27/06/2026
ডা. কুশল আর ডা. সুসামা রেজার ডিভোর্স হয়েছে। অনেকে এটাকে বদনজরের ফল হিসেবে দেখছেন। আমার তা মনে হয় না।
সম্পর্ক যেমন সত্য, বিচ্ছেদও তেমনই সত্য। তাঁরা যদি একসঙ্গে না থেকে আলাদাভাবে ভালো থাকেন, তাহলে আমরা কেন জোরজবরদস্তি করে তাঁদের একসঙ্গে রাখতে চাই—এই মানসিকতা এখনো আমার বোধগম্য হয় না।
রিলেশনশিপ নিয়ে আমার ধারণা হচ্ছে, এটি খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। কিন্তু আমরা কেন যেন এটাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে ফেলি।
আপনার সঙ্গী যদি আপনার জন্য বেলিফুলের মালা না নিয়ে আসে, তাহলে ধরে নিতে হবে সমস্যা আছে। আপনার সঙ্গী যদি আপনার জন্য মজার মজার খাবার রান্না না করে, তাহলেও সমস্যা আছে।
এমন বহু ধারণা আমাদের সমাজে প্রচলিত।
আরও আছে—জীবনসঙ্গী বাছাই করতে গেলে কী কী দেখবেন? ছেলের কোন কোন বিষয় খেয়াল করবেন? মেয়ের কোন কোন বিষয় যাচাই করবেন?
কী অদ্ভুত সব ধ্যানধারণা!
কাম অন, গাইজ! জীবনের জন্য রিলেশনশিপ; রিলেশনশিপের জন্য জীবন নয়।
জীবনের কোনো কিছু নিয়েই এতটা সংবেদনশীল হওয়ার প্রয়োজন নেই। জীবনকে এত সিরিয়াসভাবে নেওয়ারও কিছু নেই।
বি ইজি। জীবনে কোনো কিছুই অপরিহার্য নয়। কেউই অপরিহার্য নয়।
জীবন বহমান নদীর মতো। বয়ে যাওয়া সময়ই জীবন।
“আমার ওকে পেতেই হবে। ওকে ছাড়া আমি সুখী হতে পারব না।”
“আমার সঙ্গী আমাকে ছাড়া অন্য কারও দিকে তাকাবে না। অমুক আমার, তমুক আমার। সে শুধু আমাকেই ভালোবাসবে।”
এগুলো ছেলেমানুষি চিন্তা ছাড়া আর কিছুই নয়।
সত্যি বলতে, প্রেম-ভালোবাসা বলে দুনিয়ায় আলাদা কোনো কিছুর অস্তিত্ব নাই। এগুলো হরমোনের খেলা—কখনো মানসিক, কখনো শারীরিক।
আমরা একটি পোশাক বড়জোর এক-দুই বছর পরি। খুব প্রিয় গাড়ি হলেও একসময় ভাবি, কত নতুন মডেলের গাড়ি এসেছে—এবার সেটি নিতে হবে। খুব প্রিয় মোবাইল হলেও ভাবি, সর্বশেষ মডেলের মোবাইলটি দরকার।
সেই আমরাই ধরে নিই, আমাদের সঙ্গী সারাজীবন শুধু আমাকেই ভালোবাসবে। আমাকে ছাড়া তার আর কিছুই ভালো লাগতে পারবে না।
বাট হোয়াই?
তার সামনে দিয়ে ঐশ্বরিয়া রাই হেঁটে গেলেও সে শুধু আমাকেই দেখবে!
কী অদ্ভুত!
আমার স্ত্রীর সামনে দিয়ে শাহরুখ খান হেঁটে গেলে সে কোন দুঃখে শুধু আমাকে দেখবে?
আমি কেনই-বা সেটা আশা করব?
সে তার মতো দেখবে। আবার সময় হলে আমাকেও দেখবে। প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা গুরুত্ব আছে জীবনে। গুরুত্বকে অনুধাবন করাই জীবনবোধ।
জীবনের কোনো কিছুই স্থির নয়, যেখানে জীবন নিজেই স্থির নয়।
আমাদের সম্পর্কগুলোতে আমরা কেমন যেন মালিক হয়ে গিয়েছি। সম্পর্ককে আমরা অধিকার হিসেবে দেখি।
“অমুক আমার জন্য এটা করবেই। কাগজে-কলমে লেখা আছে।”
আমাদের জীবনের সুখ-দুঃখও কেমন যেন এসব বিষয়কে ঘিরে তৈরি হয়ে গেছে।
ফেসবুকে হাজার হাজার সুখী মুখ ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই পাওয়া যায় তাদের নোনা কান্নার গল্প।
ফেসবুকে কেন আমাকে সুখী দেখাতে হবে? মানুষকে কেন প্রমাণ করতে হবে যে আমি সুখে আছি?
আমি আনন্দে আছি না কষ্টে আছি, সেটিই-বা দেখানোর কী আছে?
