22/08/2026
আমাদের দু‘আর তালিকায় কত কিছু আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় চাওয়াগুলো কি আছে?
আল্লাহর কাছে আমরা চাকরি চাই, ভালো ফল চাই, বিয়ে চাই, সন্তান চাই, সুস্থতা চাই, ব্যবসায় উন্নতি চাই। এগুলো চাওয়া ভুল নয়। বরং নিজের ছোট বড় প্রয়োজন নিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া একজন মুমিনের সৌভাগ্য। কিন্তু কখনো কি খেয়াল করেছেন, দুনিয়ার প্রয়োজনগুলোর ভিড়ে এমন কিছু চাওয়া আমাদের দু‘আ থেকে প্রায় হারিয়ে যায়, যেগুলো দুনিয়ার জীবন শেষ হওয়ার পরও আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে?
জান্নাতের কথা শুনলে ভালো লাগে, কিন্তু শেষ কবে সরাসরি বলেছি, “হে আল্লাহ, আমাকে জান্নাত দিন”? জাহান্নামের কথা শুনে ভয় পাই, কিন্তু কতবার আল্লাহর কাছে তার আগুন থেকে আশ্রয় চেয়েছি? কঠিন কাজ সামনে এলে মানুষের সাহায্য, নিজের preparation, নিজের ability সবকিছুর কথা মনে পড়ে, কিন্তু বুক প্রশস্ত করে কাজ সহজ করে দেওয়ার জন্য আল্লাহকে ডাকি তো?
আজ এমন ৬টি দু‘আ মনে রাখি, যেগুলোর মধ্যে একজন মুমিনের দুনিয়া ও আখিরাতের অসাধারণ কিছু চাওয়া একসঙ্গে পাওয়া যায়।
একটি কথা শুরুতেই পরিষ্কার রাখা জরুরি। এই ছয়টি দু‘আর সবগুলোকে “প্রতিদিন নির্দিষ্ট এতবার পড়তেই হবে” এমন একটি সুন্নাহর তালিকা মনে করবেন না। কিছু কুরআনের দু‘আ, কিছু হাদিসে শেখানো দু‘আ এবং কিছু দু‘আর বিশেষ প্রসঙ্গও রয়েছে। তাই বানানো কোনো সংখ্যা বা ফজিলত যোগ না করে, অর্থ বুঝে নিজের দু‘আর ভাণ্ডারে রাখুন।
১. জান্নাতকে শুধু স্বপ্ন নয়, দু‘আ বানান
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ
আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল জান্নাহ।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই।
জান্নাত চাওয়া এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়ার এই সহজ ভাষা নববী দু‘আয় এসেছে। আর সহিহ বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে তিনবার জান্নাত চায়, জান্নাত তার জন্য আল্লাহর কাছে প্রবেশের দু‘আ করে। এখানে ফজিলতটি জান্নাত তিনবার চাওয়ার ব্যাপারে; কোনো একটি নির্দিষ্ট ছোট বাক্যকে বাধ্যতামূলক formula বানানোর প্রয়োজন নেই।
একটু ভাবুন, আমরা একটা ভালো বাড়ির জন্য কত পরিকল্পনা করি। কোন দেশে থাকব, কোন এলাকায় বাড়ি হবে, ঘর কেমন হবে—এসব নিয়েও স্বপ্ন দেখি। অথচ এমন একটা আবাস আছে যেখানে আর অসুস্থতা নেই, বিচ্ছেদ নেই, ভয় নেই, মৃত্যু নেই। সেই জান্নাতকে শুধু “আশা করি পাব” বলে দূরে রাখবেন না।
আল্লাহর কাছে চেয়ে নিন।
২. জাহান্নামকে শুধু ভয় পাওয়ার বিষয় বানাবেন না
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ
আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনান নার।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি জাহান্নামের আগুন থেকে আপনার আশ্রয় চাই।
সহিহ বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি তিনবার আগুন থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায়, জাহান্নাম তার জন্য আল্লাহর কাছে নাজাতের দু‘আ করে।
কখনো কোনো গুনাহের আগে এই কথাটা মনে আনুন। যে চোখ দিয়ে হারাম কিছু দেখতে যাচ্ছি, যে জিহ্বা দিয়ে গীবত করতে যাচ্ছি, যে সম্পর্কের দিকে এগোচ্ছি, যে অন্যায় আয়কে “এতটুকু কিছু হবে না” বলে হালকা করছি—আমি তো একই সঙ্গে আল্লাহর কাছে বলছি, “আমাকে আগুন থেকে বাঁচান।”
তাহলে নিজের কাছেই প্রশ্ন আসে, যে আগুন থেকে বাঁচতে চাই, তার দিকে নিয়ে যেতে পারে এমন পথকে এত সহজে কেন বেছে নিচ্ছি?
