28/04/2026
আমার মেয়েটা ২১ বছর বয়সে এক কোরিয়ান লোককে বিয়ে করেছিল। তারপর থেকে টানা ১২ বছর সে আর বাড়ি ফেরেনি। তবে প্রতি বছর ঠিকই ৮ মিলিয়ন টাকা পাঠায়। গত বড়দিনে হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিলাম—ওকে না জানিয়ে আমি নিজেই ওর কাছে চলে যাব। কিন্তু দরজা খুলে যা দেখলাম… আমি একদম জমে গেলাম।
সেই সকালটা আমি কোনোদিন ভুলব না। হাতে প্লেনের টিকিট, বুকের ভেতর ধুকপুকানি—পুরো ১২ বছর পর আমি আমার মেয়ের কাছে যাচ্ছি। আমার নাম তৃষা, বয়স ৬৩। অনেক আগেই স্বামীকে হারিয়েছি, একমাত্র মেয়ে মীরা’কে একাই বড় করেছি।
মীরা ছোটবেলা থেকেই ভীষণ মেধাবী, শান্ত আর সুন্দর ছিল। সবাই বলত, ওর ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল হবে। সত্যিই হয়েছে… তবে সেটা শুধু বাইরের মানুষের চোখে।
২১ বছর বয়সে ওর সঙ্গে পরিচয় হয় কাং জুন নামের এক কোরিয়ান লোকের। লোকটা ওর থেকে প্রায় ২০ বছর বড়। আমি প্রথম থেকেই আপত্তি করেছিলাম। বয়সের এত পার্থক্য, বিদেশে চলে যাওয়া—সব মিলিয়ে ভয় লাগছিল। কিন্তু মীরা জেদ ধরেছিল—
“মা, আমি জানি আমি কী করছি।”
শেষ পর্যন্ত মেয়ের জেদের কাছে হার মেনে বিয়েটা মেনে নিয়েছিলাম।
বিয়ের এক মাসের মধ্যেই ও কোরিয়ায় চলে গেল। সেদিন বিমানবন্দরে ও আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল… আমিও কাঁদছিলাম, কিন্তু লুকিয়ে রেখেছিলাম।
ভাবছিলাম, কয়েক বছর পর ঠিকই ফিরে আসবে।
কিন্তু না… বছর যায়, আরেক বছর যায়… পাঁচ বছর পর আমি প্রশ্ন করাও বন্ধ করে দিই।
শুধু প্রতি বছর ঠিক সময়ে ৮ মিলিয়ন পেসো এসে পৌঁছাত। সঙ্গে একটা ছোট্ট বার্তা—
“মা, নিজের খেয়াল রেখো। আমি ভালো আছি।”
এই “ভালো আছি” কথাটাই আমার সবচেয়ে বেশি ভয়ের ছিল।
একবার ভিডিও কলে কথা হয়েছিল। ওকে আগের মতোই সুন্দর লাগছিল, কিন্তু চোখে যেন একটা অদ্ভুত দূরত্ব। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম—
“ফিরবি না মা?”
ও একটু চুপ করে বলেছিল—
“খুব ব্যস্ত আছি মা…”
তারপর আর জিজ্ঞেস করিনি। অনেক সময় মা’রা সত্যিটা জানার ভয়েই প্রশ্ন করে না।
এদিকে আমার বাড়ি, জীবন—সবই বদলে গেছে সেই টাকার কারণে। সবাই ভাবে আমি ভাগ্যবতী। কিন্তু তারা জানে না—একটা ভরা প্লেটের সামনে একা বসে খাওয়ার কষ্টটা কেমন।
প্রতিটা জন্মদিনে আমি ওর জন্য আলাদা প্লেট রাখতাম। ওর প্রিয় রান্না করতাম… আর বসে বসে কাঁদতাম।
১২ বছর পরে হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম—আমি নিজেই যাব।
পাশের এক প্রতিবেশীর সাহায্যে টিকিট কাটা হলো। জীবনে প্রথমবার প্লেনে উঠলাম। পুরো পথটাই হাত কাঁপছিল।
কোরিয়ায় পৌঁছে ঠিকানাটা ধরে একটা ট্যাক্সি নিলাম।
দু’তলা একটা বাড়ি। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাক, কিন্তু অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
ডোরবেল চাপলাম—কেউ দরজা খুলল না।
বাইরের গেট খোলা ছিল। ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলাম।
সব কিছু এত পরিপাটি… কিন্তু কোথাও জীবনের কোনো ছাপ নেই।
ড্রয়িং রুমে ঢুকেই বুঝলাম কিছু একটা ঠিক নেই। সব কিছু এত গোছানো, যেন কেউ এখানে থাকে না। কোনো জুতো ছড়ানো নেই, কোনো কাপড় নেই, রান্নার গন্ধ নেই।
আমি ধীরে ধীরে ডাকলাম—
“মীরা…”
কোনো উত্তর নেই।
রান্নাঘরে গেলাম—অস্বাভাবিক পরিষ্কার। ফ্রিজ খুলে দেখি, প্রায় ফাঁকা।
উপরে উঠলাম।
প্রথম ঘরে একটা বিছানা—একজন মানুষের থাকার মতো। আলমারিতে শুধু মেয়েদের কাপড়।
কোনো পুরুষের অস্তিত্ব নেই।
দ্বিতীয় ঘরটা অফিসের মতো, কিন্তু ব্যবহার হয় না মনে হলো।
কাং জুন-এর কোনো চিহ্নই নেই।
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
শেষ ঘরটা খুলতেই… আমার পা কেঁপে উঠল।
ঘর ভর্তি কার্টন। কিছু খোলা।
ভেতরে—গুচ্ছ গুচ্ছ টাকা।
পেসো।
আমার মাথা ঘুরে উঠল।
প্রতি বছর যে ৮ মিলিয়ন পায়… তাহলে এই এত টাকা কোথা থেকে এলো? আর কেন লুকিয়ে রাখা?
হঠাৎ নিচে দরজা খোলার শব্দ।
কারো পায়ের আওয়াজ।
আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।
তারপর…
ঠক ঠক।
কেউ দরজায় কড়া নাড়ল।
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম…
—শেষ—
নাম: #নীরব_সত্য
#গল্প_ঘর