22/07/2026
আমার স্ত্রী মারিয়ামের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে।
রাতে ঘুমানোর আগে পুরো বাসার সব দরজা-জানালা অন্তত তিনবার পরীক্ষা করে।
আমি মাঝেমধ্যে বিরক্ত হয়ে বলি,
—“চোর যদি আসতেই চায়, তোমার তিনবার চেক করা দেখে ফিরে যাবে নাকি?”
সে হেসে উত্তর দেয়,
—“চোরের জন্য না।”
—“তাহলে?”
সে কখনো উত্তর দেয় না।
শুধু প্রধান দরজার লকটা আরেকবার টেনে দেখে।
⸻
বিয়ের চার বছর হয়ে গেছে। এর মধ্যে কোনো দিন তাকে দরজা খোলা রেখে ঘুমাতে দেখিনি।
একদিন মজা করে জিজ্ঞেস করলাম,
—“এত ভয় পাও কেন?”
সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“ছোটবেলায় একবার মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখি, আমাদের বাসার প্রধান দরজা পুরো খোলা।”
—“তারপর?”
—“সকালে সবাই বলল, হয়তো ঠিকমতো বন্ধ করা হয়নি। কিন্তু আমি নিশ্চিত… রাতে দরজা বন্ধই ছিল।”
আমি হেসে বললাম,
—“তুমি স্বপ্ন দেখেছিলে। মাঝেমধ্যে এমন মনে হয়। একেবারে রিয়েল যেন।”
সে ইতস্ততভাবে মাথা নেড়ে বলল,
—“হতে পারে।”
কিন্তু তার চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, সে নিজেও কথাটা বিশ্বাস করতে পারছে না।
⸻
সেদিন অফিস থেকে ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেল।
রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা।
কলিংবেল বাজাতেই মারিয়াম দরজা খুলল।
কিন্তু আজ তার মুখে সেই পরিচিত হাসিটা নেই।
আমি জুতা খুলতে খুলতেই বললাম,
—“কী হয়েছে?”
সে আস্তে করে বলল,
—“আজ দুপুরে কেউ দরজায় নক করেছিল।”
—“খুলেছিলে?”
—“না।”
—“তাহলে?”
সে আমার দিকে তাকাল।
—“বাইরে থেকে তোমার গলায় ডাকছিল।”
আমার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল।
—“আমার গলায়?”
—“হ্যাঁ। একদম তোমার মতো। বলছিল, ‘মারিয়াম, দরজা খোলো।’”
আমি হেসে উড়িয়ে দিতে চাইলাম।
—“কারও প্র্যাঙ্ক হবে।”
সে মাথা নেড়ে বলল,
—“তুমি তো তখন অফিসে ছিলে।”
আমি আর কিছু বললাম না।
⸻
পরদিন রাত।
ঘড়িতে প্রায় দুইটা।
হঠাৎ কলিংবেলের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল।
টিং… টং…
টিং… টং…
আমি বিরক্ত হয়ে উঠে বসলাম।
—“এত রাতে আবার কে?”
মারিয়াম আমার হাত শক্ত করে চেপে ধরল।
ফিসফিস করে বলল,
—“যেও না।”
—“দেখে তো আসি।”
—“না।”
তার কণ্ঠে এমন ভয় ছিল, যে আমি থেমে গেলাম।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে আমার নিজের গলা ভেসে এল।
—“মারিয়াম… দরজা খোলো।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
কারণ…
আমি তো তখন তার পাশেই বসে আছি।
আমরা দুজনেই নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনতে লাগলাম।
বাইরে আবার সেই গলা।
—“আমি এসেছি।”
আমি সাহস করে দরজার কাছে গিয়ে আইহোলে চোখ রাখলাম।
কেউ নেই।
একেবারেই কেউ নেই।
কিন্তু গলাটা এবার আরও কাছে শোনা গেল।
ঠিক দরজার ওপাশ থেকে।
—“খুলে দাও…”
আমি তাড়াতাড়ি সরে এলাম।
সারা রাত আর ঘুম হলো না।
⸻
এরপর থেকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই একই ঘটনা ঘটতে লাগল।
রাত দুইটা থেকে তিনটার মধ্যে।
প্রথমে কলিংবেল।
তারপর আমার নিজের গলা।
মাঝে মাঝে মারিয়ামের গলাও।
এক রাতে তো শুনলাম, সে নিজেই বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
—“দরজাটা খোলো… আমি বাইরে আটকে গেছি…”
আমি পাশে তাকিয়ে দেখি, আসল মারিয়াম আমার কাঁধে মুখ গুঁজে কাঁপছে।
⸻
অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম, একটা ক্যামেরা লাগাব।
পরদিন অফিস থেকে ফিরে দরজার সামনে মোশন ক্যামেরা বসিয়ে দিলাম। সেই রাতেও ঠিক দুইটা বেজে সাত মিনিটে কলিংবেল বাজল। কিন্তু আমরা কেউ দরজা খুললাম না। সকালে উঠে ক্যামেরার ফুটেজ চালালাম।
ভিডিওর শুরুতে কিছুই নেই।
হঠাৎ কলিংবেল নিজে থেকেই বেজে উঠল।
তারপর…
ধীরে ধীরে ফ্রেমের একেবারে বাঁ দিক থেকে একজন মানুষ হেঁটে এল।
আমার মতো উচ্চতা।
আমার মতো হাঁটা।
আমার মতো মুখ।
সে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসল।
তারপর…
সে কলিংবেল চাপল না।
বরং খুব আস্তে করে ক্যামেরার দিকে মুখ এনে বলল,
—“ভেতরে যে আছে… সে কে?”
ভিডিওটা সেখানেই শেষ।
⸻
আমি আর মারিয়াম সেদিনই বাসা ছেড়ে অন্য জায়গায় উঠে গেলাম।
পুরোনো ফ্ল্যাটে আর কোনো দিন ফিরিনি। প্রায় ছয় মাস পরে নতুন বাসায় এক রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল।
কারণ…
কলিংবেল বাজছে।
টিং… টং…
আমি ধীরে ধীরে দরজার কাছে গিয়ে আইহোলে চোখ রাখলাম।
বাইরে কেউ নেই।
ঠিক তখনই…
আমার পকেটের ফোনটা কেঁপে উঠল।
নোটিফিকেশন।
পুরোনো বাসার সেই ক্যামেরা—যেটা আমি খুলেই এনেছিলাম বলে নিশ্চিত ছিলাম—সেখান থেকে লাইভ অ্যালার্ট এসেছে।
কাঁপতে কাঁপতে ভিডিও খুললাম।
অন্ধকার ফ্ল্যাট। নিঃশব্দ ড্রয়িংরুম।
তারপর…হটাৎ ক্যামেরার সামনে কেউ এসে দাঁড়াল।
সে আমি।
একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
ধীরে ধীরে ঠোঁট নড়ল। “এত দিন কোথায় ছিলে?”
তারপর স্ক্রিনটা নিজে থেকেই কালো হয়ে গেল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে…
আমাদের নতুন বাসার প্রধান দরজায় খুব আস্তে করে তিনবার নক পড়ল।
ঠক…
ঠক…
ঠক…
“দরজার ওপাশ”
লেখা: নাবিলা নোশিন সেজুতি