20/10/2019
বোনটাকে আমার ঠকাচ্ছি নাতো?...
সমস্যাটা খুবই ভয়াবহ মাত্রার। এদেশের ৯০℅ বা আরো বেশি পরিবার হয়তো এই নীরব সমস্যায় জর্জরিত। সমস্যা না বলে বরং বলি যুলুম। বলছিলাম বোনদেরকে তাদের পিতার সম্পত্তির ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করার মারাত্নক এক যুলুমের কথা।
খুবই দুঃখ লাগে, যখন দেখি, মুসলিম দাবিদার কত নামাজি বাপ-ভাই তাদের মেয়ে ও বোনদের সাথেও এই প্রকট জুলুমটা করে থাকেন। মায়েরাও অনেক সময় এই জুলুমে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। বাপ-মা হয়তো অজুহাত দেন নিজেদেরকেই বা হয়তো আদরের মেয়েটাকে এই বলে, আমরা আর ক'দিন বাঁচবো? পরে তোর এই ভাইয়েরাই তো তোকে দেখবে। তোর সম্পত্তির অংশ ভাইদের ছেড়ে দে, সেই ভাল।
সুবহান'আল্লাহ!! নিজের ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে গেলে একজন বোনকে তাহলে নিজের সম্পত্তি জমা রেখে তবেই আসতে হবে? নিখাদ রক্তের সম্পর্কটাকে এভাবেই অর্থের জোরে ধরে রাখতে হবে নিরীহ বোনটাকে? ভাইটা যখন বোনের বাসায় আসে, বোনটা কি জান-প্রাণ দিয়ে ভাইটাকে আদর যত্ন করে না, খাতির করে না? সেই ভাইজান কি তার সম্পত্তি বোনের কাছে জমা রেখে তারপরে আসে নাকি বেড়াতে??
বাস্তবতা এমনই, ছেলে সন্তানেরা নানা কায়দায় বোনদের ভাগের অংশ মা-বাবার থেকে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করে। আর যে বাবা হঠাৎ মারা যান, সে সম্পদও দ্রুত ইসলামিক বিধানে বন্টন করা হয় না অজ্ঞতাবশত, যেমনটা করার কথা ছিল।
সুতরাং দেখা যায়, ভাইয়েরাই মৃত বাবার যাবতীয় জমিজমা ও সম্পত্তির দেখভাল আর ভোগ করতে থাকে। এভাবেই ধীরে ধীরে সেই সম্পদের মোহে আর ফিতনায় পড়ে যায় তারা। পরে বউ বাচ্চা নিয়ে পরিবার আরো বড় হলে চাহিদাও যায় অনেক বেড়ে। তখন বাবার সে সম্পদ নিজের বোনদেরকে পাইপাই করে প্রাপ্যটুকু বুঝিয়ে দেওয়ার যে ন্যূনতম মানসিকতা, সেটাও আর অবশিষ্ট থাকে না।
সুবহান'আল্লাহ! কতই না সত্য বলেছেন প্রিয় নবীজী, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম।
“প্রত্যেক উম্মতের জন্য (একটি বিশেষ) ফিতনা (বা পরীক্ষা) রয়েছে। আর আমার উম্মতের জন্য সেই ফিতনা হলো ধন সম্পদ।” [তিরমিযীঃ ২৩৩৬]
এভাবে মেয়েদের বা বোনদের হক নষ্ট করার শেষ পরিণতি কত ভয়াবহ, আমরা কি জানি? তওবা করলে আল্লাহ তাঁর বান্দার পাহাড়সম গুনাহও মাফ করে দিতে পারেন, আমরা জানি। এমনকি কারো পাপ জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত পৌঁছে গেলেও।
কিন্তু হাক্কুল ইবাদ বা বান্দার কোনো হক নষ্ট করার গোনাহ? এগুলো সেই গোনাহ যা আমলনামায় থেকে থাকলে সেটা সেই মাযলুম বান্দা স্বয়ং মাফ না করলে আল্লাহ তা'আলাও ক্ষমা করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন আমাদেরকে।
আল্লাহু আকবার!!!
