19/08/2026
বহুদিন পরে কিছু লিখলাম 🫶
আলমারি তে ভীষণ কালো একটা শাড়ি আছে। নতুন। ভাজ খুলেছিলাম। পরিনি। উপহার পেয়েছিলাম। সোনালি আচল আর পাড়, ভাজ খুলে দেখি জমিনে কমলা সুতোর কাজ! কি সুন্দর.. প্রথম দেখেই মনে হয়েছিলো এই শাড়িটা পরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখবো! এই ডিসেম্বর এই দার্জিলিং যাওয়ার প্লান চলছে.. কাঞ্চনজঙ্ঘার সাথে আমার দেখা হওয়ার কথা ভাবলেই আমি ঘোর অভিমানী হয়ে যাই! মনে হয় এইজন্যই কালো শাড়িটা দেখেই মনে হয়েছিলো রেখে দেই! এটা পরেই কাঞ্চনজঙ্ঘার সামনে দাড়াবো! চোখ ভর্তি করে কাজল পরবো, হাতে জার্মান সিলভার এর বালা পরবো!
সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ দেখি তুমি! চৌরাস্তার মোড়ে সবচেয়ে উঁচু, সবচেয়ে বড় বিলবোর্ডে! জানলাম তুমি গাইবে..!! সেই বছর বর্ষার পরে এই প্রথম আমি তোমাকে দেখলাম। এই প্রথম আমি তোমকে দেখলাম এভাবে!! বিলবোর্ডে তোমার বিশাল একটা ছবি। হাসিমাখা মুখ, দামি ফ্রেম এর গ্লাস, ধূসর নীল একটা ব্রান্ডেড শার্ট পরা! যেন নতুন দামী কাপড়ের গন্ধ ঠিকরে বের হচ্ছে ছবি থেকে! রাস্তার মাঝ পথে আমি থমকে ছিলাম প্রায় মিনিট দশেক। প্রথম ভাবনায় এলো এত যত্ন করে এত সুন্দর প্রিসাইজড বাশি ব্রেড কি করে বানালে!! ঝুপ করে সন্ধ্যা নামলো আমার ওখানেই। তোমার হাসিমাখা মুখের বিলবোর্ডে সন্ধ্যা বাতি জ্বলে উঠলো! আমার ঘোর কাটলো..!! সে এক অদ্ভুত অনুভূতি।। সন্ধ্যার আকাশের রঙ, বিলবোর্ডের ছবিতে পরনে তোমার শার্টের রঙ একদম মিশে গেছে ততক্ষণে! বিলবোর্ডের এল ই ডি লাইটের আলোয় তখন তোমার গান গাওয়ার দিনক্ষন আর ভেন্যু টা দেখে সেদিন বাড়ি ফিরলাম!!
পরদিন আবার গিয়ে দাড়ালাম। বিল বোর্ডের ঠিক উল্টো দিকে একটা চায়ের দোকান পেলাম।।যেখান বসে সোজা তাকালে তোমাকে দেখা যায়! একা মেয়ে মানুষ এইসব দোকানে চা খাওয়া যায়না। দল বেধে কতগুলো ছেলে মানুষ চা আর টা একত্রে টানছিলো। অগত্যা বেশিক্ষণ দাঁড়ানো গেলোনা!
পরদিন বৃহস্পতিবার । শুক্রবার শো। অরিন কে কল দিলাম। তুমি ছেড়ে যাবার পর অরিন ই থেকে গেছিলো কেবল আমার জীবনে। বাকিরাও যে যার মতন পালালো। পাছে ওদের ধরে বলি তোদের ইন্ধনেই সব হয়েছে!!
অরিন বললো সাথে যাবে। টিকেট এর ব্যবস্থা ও করে নিবে।বললাম আসবি? বিলবোর্ডে দেখলে চিনবিনা ওকে! অরিন ভেঙালো... দেখেছি৷ এখন কি বিলবোর্ড দেখতে বিলবোর্ড অবধি যেতে হয় নাকি!! সোস্যাল মিডিয়ায় তোমার আমার আমাদের সার্কেল এর সবাই নাকি ছবি টবি ছেড়েছে.. তোমার আবার ফ্যান ক্লাব হয়েছে সেখানেও দিনরাত পোস্ট হচ্ছে... শুনেও অরিন কে বললাম কাজ না থাকলে আয় চা খাবো..
