18/07/2026
আচ্ছা, কিছুদিন আগে পত্রিকায় একটা ঘটনা আসছিল না? অনেকদিন নিরুদ্দেশ থাকার পর এক বুড়া লোক স্ত্রী-সন্তানের কাছে ফিরে আসছে, কিন্তু স্ত্রী তাকে মেনে নিচ্ছে না। একটা ছবি প্রকাশ হয় যেখানে দেখা যায় লোকটা ঘরের বাইরে বসে আছে। পত্রিকা ঘটনাটাকে ফ্রেম করেছিল 'স্ত্রীর অভিমান' হিসেবে। আমি জানতাম, জিনিসটা অভিমান না। জিনিসটা ভয়। কষ্টের জীবনে আরও কুলক্ষণ আরও কোন অপয়া ঘটনা আসার ভয়।
কিছু মানুষকে বা কিছু অভ্যাসকে অপয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ঘরবাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া পুরুষকে অনেক জায়গায় ঘরের জন্য অশুভ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এটা একটা লোকজ বিশ্বাস। ওই বয়সে বা ওই সমাজে প্রেম-অভিমান খুব কমই দেখা যায়। আমার সন্দেহ, বয়স্ক মহিলাটি অভিমান করেননি; বরং পনুতি লেগে যাওয়ার ভয় পেয়েছিলেন।
অপয়া, কুলক্ষণ, পনুতি, কুফা--এই শব্দগুলো আপনিও শুনেছেন। এবং আপনার অবচেতনও হয়ত কিছুটাভ বিশ্বাস করে।
'ছারোল্যা বেটা' কথাটা প্রথম আমি শুনেছিলাম এক আপুর কাছে, উনার বিয়ের দাওয়াতের সময়। এটা নাকি তার শ্বশুরবাড়ির এলাকার প্রচলিত। আলোচ্য ঘটনায়, ঝগড়াঝাঁটি করে এক মধ্যবয়সী লোক, যিনি পাঁচ সন্তানের বাবা, তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়ে দেন। বড় ছেলে তখন ভার্সিটিতে পড়ত। নিজের পাঁচ ছেলেমেয়েকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে তিনি বাড়িটাই বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এলাকায় একটা হায়-হায় আর ছি-ছি পড়ে গেছিল।
ওই সময় অন্য বিবাহিত নারীরা মনে করলেন, এই বুড়া লোকটা 'ছারুল্যা বেটা'। সুতরাং তাকে কোনো বিয়েশাদিতে ডাকা যাবে না। ঘরের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। এমনকী কোনো খাবার অফার করা যাবে না।খাওয়ালেও দূর থেকে ছুড়ে দিয়ে আসতে হবে।
আপুর দাদি-শাশুড়ি নাকি বলেছিলেন, 'ছারুল্যা বেডারে ডাহিলে বিয়াত কুছাত লাগিবু।' এই কথাটা তিনি আপুকে নাতবউ করে ঘরে তোলার সময় বলেছিলেন। 'কুছাত' একটা আঞ্চলিক স্ল্যাং, যার অর্থ দুর্ভাগ্য বা অমঙ্গল ঘটার আশঙ্কা।
তাই ওই লোকটিকে দ্বিতীয় বিয়ের আগ পর্যন্ত কেউ চালের নিচে, অর্থাৎ ঘরের ভেতরে, ওয়েলকাম করত না। পরে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কেউ কেউ বলত, এই মহিলাকে বিয়ে করার জন্যই তিনি আগের স্ত্রীকে ছেড়ে দিছিলেন। কোনটা সত্য কে জানে!
তবে একটা জিনিস খেয়াল করছিলাম ওই দ্বিতীয় স্ত্রীটি কোনোদিন পারিবারিকভাবে সম্মান পাননি। সামাজিকভাবেও নো। ওই ঘরে একটি ছেলে হয়েছিল, যার নাম রাখা হয়েছিল আব্দুল্লা। কিন্তু ওই মহিলাকে কেউ ভাবি, চাচি বা মামী বলে ডাকত না। সবাই ডাকত 'আব্দুল্লার মা' বলে। কারণ তিনি 'ছারুল্যা বেটা'কে বিয়ে করেছিলেন। অথবা ধরে নেন আব্দুল্লার মা একটা 'সাইড চিক' যাকে মেয়েদের সমাজ মেনে নেয়নাই। হু নোজ!
দাদিরা এই ধরনের লোকজ বিশ্বাসের ভিত্তিতে বিয়েশাদিতে নিজেদের প্রেডিকশন হাজির করতেন। হয়ত গুরুত্ব পাবার জন্য। কিন্তু তারা প্রেডিকশন দিতেন। যদিও মেয়েদের নিয়েও উনি এমন কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করতেন। সেগুলো বলছি না, কারণ আমার লেখার বিষয় সেটা নয়। আমার বিষয় হলো, ছারুল্যারা কি পনুতি পুরুষ? কী ধরনের পুরুষকে পনুতি ধরা হতো?
যতটুকু মনে করতে পারছি, ততটুকুই লিখছি। দাদির মতে পনুতি পুরুষ বা পনুতি মর্দ হল
্য 'ছারুল্যা বেটা'। কে ছারুল্যা বেটা? শুধু যার ডিভোর্স হয়েছে? না, তার চেয়েও বেশি। যে লোক চালের তলে, অর্থাৎ ঘরের ভেতরে, গালাগালি করতে গিয়ে বা গল্প বলতে গিয়ে ডিভোর্স শব্দটা উচ্চারণ করে। দাদির বিশ্বাস ছিল, ওদের সংসার টেকে না। টিকলেও ওরা সুখী হয় না।
যাই হোক, অপয়া বা অলক্ষুণে---এসব বিশ্বাস আসলে কুসংস্কার। লোকজ বিশ্বাসে এগুলো ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। ধর্ম এগুলোকে সমর্থন করে না। বিজ্ঞানসম্মত তো নয়ই।
কিন্তু, কিন্তু, কিন্তু! আমি একবার সম্ভবত তারিক জামিল বা আহমাদুল্লাহর একটি বক্তব্যে শুনেছিলাম, তারা পুরুষদের উপদেশ দিচ্ছিলেন যেন ঘরের ভেতরে অহেতুক ডিভোর্স শব্দটি উচ্চারণ না করেন। এরপর আবার দেখলাম, এক লোকের স্ত্রী কোনো জটিলতা ছাড়াই সন্তান জন্ম দিয়ে পরের রাতে হাসপাতালে মারা গেলেন। কেমন যেন ভীতিকর লাগে না? পনুতি ব্যপারটা মনে একবার এসে আবার উড়ে যায়। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝামাঝি।
#অপয়া #অলক্ষুণে #পনুতি #কুফা #বাংলার_লোকসংস্কৃতি #সামাজিক_মনোবিজ্ঞান #ছারোল্যা_বেটা #গ্রামীণ_সমাজ #কুসংস্কার #সমাজবিজ্ঞান k