23/07/2026
রুমানা আপুর ইউটিউব চ্যানেলটি আমি একদম প্রথম থেকেই ফলো করতাম। বলতে গেলে, উনার চমৎকার সব রেসিপি দেখেই আমি একটু একটু করে রান্না শিখেছি। ২০১৭ সালে আপু যখন প্রথম একটি কুকিং কম্পিটিশনের আয়োজন করেছিলেন, আমি আগ্রহ নিয়ে তাতে অংশ নিই। এরপর ২০১৮ সালে তাদের দ্বিতীয় কুকিং কম্পিটিশনে আবারও অংশ নিই এবং আলহামদুলিল্লাহ্, প্রথম স্থান অধিকার করে একটি ল্যাপটপ উপহার পাই।
সেই সুবাদেই আপু এবং ভাইয়া দুজনের সাথেই আমার বেশ ভালো পরিচয় গড়ে উঠেছিল। তারা দুজনই মানুষ হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক, দয়ালু ও ভালো মনের। সবসময়ই তাদের ভিডিওগুলো পরম ভালোবাসায় ফলো করতাম। আজ আপুর চলে যাওয়ায় মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত। মহান আল্লাহর কাছে আকুল প্রার্থনা—আল্লাহ তাআলা যেন রুমানা আপুকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন। আমিন।
রুমানার রান্নাবান্না থেমে যাবে না!
এটা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে কোনো পোস্ট দেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিলো না। কিন্তু আমাদের নীরবতার সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষ যে যার মতো মনগড়া কথা বলছে আর কন্টেন্ট তৈরি করছে, তা দেখে বাধ্য হয়ে আজ লিখতে হচ্ছে।
হ্যাঁ, রুমানার রান্নাবান্না চ্যানেলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা Rumana Azad আর আমাদের মাঝে নেই। গত ১৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে, ঠিক তার জন্মদিনের পরের দিন ও আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আপনাদের মধ্যে অনেকের ভ্রান্ত ধারণা আছে যে রুমানা বহুদিন ধরে অসুস্থ্য থাকার কারণে নতুন কোনো ভিডিও দিতে পারছিলো না। আমরা কেনো ভিডিও দিচ্ছিলাম না, তার কৈফিয়ত এই ভিডিওতে https://youtu.be/elMi1eUNOLs আগেই দেয়া হয়েছিলো।
🍽️ রুমানার রান্নাবান্না থেমে যাবে না -
রুমানার রান্নাবান্না চ্যানেলে রুমানা ছাড়াও আরও অনেক কলাকুশলী জড়িত আছে। এই পেজের/চ্যানেলের উপার্জন আমরা প্রয়োজনীয়দের সহযোগিতায় ব্যায় করি। আমরা যদি থেমে যাই, তাহলে যাদের আমরা সহযোগিতা করি বা আমাদের সাথে যারা জড়িত আছে, তারা বিপদে পড়ে যাবে। রুমানা যাবার আগে অন্তত তিনটি ডায়রী জুড়ে অনেক রেসিপি রেখে গেছে। আমরা একটু গুছিয়ে উঠতে পারলেই আবার সেগুলো দর্শকদের সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করবো।
🤐 এখানে কয়েকটি বিষয় একদম পরিষ্কার করে দিতে চাই:
রুমানা বছরের পর বছর অসুস্থ ছিলো না। এর আগে রুমানার তেমন কোনো বড় অসুখ হয়নি। ডায়াবেটিস বা ব্লাড প্রেসারের মতো কোনো সমস্যাও ওর ছিলো না। কোনো রোগ ওকে কখনো কাবু করতে পারেনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওর শরীরে অগ্ন্যাশয়ের সমস্যার কোনো লক্ষণই ছিলো না। যে পরিস্থিতিতে রোগটা ধরা পড়েছে, তার কোনো চিকিৎসা এই মুহূর্তে পৃথিবীতে নেই।
🦀 রুমানার শরীরে হানা দিয়েছিলো অগ্ন্যাশয়ের (Pancreatic) ক্যান্সার।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, পৃথিবীতে দুটি ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা আজ পর্যন্ত নেই - ডিম্বাশয় (Ovaries) এবং অগ্ন্যাশয় (Pancreas). যদি ভাগ্য খুব ভালো হয় আর একদম প্রথম ধাপে এটি ধরা পড়ে, তবে হয়তো বেঁচে থাকার ১০% সুযোগ থাকে। কিন্তু চিকিৎসকরা এটাও বলেন যে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় ধাপে এটি ধরতে পাওয়ার তেমন কোনো সুযোগই নাই! ইংরেজিতে যাকে বলে "It is very unlikely!"