সেদিন বিকেলে ঝুম বৃষ্টি!! অফিস থেকেই দেরিতে বের হলাম
অরিন কে লোকেশন দিলাম ঠিক চৌরাস্তার মোড়ে৷ রিকশা থেকে নামতে নামতেই দেখলাম অরিন দাঁড়িয়ে আছে সেই চায়ের দোকানের সামনে। আমাকে দেখেই বললো" তুই এই বিলবোর্ড এর সামনেই আমাকে দাড় করালি!! আমি পাত্তা না দেয়ার ভান করে বললাম আয় চা খাই! চা খেতে ডেকেছি। টানা ঘন্টা দেড়েক এর বৃষ্টির পরের সময় টায় সেদিন চায়ের দোকান টাও ফাকা পেলাম। অরিন কে নিয়ে বসলাম। মামা চা দিলো... অরিন বললো, ওর অফিস এর এক জুনিয়র নাকি আমাদের টিকেট নিয়ে শো এর আগে ভেন্যু তে আসবে। সেও জয়েন করবে। বললো তুই সত্যি যাবি? দেখা করবি? শিওর তুই?? আমি বললাম তা জানিনা। গান শুনতে তো যেতেই পারি.. চায়ের কাপে ঠোঁট রাখলাম। সামনের পিচঢালা ভেজা রাস্তা টা কেমন অন্ধকারের নদীর মত দেখতে!! সড়কবাতির আলোটা ভেজা রাস্তায় পড়লে মনে হয় নদীর জলে জোসনা খেলছে। অরিন কিছু বলে যাচ্ছে। আমি কেমন ঘোরে আছি.. ৮ টা বাজতেই বিলবোর্ডের এল ই ডি লাইট টা নিভে গেলো। চায়ের দোকানি মামাকে জিজ্ঞেস করলাম বিলবোর্ড টা নিভে গেলো কেন মামা!! মামা বললো "বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতেসে মামা, সরকারে আইন করসে""! কি আশ্চর্য আমার মন চাইছে এই বিলবোর্ডের লাইট টা সারা রাত্তির জ্বলুক!!
বাড়ি ফিরলাম। আলমারি খুলতেই চোখ গেলো সেই কালো শাড়িটায়!! নাহ এর চেয়ে বেটার অপশন আর হয়না। বহু বছর খোপা করে ফুল পরিনা। কিন্তু চুলে আর সেই খোপাটাই হয়না! চুলটা খোলাই রাখবো। রাস্তায় বেলী ফুলের মালা পেলে হাতে পেচিয়ে নিবো। জার্মান সিলভার এর একটা চোকার, এক জোড়া বালা শাড়িটার উপর ফেলে দেখলাম বেশ মানাচ্ছে। শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে আয়নায় তাকাতে তোমাকেই দেখলাম মনে হলো। কানে বাজলো তোমার গলায় কয়েকশত বার শুনতে চাওয়া " এ তুমি কেমন তুমি!!"
রাত বাড়ছে কেন যেন মনে হচ্ছে আমার শরীরের রক্ত সঞ্চালন দ্বিগুন হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই একবার মনে হলো তোমাকে একটা মেসেজ করি। মনে হলো তোমাকে লিখি আমরা কত বিকেল একসাথে এই বিলবোর্ডের স্বপ্ন বুনেছিলাম! শঙ্খচিল নামে একটা ক্যাফে তে তুমি গাইতে। আমি প্রতিদিন বিকেলে পড়ানো শেষে তোমার ক্যাফেতে গিয়ে বসতাম। মাসে ১৬০০ টাকা দিতো ওরা তোমাকে। আর ফ্রি কফি প্রতিদিন সাথে একটা স্যান্ডউইচ!! আমরা দুইজনে মিলেই সেই এক কাপ লাতে আর স্যান্ডউইচ টা খেতাম.. আজকে বিকেলে চায়ের দোকানে তোমার বিলবোর্ডের সামনে চা নিয়ে বসে আমি সেই ক্যাফের দিন গুলোতেই চলে গেছিলাম.. মনে হলো তোমাকে এই অনুভূতি টা জানাই!! কিন্তু তোমার কোনো নাম্বার বা কিছুই আমার কাছে নেই। একবার মনে হলো কারো কাছে চাই.. আমাদের সার্কেল এর অনেকেই তোমার সাথে যোগাযোগ রেখেছে। রাখেনি আমার সাথে। কারণ ওরাও জানতো তুমি একদিন পাবলিক ফিগার হয়ে যাবে। তখন তোমার সাথে পার্সোনাল যোগাযোগ থাকাটা সম্মানে খানিক মাত্রা যোগ করে।কেবল আমারই তোমার সাথে যোগাযোগ এর কোনো তাগিদ ছিলোনা।
শেষ দেখার দিনে আমি যখন প্রচন্ড ভয়ে কেঁদে বলছিলাম তুমি একবারো বলতে পারছোনা কেন যে তুমি আছো আমার সাথে?? তুমি তখনো ভীত, কুকড়ে যাওয়া, কোনো রা নেই.. উত্তর না পেয়ে সেই যে চলে এলাম। আর ফিরে যাওয়া হলোনা.. তোমার সাহস, তোমার আত্নবিশ্বাস কেবল দেখেছিলাম তোমার গানেই!! কি ভীষণ ভারিক্কি সেই সুরে, কন্ঠে!! তোমার যত অধিকার এর জোর কেবল ছিলো গানের সাথেই!!সেই প্রমান এই বিলবোর্ড!
