েই পরিচিত হলো আরশ আর ইরিন। কথা থামলো, বৃষ্টির বেগ আগের থেকে বাড়লো। বৃষ্টি হতেই রইলো।
মাগুরার ভায়না মোড় পার হতেই ইরিনের ফোনে ইলার কল এল। ইলা ওর মামাতো বোন, বয়সে চার বছরের ছোট চটপটে স্বভাবের মেয়ে সে। কল রিসিভ করেই ইরিন বললো," বল। "
"আপু , আরশ ভাইয়ার ছবি দেখলাম আজ।"
"কেমন দেখলি?"
"তোকে ছবি পাঠিয়ে দিই?"
"প্রয়োজন নেই। পরশু সামনাসামনি দেখবো। তুই বল তোর কেমন লেগেছে?"
"আমার কেমন লেগেছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয় আপু।"
"ফর্সা ছেলে আমার পছন্দ নয়, ইলা।"
"সে শ্যাম পুরুষ।"
"আমি পাশে দাঁড়ালে আমাকে কি খাটো লাগবে?"
"আপু! আমি শুধু ছবি দেখেছি।এখন কত লম্বা সেটা আমি কীভাবে জানবো?
" শেষ একটা প্রশ্নের উত্তর দে। ছেলেটার কি ভুঁড়ি আছে?"
ইরিনের এমন উদ্ভট প্রশ্ন শুনে আরশর কাশি উঠে
যাওয়ার উপক্রম। ফোনে ইরিনের বলা কথাগুলো শুনেই আরশের আর বুঝতে বাকি ছিল না যে ওকে নিয়েই কথা হচ্ছে। কিন্তু এই মেয়ে এতো যে ত্যাড়া হবে তা আরশ কল্পনাও করতে পারে নি। আর কিছুক্ষণ এসব শুনতে থাকলে বোধহয় এই বাসের মাঝে, ইরিনের পাশেই ওকে অক্কা পেতে হবে।
চলবে।