03/05/2026
অসাধারণ গল্প।
আমার মা আমাকে ৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে এক অচেনা বৃদ্ধ লোকের সাথে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন।
আমি ভেবেছিলাম, ওই দিনটাই আমার জীবনের শেষ দিন—এর পর যা আসবে, তা শুধু সহ্য করা…
কিন্তু আমি একটুও বুঝতে পারিনি, বিয়ের প্রথম রাতেই এমন একটা সত্য আমার সামনে আসবে… যা আমার পুরো পৃথিবীটাই উল্টে দেবে।
আমার নাম তানিয়া। বয়স তখন মাত্র ২১।
আমি সিলেটের এক ছোট্ট গ্রামের মেয়ে—যেখানে বৃষ্টি বেশি, কিন্তু মানুষের ভাগ্যে সুখ খুব কম।
আমাদের বাড়িটা ছিল টিনের চালের, চারদিকে কাঁদা মাটির উঠান। বাবা পাঁচ বছর আগে স্ট্রোক করে মা**রা যান। তখন থেকেই সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ে মায়ের ওপর। মা মানুষের বাসায় বাসায় গিয়ে কাজ করতেন—কখনো বাসন মাজতেন, কখনো কাপড় ধুতেন, কখনো রান্না করতেন।
আমরা তিন ভাইবোন। আমি বড়। আমার ছোট ভাই স্কুলে পড়ে, আর ছোট বোনটা তখনও প্রাইমারিতে।
দারিদ্র্য শুধু আমাদের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেনি…
সে ভেতরে ঢুকে পড়েছিল।
আমাদের হাঁসফাঁস করা শ্বাসে মিশে গিয়েছিল।
বাড়িভাড়া বাকি, বাজারের দেনা, ভাইয়ের পড়ার খরচ—সব মিলিয়ে মা একেবারে ভেঙে পড়ছিলেন। রাতে ঘুমানোর আগে আমি অনেকবার দেখেছি, মা চুপচাপ কাঁদছেন।
একদিন দুপুরে, আমাদের বাড়িতে এক মহিলা এলেন—রহিমা খালা।
তিনি গ্রামের অনেক সমস্যার “সমাধান” করেন বলে সবাই জানে।
তিনি এসে মায়ের সাথে অনেকক্ষণ ফিসফিস করে কথা বললেন। আমি দূর থেকে দেখছিলাম।
কিছুক্ষণ পর মা আমাকে ডাকলেন।
“তানিয়া, এইদিকে আয়।”
আমি গিয়ে দাঁড়ালাম। রহিমা খালা আমাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নিলেন।
তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“মেয়ে সুন্দর। ভাগ্য খুলে যাবে।”
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“কি বলতেছেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
মা চোখ নামিয়ে রাখলেন।
রহিমা খালা বললেন,
“শহরে একজন ভদ্রলোক আছেন। বয়স একটু বেশি। বিয়ে করেন নাই। উনার দেখাশোনা করার জন্য একটা মেয়ে লাগবে। বিয়ে করেই নিবেন। বিনিময়ে ৫ লক্ষ টাকা দিবেন।”
আমার মাথা ঘুরে উঠল।
“মানে? আমাকে বি*ক্রি করবেন?”
মা তখনও চুপ।
আমি চিৎকার করে উঠলাম,
“আমি কি মানুষ না? আমার কোনো ইচ্ছা নাই?”