আল্লাহর রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
"যদি কোনো ব্যক্তি অন্যের এক বিঘত পরিমাণও জমি জবরদখল করে, তাহলে কিয়ামতের দিন সাত তবক জমিন তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে।" [মুসলিম]
তাছাড়া রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেই মারাত্নক হাদিসটি হয়তো অনেকেরই জানা। যেখানে তিনি কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করেছেন আমাদেরকে। বলেছেন-
"আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে গরীব সে ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামায, রোযা, যাকাত, এসবের পাহাড়সম আমল নিয়ে হাজির হবে আল্লাহর সামনে। কিন্তু তার আমলনামায় এও থাকবে যে, সে দুনিয়াতে কারো সাথে মন্দ আচরন করেছে, কারো নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করেছে বা কাউকে আঘাত করেছে ইত্যাদি। তাই এর বিনিময়ে কিয়ামতের দিন তার কিছু নেকী একে দিবে, কিছু নেকী ওকে দিবে। এভাবে দিতে দিতে বান্দার হক আদায়ের পূর্বে যদি তার নেকী শেষ হয়ে যায়, তাহলে ওসব হকদারদের গুনাহ তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে হিসেব বরাবর করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে ছুঁড়ে ফেলা হবে।" [মুসলিম শরীফ]
নাউজুবিল্লাহ! মেয়ে বা বোনদের সম্পত্তির অধিকার নষ্টকারী বাপ-ভাইদের জন্যে কত মারাত্নক সতর্কবার্তা এ হাদীসগুলো, আল্লাহর তরফ থেকে।
উপায় না দেখে লজ্জায় পড়ে অনেক বোন এমনটাও বলেন, আমি যদি স্বেচ্ছায় আমার ভাগের অংশ ভাইদেরকে দিয়ে দেই? বলাই বাহুল্য, সে সম্পদ ভোগ করাও তার ভাইদের জন্যে জায়েজ নয়।
বাবা-মেয়ে অথবা ভাই-বোনের স্বাভাবিক সম্পর্কগুলো কতই না মধুর! অথচ উত্তরাধিকারের সম্পত্তি নিয়ে এদেশে হাজারো পরিবারে কত অশান্তি। আশেপাশেই তাকান, উদাহরণ পাবেন ভুরিভুরি। কখনো রেষারেষি গড়ায় মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত। শেষমেষ মেয়েরা কোনভাবে অধিকারটুকু বুঝে পেলেও ভাইদের ঘরের দরজা বন্ধ হয় চিরতরে। আত্নীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী যে জান্নাতে প্রবেশ করবে না, এসব হাদিস যেন শুধুই কথার কথা আজকের সমাজে। আল্লাহ ক্ষমা করেন জাহেল বাবা ও অর্থলোভী ভাইগুলোকে।
প্রিয় ভাইয়েরা। আমরা যেন সত্য স্বীকার করি। আর সত্য এটাই, এ দুনিয়াটা বড্ড ক্ষণিকের। কাউকে কষ্ট দিয়ে, প্রতারণা করে, জোর জুলুম করে ওপারে গেলে রেহাই নেই। দুইদিনের দুনিয়ায় নিজেরা একটু বেশি খেয়ে, ভোগ করে মরার পর শাস্তি ভোগের চেয়ে যার যার প্রাপ্য হক মিটিয়ে সবাইকে নিয়ে সুখে থাকাটাই কি হাজারগুণে উত্তম না? আল্লাহর সন্তুষ্টির হাসি নিয়ে জান্নাতে আমরা কে না যেতে চাই, বলেন তো?
আসুন, আমাদের মেয়েদের হক, বোনেদের হক, সকল নারীর যথাযথ হক সুন্দরভাবে আদায়ের চেষ্টা করি। মিরাস সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে নিজ গরজে দ্বীনী জ্ঞানার্জন করি। এসব ব্যপারে মনে কোনো সুপ্ত অসুখ থাকলে ঝেড়ে ফেলি। অন্তরের নিয়্যাতগুলো সুন্দর করি আজকে থেকেই।
"সৃষ্টিকূলের অন্তরসমূহে যা কিছু আছে, আল্লাহ কি সে সম্পর্কে সম্যক অবগত নন?" [ সুরা আনকাবূত: ১০]
#আমার_প্রাণের_পরিবার
#না_হয়_যেন_যুলুমের_স্বীকার