এই realization-টাই কখনো একটি দু‘আকে শুধু মুখস্থ বাক্য থেকে জীবনের guardrail বানিয়ে দেয়।
৩. যখন মনে হয়, “আমি পারব তো?”
رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي
রব্বিশরাহ লি সদরি, ওয়া ইয়াসসির লি আমরি।
অর্থ: হে আমার রব, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন।
এটি মূসা আলাইহিস সালামের দু‘আর অংশ। আল্লাহ তাঁকে ফিরআউনের কাছে যাওয়ার গুরুদায়িত্ব দেওয়ার পর তিনি তাঁর রবের কাছে বক্ষ প্রশস্ত ও কাজ সহজ করার আবেদন করেন। — সূরা ত্ব হা, ২০:২৫–২৬।
আমাদের পরিস্থিতি সেই পরিস্থিতির মতো নয়। কিন্তু নিজের জীবনের কঠিন মুহূর্তে এই দু‘আর ভাষাটা কত আপন মনে হয়! Interview-এর আগে বুক ধড়ফড় করছে, exam সামনে, presentation দিতে হবে, গুরুত্বপূর্ণ কারও সঙ্গে কঠিন কথা বলতে হবে, নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন, এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে যেখানে ভুল করার ভয় হচ্ছে।
Preparation করবেন। চেষ্টা করবেন। প্রয়োজন হলে মানুষের পরামর্শও নেবেন। কিন্তু সব প্রস্তুতির শেষে মনে রাখবেন, নিজের সামর্থ্যই আপনার শেষ ভরসা নয়।
বলুন, “হে আমার রব, আমার বুকটা প্রশস্ত করে দিন। আমার কাজটা সহজ করে দিন।”
৪. যখন বুঝতে পারছেন না, দুনিয়া চাইবেন নাকি আখিরাত
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
রব্বানা আতিনা ফিদ দুনইয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আযাবান নার।
অর্থ: হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। — সূরা আল বাকারা, ২:২০১।
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, এটি নবী ﷺ-এর সবচেয়ে বেশি করা দু‘আগুলোর একটি ছিল।
এই একটি দু‘আর মধ্যে কী সুন্দর ভারসাম্য! ইসলাম আপনাকে বলে না যে ভালো চাকরি চাইবেন না, সুস্থতা চাইবেন না, শান্ত সংসার চাইবেন না, হালাল রিজিক চাইবেন না। কিন্তু শুধু দুনিয়ায় ভালো থাকলেই তো শেষ নয়।
তাই আমরা যেন শুধু বলি না, “হে আল্লাহ, আমি যেটা চাই সেটা আমাকে দিন।”
বরং চাই, “হে আল্লাহ, আমার দুনিয়াটাও কল্যাণময় করুন, আখিরাতটাও।”
কারণ কোনো কিছু পাওয়া আর সেই জিনিস আপনার জন্য সত্যিকার কল্যাণ হওয়া সবসময় এক বিষয় নয়।
৫. এমন কিছু ভুল আছে, যেগুলো মনে পড়লে নিজের কাছেই লজ্জা লাগে?
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
আল্লাহুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউউন তুহিব্বুল ‘আফওয়া ফা‘ফু ‘আন্নি।
অর্থ: হে আল্লাহ, নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।
আয়িশাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, লাইলাতুল কদর পেলে তিনি কী বলবেন। রাসূল ﷺ তাঁকে এই দু‘আটি শিখিয়েছিলেন। তাই হাদিসে এর বিশেষ প্রসঙ্গ লাইলাতুল কদর—এই বিষয়টি মনে রাখা উচিত।
আমাদের জীবনে এমন কিছু chapter থাকে যা আমরা চাই কেউ কখনো না জানুক। এমন কথা আছে যা বলা উচিত ছিল না। এমন screen আছে যা দেখা উচিত ছিল না। এমন হক আছে যা নষ্ট করেছি। এমন সালাত আছে যা অবহেলায় হারিয়েছি।
মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলতে পেরেছি বলে সেগুলো আল্লাহর কাছ থেকে লুকায়নি।
কিন্তু এখানেই আশার জায়গা আছে। ভুল আপনার জন্য শেষ কথা নয়। আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার দরজা এখনো খোলা থাকলে, আপনি আবার বলতে পারেন—
“আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, আমাকে ক্ষমা করুন।”
৬. শুধু ভালো জীবন নয়, ঈমানের ওপর শেষ হওয়াও চান
تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
তাওয়াফফানি মুসলিমান ওয়া আলহিকনি বিস সালিহীন।
অর্থ: আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিন এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের সঙ্গে যুক্ত করুন। এটি ইউসুফ আলাইহিস সালামের দু‘আর অংশ। — সূরা ইউসুফ, ১২:১০১।
আমরা ভালো জীবন চাই। কিন্তু কখনো কি ভালো শেষ চেয়েছি?