মা কাঁপা গলায় বললেন,
“তুই বুঝবি না তানিয়া… আমরা শেষ হয়ে গেছি।”
সেদিন আমি অনেক কেঁদেছিলাম।
মাকে অনেক কথা বলেছিলাম—যা কোনো মেয়ের বলা উচিত না।
কিন্তু রাতে…
আমি দেখলাম মা একা বসে আছে, অন্ধকারে।
তার চোখে পানি, ঠোঁটে দোয়া।
“আমি আর পারতেছি না আল্লাহ…”
এই কথাটা শুনে আমার বুকটা কেঁপে উঠেছিল।
সেই মুহূর্তে আমি বুঝেছিলাম—
এই সিদ্ধান্তটা মা নিজের জন্য নেয়নি।
পরের সপ্তাহেই বিয়ে ঠিক হয়ে গেল।
বিয়েটা খুব সাদামাটা ছিল।
না ছিল ঢাকঢোল, না ছিল আত্মীয়-স্বজনের ভিড়।
শুধু একটা কাবিন, দুইজন সাক্ষী, আর কিছু শুকনো মুখ।
আমি বিয়ে করলাম—মোঃ ইমরান সাহেবকে।
উনি আমার বাবার বয়সী।
চুল পাকা, মুখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু চোখে অদ্ভুত শান্তি।
আমি একবারও উনার দিকে ঠিকমতো তাকাইনি।
মনের মধ্যে শুধু একটাই কথা ঘুরছিল—
“আমাকে বিক্রি করা হয়েছে…”
বিয়ের পর আমাকে শহরে নিয়ে যাওয়া হলো।
উনার বাড়ি দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।
দোতলা বাড়ি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, চারদিকে নীরবতা।
সবকিছুই সুন্দর…
কিন্তু আমার কাছে সবকিছুই অচেনা আর ভ*য়ংকর লাগছিল।
রাতে, একজন কাজের মহিলা আমাকে একটা রুমে নিয়ে গেলেন।
“এইটাই আপনার রুম,” বলে তিনি চলে গেলেন।
আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল।
আমি জানতাম “প্রথম রাত” মানে কী।
ভয়ে আমার বুক কাঁপছিল।
ধীরে ধীরে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম।
কিন্তু ভেতরে ঢুকে আমি থমকে গেলাম।
রুমটা শান্ত…
বিছানা গুছানো…
নরম আলো জ্বলছে…
আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার—
উনি সেখানে নেই।
বিছানার পাশে একটা টেবিল।
তার ওপর এক কাপ গরম চা…
আর একটা সাদা খাম।
খামের ওপর লেখা—
“তানিয়া, ভয় পেও না।”
আমার বুক ধড়াস করে উঠল।
আমি ধীরে ধীরে খামটা খুললাম।
ভেতরে একটা চিঠি।
“আমি জানি, তুমি এই বিয়েতে রাজি ছিলে না।
আমি জানি, তুমি হয়তো আমাকে ঘৃণা করছো।
কিন্তু সত্যিটা না জানার আগে আমাকে বিচার কোরো না।
আমি তোমাকে কিনিনি।
আর তোমার কাছ থেকে কোনো কিছু জোর করে নেওয়ার ইচ্ছে আমার নেই।
তুমি চাইলে এখনই চলে যেতে পারো। দরজা খোলা আছে।”
আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল।
ঠিক তখনই বাথরুমের দরজা খুলল।
আমি চমকে উঠলাম।
ইমরান সাহেব বের হয়ে এলেন।
আমাকে দেখে থেমে গেলেন।
“আমি দুঃখিত… তোমাকে ভ*য় পাইয়ে দিয়েছি,” তিনি শান্ত গলায় বললেন।
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
তিনি দূরে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন।
“আমি এখানে বসি? আমি কাছে আসবো না।”
আমি আস্তে করে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলাম।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম—
“তাহলে… কেন এই বিয়ে?”
তিনি গভীর একটা শ্বাস নিলেন।
তারপর বললেন—
“কারণ আমার সময় খুব কম।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
“আমি ক্যা*ন্সারে আক্রান্ত,” তিনি শান্তভাবে বললেন।
“শেষ স্টেজ।”
আমার চারপাশ যেন ঘুরতে লাগল।
“আমার একজন স্ত্রীর দরকার ছিল না,” তিনি বললেন।
“আমার দরকার ছিল একজন… যাকে আমি আমার সবকিছু দিয়ে যেতে পারি। আর একটা সত্য… যা আমি এতদিন লুকিয়ে রেখেছি।”
সেই রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে…
আমি আর কাঁদিনি।
কারণ আমি বুঝতে শুরু করছিলাম—
এই গল্পটা শুধু বি*ক্রি হয়ে যাওয়া একটা মেয়ের না…
এটার ভেতরে আরও কিছু আছে।
আর সেই “কিছুটা”ই হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হয়ে উঠতে চলেছে…
চলবে...
সময়ের_চিঠি
পর্ব ০১
The_Story_Haven
আজকেই দ্বিতীয় পর্ব পোস্ট করা হবে পেজটি ফলো করে রাখুন তাহলে দ্বিতীয় পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে দ্বিতীয় পর্ব পেয়ে যাবেন।