🩺 আমাদের স্বাস্থ্যসচেতনতা ও কঠিন বাস্তবতা
আমরা ভীষণ স্বাস্থ্যসচেতন। আমাদের উপার্জনের চার ভাগের তিন ভাগই আমরা খরচ করি সুস্থ থাকার পেছনে এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায়। আমার মায়ের পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস থাকার কারণে আমি সবসময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করি। প্রতি দুই বছর পর পর সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে আমরা 'ক্যান্সার প্রোফাইল' সহ ফুল বডি চেক-আপ করাতাম (যারা করান, তারা জানেন এর খরচ কেমন)। রুমানা আর আমি আমাদের শেষ পরীক্ষাটা করিয়েছিলাম ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, তখন সব একদম স্বাভাবিক ছিলো।
💍 একটি চিরন্তন বন্ধুত্ব এবং আমার প্রতিশ্রুতি
আমাদের যখন বিয়ে হয়, তখন আমরা দুজনেই অপ্রাপ্তবয়স্ক। ও শুধু আমার সহধর্মিনী ছিলো না, ছিলো আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, আমার অভিভাবক। আমি মজা করে প্রায়ই বলতাম - আমি আমার মায়ের ঘর থেকে রুমানার ঘরে এসেছি।
এরমধ্যে একদিন আমি কিছুটা অভিমান করে ওকে বলছিলাম, "আমাকে একা রেখে চলে যাবা রে!" উত্তরে বলেছিলো, "একা তো আমি যাচ্ছি, তোমার সাথে তো ছেলে-মেয়ে থাকলো।" সেদিন আমি ওকে একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, "আমি বেঁচে থাকতে তোমাকে একা হতে দেবো না। আমার মা-বাবার সাথেই তোমাকে রাখবো, তুমি শ্বশুর-শাশুড়ির সাথেই থাকবা।" বলে, "কে নিয়ে যাবে আমাকে এতদূরে!" বলেছিলাম, "ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, দেখো আমি পারি কি না।"
আমার মা বলতেন, "যে বাড়িতে বিয়ে করে এসেছি, সেখান থেকেই যেনো আমার জানাজা বের হয়।" রুমানার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে; তার মৃত দেহ প্রথমে মিশনরোডের বাড়িতে নেয়া হয়েছে, যেখানে অগনিত শুভাকাঙ্খীরা শেষবারের মতো তাকে দেখতে আসে। এশার নামাজ শেষে মিশনরোড জামে মসজিদে জানাজার নামাজ সম্পন্ন করে দিনাজপুর শহারের ফরিদপুর গোরস্তানে আমার মা-বাবার কবরের সাথে তাকে দাফন করা হয়েছে। আমি আমার দেওয়া শেষ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পেরেছি। এই কঠিন সময়ে আমাকে সহযোগিতা করার জন্য আমার পরিবারের প্রতিটি মানুষের কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ।
⏳ বিগত কয়েক মাসের কালানুক্রম
ডিসেম্বর ২০২৫-এ আমরা আমাদের বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করতে মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলাম। জায়গা দুটো এত ভালো লেগেছিলো যে বাচ্চাদের নিয়ে এবার ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন করতে আবারও সেখানে যাই। কিন্তু ফেরার ঠিক দুই দিন আগে শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডিতে অবস্থানকালে রাতে রুমানার প্রচণ্ড পেটে ব্যথা হয়। ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ক্যান্ডি তখন প্রায় পর্যটক-শূন্য, পুরো হোটেলে আমরা ছাড়া কেউ ছিলো না। আমি ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। তবে সকাল হতেই ব্যথাটা চলে যায়, রুমানা বলে, "রাতের খাবারের কারণে গ্যাসের সমস্যা হতে পারে।"
দেশে ফিরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১ এপ্রিল ২০২৬ ধরা পড়লো রুমানার অগ্ন্যাশয়ের গোড়ায় ৩ মিলিমিটার আকারের একটি ছোট্ট পিণ্ড আছে। তৎক্ষণাৎ আমি থাইল্যান্ডের কয়েকটা হাসপাতালে যোগাযোগ করি (ভিসার জন্য এগুলো আগে থেকেই করতে হয়), পাশাপাশি দেশে ইউনাইটেড, এভারকেয়ার ও কন্টিনেন্টাল হাসপাতালের ডাক্তারদের পরামর্শ নি। থাইল্যান্ডের হাসপাতালগুলো চিকিৎসার জন্য প্রায় ৩ কোটি টাকা প্রস্তুতির কথা বলে, যা আমাদের সাধ্যের বাহিরে! এছাড়া আমাদের দেশের বড় সমস্যা হলো, ক্যান্সারের কিছু বিশেষ টেস্ট খুব কম জায়গায় হয়। এমনও টেস্ট আছে যেটা শুধু এক জায়গায় হয়! সেখানকার সিরিয়াল পেতে এবং রিপোর্ট আসতেই রোগীর অর্ধেক সময় শেষ!