আজ সালাত পড়ছি। শেষ দিনেও কি ঈমানের ওপর থাকব? আজ একটা গুনাহ ছেড়েছি। কয়েক বছর পরে আবার তাতে ফিরে যাব না তো? আজ আল্লাহকে ভালোবাসি বলে কাঁদি। কিন্তু আমার জীবনের শেষ অধ্যায়টা কোন অবস্থায় লেখা হবে?
কেউ জানি না।
তাই আমাদের দুশ্চিন্তা শুধু “আমি কত বছর বাঁচব?” হওয়া উচিত নয়। বরং আরও বড় প্রশ্ন হলো, যেদিন চলে যাব, তখন আমার এবং আল্লাহর সম্পর্কটা কেমন থাকবে?
এই দু‘আ আমাদের সেই ভয় আর আশাকে একসঙ্গে আল্লাহর কাছে তুলে দিতে শেখায়।
দেখুন, ছয়টি দু‘আ খুব দীর্ঘ নয়। কিন্তু চাওয়াগুলো কত বড়—জান্নাত, জাহান্নাম থেকে নাজাত, কঠিন সময়ে আল্লাহর সাহায্য, দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, ক্ষমা এবং ঈমানের ওপর জীবনের সমাপ্তি।
আমরা অনেক সময় দু‘আকে emergency button বানিয়ে ফেলি। পরীক্ষা এলে দু‘আ, অসুস্থ হলে দু‘আ, টাকা দরকার হলে দু‘আ, বড় কোনো সমস্যা হলে দু‘আ। সমস্যা চলে গেলে কথোপকথনটাও যেন থেমে যায়।
কিন্তু দু‘আ শুধু আল্লাহর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কিছু পাওয়ার মাধ্যম নয়। দু‘আ আমাদের নিজেদেরও বারবার মনে করিয়ে দেয়—আমি কার বান্দা, আমার শেষ গন্তব্য কোথায় এবং আমার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আসলে কী।
তাই আজ ছয়টি একসঙ্গে মুখস্থ করার চাপ নেবেন না। একটি বেছে নিন। অর্থটা বুঝুন। মন দিয়ে আল্লাহকে বলুন। তারপর ধীরে ধীরে আরেকটি শিখুন।
একদিন হয়তো খেয়াল করবেন, আপনার চাওয়ার ভাষাই বদলে গেছে।
আগে শুধু বলতেন, “হে আল্লাহ, আমার সমস্যাটা ঠিক করে দিন।”
এখন হয়তো বলবেন—
“হে আল্লাহ, আমার দুনিয়ায় কল্যাণ দিন, আখিরাতে কল্যাণ দিন। আমাকে ক্ষমা করুন। জাহান্নাম থেকে বাঁচান। জান্নাত দিন। আর যখন আপনার কাছে ফিরব, ঈমানের অবস্থায় ফিরিয়ে নিন।”
দুনিয়ায় আমাদের চাওয়ার তালিকা যত বড়ই হোক, শেষ পর্যন্ত এর চেয়ে বড় কয়েকটি চাওয়া হয়তো আর নেই।
আল্লাহ আমাদের দু‘আকে শুধু মুখের বাক্য না বানিয়ে অন্তরের সত্যিকারের আবেদন বানিয়ে দিন। আমাদের ক্ষমা করুন, দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দিন, জাহান্নাম থেকে হেফাজত করুন, জান্নাত নসিব করুন এবং ঈমানের অবস্থায় তাঁর কাছে ফিরে যাওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
📌 পোস্ট-টি সদকায়ে জারিয়া এবং ইসলাম প্রচারের স্বার্থে শেয়ার করে অশেষ সওয়াবের ভাগিদার হোন। এই পোস্ট আপনার আখেরাতের কঠিন মুসিবাতের সময় নাজাতের ওসিলা হয়ে যাক, আমিন🤲
🌿 বাস্তব জীবনের প্রশ্ন, চিন্তা ও সমস্যার ইসলামিক সমাধান পেতে আমাদের পেজ Follow করে রাখুন।in sha allah.
©️