কেউ তো সব সময় আনন্দে কিংবা কষ্টে থাকবে না। কেউ কখনো আনন্দে থাকবে, আবার কখনো কষ্টে থাকবে। কেউ একসময় সফল হবে, আবার পরক্ষণেই সে হয়তো ব্যর্থ হবে।
কোন সফলতাই ফাইনাল সফলতা না, কোন ব্যর্থতাই ফাইনাল ব্যর্থতা না।
এটাই তো জীবনের চক্র।
প্রেম-ভালোবাসা কি নেই?
আমার মনে হয়, প্রচলিত অর্থে নেই।
তবে মায়া আছে। সহানুভূতি আছে। আমি অসুস্থ হলে সে আমাকে দেখবে। সে অসুস্থ হলে আমি তাকে দেখব।
সে আমার প্রিয় সন্তানের বাবা। সে আমার প্রিয় সন্তানের মা।
এই অনুভূতিগুলোই সত্য। দায়িত্ব সত্য।
আপনি যদি সন্তান নেন তবে আপনাকে দায়িত্ব নিতে হবে। যদি দায়িত্বকে বোঝা মনে করেন তবে সন্তান না নেওয়াই উচিৎ।
হাসপাতালের বাইরে যে চিন্তিত মুখটি আপনি দেখেন, সেটি মায়ায় জড়ানো কোনো মানুষের মুখ। আবার সেই মানুষটিও আশা করে, সে হাসপাতালে থাকলে আপনি একইভাবে চিন্তিত মুখে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবেন।
এটাই ভাইস ভার্সা।
এটি দান ও প্রতিদান। এতে দোষের কিছু নেই। এটাই বাস্তবতা।
আপনি যার জন্য কিছু করবেন, আপনি আশা করতেই পারেন সেও আপনার জন্য কিছু করবে।
কিন্তু সব সময় কি তা হয়?
অনেক সন্তান তার প্রিয় বাবা-মা অসুস্থ হলেও দেখতে আসতে পারে না। ব্যস্ততা তাকে আসতে দেয় না। এটিও এক ধরনের বাস্তবতা।
সেই সন্তানের কি কোনো অনুভূতি নেই?
অবশ্যই আছে। কিন্তু দূরে থাকতে থাকতে সেই অনুভূতির ওপর আস্তরণ পড়ে যায়। মায়া ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়। সে নিজেই টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। আসবে কীভাবে?
আবার দেখবেন, কোনো বন্ধু একসমুদ্র ভালোবাসা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মায়া নিয়ে বসে আছে। আপনার জন্য চোখের জল ফেলছে। এটিও সত্য।
আবার দেখবেন, কোনো অপরিচিত মানুষ আপনার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
অদ্ভুত এক সত্য।
এটাই জীবন।
প্রেম, ভালোবাসা ও সারপ্রাইজ—এসব নিয়ে গড়ে উঠেছে বিলিয়ন ডলারের বাজার। পৃথিবীজুড়ে কোম্পানিগুলো এর পেছনে বিলিয়ন ডলার খরচ করে। গান, সিনেমা, নাটক, গল্প ও কবিতা তৈরি হয়।
কারণ এগুলো ফ্যান্টাসি। আর ফ্যান্টাসির মধ্যেও দোষের কিছু নেই।
কারণ ফ্যান্টাসিতে সুখ আছে।
আমার মতো অনেকেই তাজমহলে গিয়ে আশাহত হয়েছেন।
মমতাজের কবর দেখতে এত দূর এলাম—হলো কিছু?
কিন্তু এটিকে ঘিরে এমন এক ফ্যান্টাসি তৈরি করা হয়েছে, মনে হয় তাজমহল না দেখলে জীবনটাই বৃথা!
তাই রিলেশনশিপ, অধিকার, সুখ, আনন্দ, দুঃখ, কষ্ট, হাসি, কান্না ও সম্পর্ক—এসব নিয়ে এত সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই।
জীবনকে তার আপন গতিতে চলতে দিন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সুখ উপভোগ করুন। সম্পূর্ণ সুখ বা পূর্ণ প্রাপ্তি বলে কিছু নেই। কোনো কিছুই আপনার জন্মগত অধিকার নয়।
জীবনে যা কিছুই পান, সেটাই অনেক। সেটাকেই বোনাস ভাবতে শিখুন।
আজ যদি আপনি সুস্থ থাকেন, অথবা অন্তত কিছুটা ভালো বোধ করেন; কেউ যদি আপনার খোঁজখবর নেয়, সামান্য যত্ন করে; কেউ যদি আপনাকে বেড়াতে নিয়ে যায়; আপনি যদি ভালো কোনো খাবার খেতে পারেন; হাসতে পারেন, হাঁটতে পারেন; কোনো বন্ধুর সঙ্গে মন খুলে গল্প করতে পারেন; কোনো বই পড়তে পারেন; প্রিয় কোনো সিনেমা বা সিরিজ দেখতে পারেন; আপনার প্রিয় মানুষগুলো যদি সুস্থ থাকে এবং পাশে থাকে—
সবগুলো নয়, এর মধ্যে কয়েকটিও যদি আপনার জীবনে ঘটে, তাহলে ধরে নিতে পারেন—
আপনি দারুণ আছেন।
আপনি অসাধারণ আছেন।