দেশের দীর্ঘসূত্রতা দেখে থাইল্যান্ডের আশা ছেড়ে আমরা ২৬ এপ্রিল দিল্লীর অমৃতা ইনস্টিটিউটে যাই। সেখানে পরীক্ষার পর আমাদের পায়ের তলার মাটি সরে যায়। ১ তারিখে যে পিণ্ডটি ছিলো মাত্র ৩ মিলিমিটার, ২৮ তারিখে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ সেন্টিমিটার! সেই সাথে ছড়িয়ে পড়েছে রক্ত ও থাইরয়েডে। ডাক্তাররা জানিয়ে দেন, এই অবস্থায় সর্বোচ্চ জীবনকাল ৫ মাস, আর কেমোথেরাপি দিলে ১২ মাস! রুমানা নিজে সিদ্ধান্ত নেয়, ও কেমোথেরাপির কষ্টে যাবে না।
আমি থাঙ্গাম ক্যান্সার সেন্টারেও যোগাযোগ করেছিলাম, যদি তাদের কাছে কোনো ট্রায়াল মেডিসিন পাওয়া যায়। তারা জানায় "Currently we have no studies on Pancreatic cancer."
💔 শেষ দিনগুলো এবং শান্ত বিদায়
বাংলাদেশে ফিরে আসার পর আমরা ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজের তত্ত্বাবধানে ছিলাম। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো রুমানাকে যতটুকু সম্ভব ব্যথামুক্ত রাখা। সেখানকার ডাক্তাররা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে সেই কাজটি করেছে। এমনকি ঈদ-উল-আযহার দিনেও যখন কোথাও কোনো ডাক্তার ছিলো না, আমরা তাদের সহযোগিতা পেয়েছি।
গত ১৭ জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যায় আমরা ঘরোয়াভাবে রুমানার জন্মদিন পালন করি। ও বেশ ভালোই ছিলো। কিন্তু রাত ৩টার দিকে হঠাৎ করেই ওর অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। বাসার অক্সিমিটারে আমার আঙুলে SpO₂ ৯৯ দেখালেও রুমানার আঙুলে রিডিংই আসছিলো না। অনেক চেষ্টার পর দেখা গেল SpO₂ মাত্র ৩৯ থেকে ৪০-এ নেমে এসেছে। আমার মায়ের কথা মনে পড়ে গেলো - মস্তিষ্কে অক্সিজেন না থাকায় ও কিছুটা অসংলগ্ন আচরণ করছে।
গভীর রাতে কারও উপর ভরসা না করে আমি নিজেই আমাদের ছেলে সহ গাড়িতে করে আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালের আইসিইউতে নিয়ে যাই। ভেতরে নেওয়ার মিনিট ত্রিশেক পর আমাকে ডাকা হয়। রুমানা তখন একটু স্থির। আমাকে খুব অস্পষ্টভাবে কিছু কথা বললো এবং আমাদের ছেলেকে ডাকতে বলে।
আমি আর আমার ছেলে ওর বাঁ হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম। ও ছেলের দিকে শেষবারের মতো তাকালো... এবং আমাদের হাত ধরেই জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটি ত্যাগ করলো।
"মৃত্যু আসলে এরকমই হওয়া উচিত" এই কারণেই বলেছি যে, শেষ মুহূর্তের ওই কয়েক ঘণ্টা ছাড়া রুমানা কখনো বিছানায় পড়ে থাকেনি। নিজের কাজ নিজেই করার চেষ্টা করেছে, কারো উপর তেমন নির্ভরশীল হয়নি, কারো কষ্টের কারণ হয়নি। একজন আত্মমর্যাদাশীল মানুষ হিসেবে অত্যন্ত শান্তিতে প্রিয়জনদের হাত ছুঁয়ে সে চলে গেছে।
এর পরও রুমানা যদি ভুল করেও কারও মনে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে ওকে ক্ষমা করবেন এবং কারও কোনো কিছু পাওনা থাকলে আমাকে জানাবেন।
- Omi Azad