09/09/2026
অন্তরঙ্গ বুধবার ১১৯
আত্মকাহিনী এক
চলেন গল্প করি। বহুদিন গল্প করা হয় না। কাজের চাপে ডুবতে ডুবতে বুঝলাম, গল্পই আসলে ভাসিয়ে রাখতে পারে।
আমার কাস্টমার বেইজে প্রবাসীরা ৮০% আর দেশে বসবাসকারীরা ২০% জায়গা দখল করে আছে। কারণ হিসেবে আমি মনে করি, প্রবাসীরা এক্সেপশনাল জিনিস চান ব্র্যান্ড ফলো কম করেই, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরকে তাঁরা সহযোগিতা করতে চান, তাঁরা তাঁদের উপার্জিত অর্থের একটা বড় অংশ দেশীয় পণ্যে ব্যয় করতে চান, তাঁরা সুন্দর কিন্তু mass প্রডাকশন নয়... এমন পণ্যের ভক্ত, আর বৈশ্বিক বাজারে একই মানের পণ্যের দাম দেখেন বলেই আমাদের কাজের মান ও দামের হিসাবটা তারা সহজে বুঝতে পারেন।
আমি যখন জামদানী শাড়ি নিয়ে কাজ করতাম, তখন আমার যেই পরিমাণ সেল হত, জামদানী শাড়ি নিয়ে কাজ ছাড়ার পর প্রায় তিন বছর হতে চলল, আমার সেল এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। অথচ আমি এক দিনের নোটিশে জামদানী শাড়ি নিয়ে কাজ করা ছেড়ে দিয়েছি।
তারপর শুরু করলাম জামদানী স্যুভেনির নিয়ে কাজ করা। আমি যেদিন বুটক্যাম্পে জামদানী স্যুভেনির বিষয়ে আমার পিচ ডেকে হাইয়েস্ট নম্বর পেলাম, সেদিন বাসায় ঢোকার পর মেসেজ পেলাম, আমার স্যুভেনিরের আর্টিসান অজানা কারণে আর আমার সঙ্গে কাজ করবেন না।
সকালে যে নম্বরটা নিয়ে এত আনন্দে ভেসেছি, বিকেলে সেটা যেন অন্য কারো জীবনের ঘটনা মনে হচ্ছিল। এতটাই দূরের, এতটাই অসংলগ্ন! ততদিনে জীবনের প্রথম ধাক্কা খেয়ে বেশ খানিকটা শক্ত হয়েছি।
আর মনে মনে জেনে গেছি, একটা বিকল্প ব্যবস্থা হবেই। আর্টিসানকে জিজ্ঞেস করলাম, কী কারণ? পারিশ্রমিক বেশি চায়, নাকি অন্য কিছু? আমরা আলোচনা করতে পারি যে কোন সমস্যা নিয়েই। তিনি আলোচনা করতে নারাজ। কাজও করবেন না।
আমি সে যাত্রাতেও কীভাবে কীভাবে জানি উৎরে গেলাম। এদিকে জামদানী শাড়ি নিয়ে কাজ করিনা, একদিনের নোটিশে ছেড়ে দিলাম, মাঝে মাঝেই ভরদুপুরে হাপুশ নয়নে লুকিয়ে কাঁদি। ছেড়ে দেওয়ার জন্য নয়, কত অসমাপ্ত কাজ বাকি রয়ে গেছে, সেই বেদনায়।
তারেক একদিন দেখে ফেলল আর তারপর সে নানান খোঁজখবর করে আমাকে তাঁতীদের নম্বর যোগাড় করে দিতে শুরু করল। আমি ফোন করি। এক দুই কথার পরই বুঝে যাই, তাঁরা কেমন। কেউ আর পাশ করে না। আমি বুঝে যাই, আমি যেমন চাচ্ছি, তারা তা পারবে না। বাদ দিলাম সেই চ্যাপ্টার।
টুকটাক মেলা করি অফলাইনে। সব স্টলে বন্ধু পরিচিতরা উপচে পড়ে। আমার আট বছরের বিজনেসের অফলাইন মেলায় আমার স্টলে আজ পর্যন্ত তেমন দৃশ্য চোখে পড়েনি। আমার বন্ধুবান্ধব, স্বজনদের হাতে গোনা কয়েকজন আসেন স্টলে। আর বাদবাকি দর্শক ও ক্রেতাদের বেশিরভাগই একেবারে নতুন, অচেনা মানুষ।
আমি নিজে গান পারি না, নৃত্য পারিনা। কিন্তু আমার পরিমণ্ডলে এমন মানুষের সংখ্যা অজস্র। তাঁদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও সারা বছর নিয়ম করে হয়, আর তাঁরা সেসব অনুষ্ঠানে নতুন শাড়ি কমবেশি পরেনই। তবু এই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে আমি কখনো কোনো বাল্ক অর্ডার পাইনি।
বন্ধুদের মারফত তিনবার বাল্ক অর্ডার পেয়েছি এই আট বছরে। বাকি সব এসেছে অচেনা মানুষদের কাছ থেকে—কিনতে কিনতে যাঁরা পরে বন্ধু হয়ে গেছেন।
'পরিচিত পরিমণ্ডল' সব সময় 'পরিচিত ক্রেতার পরিমণ্ডল' হয় না— এটা বুঝে এসেছি আট বছর হতে চলল, আর মেনে নিতে শিখেছি বছর দুয়েক হল।
চলবে...
Afrin Ahmed,
Owner,
On Cloud Nine And Half
Wear your voice!