11/09/2026
প্রসবের পর মায়ের যত্ন—দায়িত্বটা কার?
শুধু বাবার বাড়ির?
এইমাত্র আউটডোর থেকে রোগী দেখে ফিরলাম। প্রচণ্ড গরম, সুযোগ-সুবিধাও খুব সীমিত। তবু রোগী তো দেখতে হবে। আজ আমার কাছে আসা কয়েকজন প্রসূতি মায়ের কথা আমাকে আবারও ভাবাল।
একজনের বয়স মাত্র ২৬ বছর, ওজন ৩৬ কেজি । ১৯ দিন আগে দ্বিতীয় সিজার হয়েছে। শরীর এখনো অপারেশন ও সন্তান জন্মদানের ধকল সামলাচ্ছে, তার ওপর নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানো, রাত জাগা
।আমি বললাম ওর ওজন অনেক কম। ওকে প্রচুর খেতে দিতে হবে। ওর ওজন বাড়াতে হবে। ওর জন্য বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন। ওর ঘুমের ব্যবস্থা করেন। ওর অন্য কোন চিকিৎসা লাগবে না। ওর প্রথম সন্তানের বয়স ১৯ মাস। সেও বুকের দুধ খায়।
স্বামী বললেন—
“ম্যাডাম, তাই তো ওকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি।”
আমি বললাম,
বাবার বাড়ি পাঠিয়েছেন ভালো কথা। কিন্তু শুধু পাঠিয়ে দিয়েই কি স্বামীর দায়িত্ব শেষ?
স্ত্রীকে সেখানে রেখে এলে তার খাবার, ওষুধ ও প্রয়োজনের জন্য কিছু টাকা হাতে দিয়ে আসুন। প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবস্থা করুন। রাত জাগার দায়িত্বটাও ভাগ করে নিন।
কারণ মেয়ের মা রাত জাগলে সেটা তার দায়িত্ব, কিন্তু শাশুড়ি বা শ্বশুরবাড়ির কেউ রাত জাগলে সেটা শ্রম। আবার মেয়ের মা-বোন দিনের পর দিন সেবা করলে সেই শ্রমও অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে না।
আরেকজন মা—৩৫ দিন আগে সিজারে যমজ ছেলে হয়েছে।
নিজের শরীরেই ব্যথা, ঘুমাতে পারেন না, রক্তচাপও কিছুটা বেশি। দুই নবজাতকের দুধ, কান্না, ঘুম, কাপড়—সব মিলিয়ে কী পরিমাণ শারীরিক ও মানসিক চাপ, একটু ভাবুন।
তাকেও পাঠানো হয়েছে বাবার বাড়ি।
কিন্তু তার নিজের মা অসুস্থ, পক্ষাঘাতগ্রস্ত।
তখন আমার মনে হলো—
একজন সদ্যপ্রসূতি মায়ের যত্ন কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার নিজের মায়ের দায়িত্ব হয়ে যায়?
তৃতীয় একজনের গর্ভাবস্থায় প্রি-একল্যাম্পশিয়া ছিল।
ডেলিভারির পরও রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়নি। অথচ এখনই তাকে নিয়ে যাওয়ার তাড়া—বাড়িতে গিয়ে রান্নাবান্না, সংসার, বাচ্চা সামলানো—সব করতে হবে!
এখানেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো দরকার।
আমাদের দেশে প্রেগনেন্সি কেয়ারের সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। গর্ভবতী মাকে ডাক্তার দেখানো, পরীক্ষা করানো, একটু ভালো খাবার দেওয়া—এসব এখন অনেক পরিবারই বোঝে।
কিন্তু সন্তান জন্মানোর পর যেন হঠাৎ মা-টি সবার চোখের আড়ালে চলে যায়।
সন্তান জন্মেছে মানেই মায়ের শরীর সঙ্গে সঙ্গে আগের অবস্থায় ফিরে যায় না।
স্বাভাবিক প্রসবের পরেও শরীরের পুনরুদ্ধারের সময় প্রয়োজন।
সিজারিয়ান হলে অপারেশনের ক্ষতও সেরে উঠতে হয়।
তার সঙ্গে আছে বুকের দুধ তৈরি, রাত জাগা, শিশুকে কোলে নেওয়া, মানসিক পরিবর্তন, ব্যথা ও ক্লান্তি।
আর যমজ সন্তান হলে সেই দায়িত্ব আরও বহুগুণ।
এ সময় মায়ের দরকার—
পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি, প্রোটিন, ডিম-মাছ-মাংস/ডাল, দুধ-দই, ফল-সবজি এবং প্রয়োজনমতো ভাত-রুটি।
তার চেয়েও বেশি দরকার বিশ্রাম, ঘুম এবং পরিবারের বাস্তব সহযোগিতা।
ওজন একটু বেড়েছে বলে সদ্যপ্রসূতি মায়ের খাবার হঠাৎ কমিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
বিশেষ করে যে মা বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন, তার শরীর এখন একই সঙ্গে নিজের পুনর্গঠন করছে এবং আরেকটি শিশুর খাদ্য তৈরি করছে।
তাই সন্তান জন্মানোর পর শুধু বলবেন না—
“এবার বাবার বাড়ি গিয়ে থাকো।”
বলুন—
“তুমি বিশ্রাম নাও, আমরা সবাই মিলে তোমাকে আর বাচ্চাকে সামলাই।”
স্বামী রাতের কিছু দায়িত্ব নিন।
শ্বশুরবাড়ির মানুষ পাশে দাঁড়ান।
মায়ের বাড়ির মানুষ সাহায্য করলে তাদের শ্রম ও ত্যাগকেও সম্মান করুন।
মেয়ের মা-বাবা তাকে জন্ম দিয়েছেন, মানুষ করেছেন—তাই নাতি-নাতনি এবং সদ্যপ্রসূতি মেয়ের সমস্ত দায়িত্বও আজীবন তাঁদেরই বহন করতে হবে—এটা কোনো স্বাভাবিক অধিকার নয়।
একটি সন্তান শুধু একজন নারীর সন্তান নয়।
সে একটি পরিবারের সন্তান।
তাই প্রসবের পর মায়ের সেবাটাও দুই পরিবারের, বিশেষ করে স্বামী ও সন্তানের বাবার সমান দায়িত্ব।
আমাদের সমাজ অনেক বদলেছে।
এবার এই জায়গাটাও বদলাক।
সন্তানের জন্মের পর সবাই শিশুকে দেখতে আসে।
একবার মায়ের দিকেও তাকান।
জিজ্ঞেস করুন—
“তুমি কেমন আছো? একটু ঘুমিয়েছো? তোমার জন্য আমি কী করতে পারি?”
এই কয়েকটি কথাও একজন সদ্যপ্রসূতি মায়ের কাছে অনেক বড় আশ্রয় হতে পারে।
মাতৃত্বকে সম্মান করতে হলে শুধু শিশুকে ভালোবাসলেই হবে না—
যে নারী তাকে জন্ম দিলেন, তাঁর শরীর, বিশ্রাম, খাবার, শ্রম ও মর্যাদাকেও সম্মান করতে হবে।