ভাবতে ভাবতে কেমন অভিমান চেপে বসলো আমার! খেয়াল হলো, তুমিতো ডাকোনি আমাকে!! একবার ও! তুমিতো খবর পাঠালে না কোনো! আমিতো সেলিব্রেটি না.. আমার ফোন নাম্বার পাওয়া মামুলি ব্যাপার! কই তুমিতো লিখলেনা আমাকে! এসো, আমি গাইবো! যেভাবে আমি গাইতে চেয়েছি আজীবন! যেই চাওয়ার দিনগুলোর গল্প কেবল আমার কাছেই জমা!! কই আমাকেইতো ডাকলেনা তুমি!! ইশ কি প্রচন্ড বোকা আমি!! অভিমান কেমন ক্ষোভে বদলালো!! সম্বিত ফিরলো। দেখলাম বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভোর হবে এবার!! নিজেকে অনেকটা শান্ত লাগছে। ক্লান্ত লাগছে। ঘরে এসে শাড়িটায় চোখ পরলো। আচ্ছা এই শাড়িটা পরে তো আমার কাঞ্চনজঙ্ঘা যাওয়ার কথা ছিলো!! আমার কাছে কি কাঞ্চনজঙ্ঘা আর তুমি এক হয়ে গেলে! নাকি আমার অভিমান গুলো মিলেমিশে এক হয়ে গেলো!
শাড়িটা তুলে রাখলাম। ভাবলাম, যে স্বপ্ন টা আমার হাত ছেড়ে দিয়ে ছুতে চেয়েছিলে আজ সেই স্বপ্ন ছোয়ার দিনে আমি হাতে বেলী ফুল পেচিয়ে সামনে গিয়ে দাড়ালে যদি তোমার আবার " কনসেনট্রেশান নষ্ট হয়!" সেই বছর ৫ আগে একদিন যেভাবে কনসেনট্রেশান এর ভাগ আমায় দিতে চাওনা বলে হাত টা ছেড়ে দিয়েছিলে!! নাহ, এই বেলা আর তোমার সামনে বাধা হয়ে দাড়াবোনা! অরিন কে মেসেজ করলাম " আজকে একটু ঘুমাবো, ডাকিস না। "
অরিন আমাকে ডাকলোনা। কেউই ডাকলোনা। সেদিন বেঘোরে ঘুমোলাম। সামনের সারিতে আমার উপস্থিতি ছাড়াও তোমার শো সাকসেসফুল হলো। অরিন অন্তত তাই লিখলো মেসেজ এ.. তার একদিন পর চৌরাস্তা ক্রস করার সময় তাকিয়ে দেখলাম বিলবোর্ড এ তুমি নেই। ফাঁকা.. অন্য কোনো বিজ্ঞাপন এর অপেক্ষায়। ভেতরটা ফাঁকা লাগলোনা। বরং কেমন হালকা বোধ করলাম। ৫ বছর পরে.. জানলাম, আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই গেছে! কিছুই বাকি নেই..
-বিলবোর্ড!( হুমায়রা)