08/05/2025
পান্তা ভাত অ্যাসিড রিফ্লাক্স, ডাইজেস্টিভ ইস্যুতে খুব ভালো একটা খাবার। একদম দেশীয় প্রোবায়োটিক। কিন্তু এটা ঠিকভাবে তৈরির নিয়ম আমরা বেশিরভাগই জানি না। কতোটুকু পানি দিচ্ছি, কতোক্ষণ রাখছি এগুলো ইচ্ছেমতো করি। এই লেখাটা পড়লেই আশা করি আর কারো ভুল হবে না।
পান্তা ভাতের মতো যেকোন প্রোবায়োটিক খাবার ফার্মেন্টেশান প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়। ফার্মেন্টেশান মূলত ব্যাকটেরিয়া, ইস্টের বেঁচে থাকার একটা মেটাবোলিক প্রক্রিয়া যেখানে এরা অক্সিজেনের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিতে খাবারের উপাদান ভেঙে নিজেদের জন্য শক্তি তৈরি করে আর খাবার ভাঙার ফলে অন্য কিছু উপাদান যেমন, অ্যালকোহল, অ্যাসিড ইত্যাদি আমরা পাই।
কিছু ব্যাকটেরিয়া অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে এই খাবার ভাঙে আর তখন অ্যাসিড তৈরি হয়। অক্সিজেনের উপস্থিতিতে যারা খাবার ভাঙে সেখান থেকে অ্যালকোহল তৈরি হয়।
এখন কথা হচ্ছে, ভাত ফার্মেন্ট করে আমরা কী চাই বা পাই? মূলত পাই, ল্যাকটিক অ্যাসিড। দইয়ে যে ফার্মেন্টেশান হয়, একই জিনিস ভাতেও হয়। ভিনেগার, অ্যাপেল সিডার ভিনেগার এগুলোতে তৈরি হয় অ্যাসিটিক অ্যাসিড।
কিন্তু ভাত থেকে যদি আমরা অ্যালকোহল পেতে চাই? তাহলে ফার্মেন্টেশানের সময় মেইনলি অক্সিজেনের প্রয়োজন হবে।
বেসিক ক্লিয়ার হয়ে গেলে, এখন খুবই সহজ বুঝতে পারা যে ভাতে কতোটুকু পানি দিয়ে ফার্মেন্ট করবো? যেহেতু ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করবো, তাই ভাত পানির ১-২ ইঞ্চি নিচে ডুবে থাকবে যেন বাতাস না পায়। কাপে মেপে পানি হিসেবের কোন প্রয়োজন নেই।
এখন প্রশ্ন হলো, কতোক্ষণ রাখবো? যতোক্ষণ না আমরা পানিতে বুদবুদ দেখতে পাই এবং স্বচ্ছ পানি ঘোলাটে হয়ে আসে। রাতে ভেজাবো নাকি দুপুরে ভেজাবো, ১২ ঘণ্টা নাকি ২৪ ঘণ্টা এই হিসাবও অপ্রয়োজনীয়। কারণ পরিবেশের তাপমাত্রা অনুযায়ী, ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা অনুযায়ী এই সময় পরিবর্তিত হবে।
এরপরে প্রশ্ন আসতে পারে, কোন চালের ভাত নিবো? সহজ উত্তর আপনি কী চান এই পান্তা ভাত থেকে তার উপর নির্ভর করে। আমি চাই, সিম্পলি প্রোবায়োটিক খাবার খেতে। সেক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়ার লাগবে স্টার্চ যেটা সে চট করে ভাঙবে। স্টার্চের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে সাদা চালে।
যদি লাল চাল নিই, তাহলে পান্তা হবে না? হবে কিন্তু সময় অনেক বেশি লাগবে কারণ রান্নার পরেও লাল চালের ফাইবার বাইরে থেকে সরিয়ে ভেতরের স্টার্চ ভাঙতে ব্যাকটেরিয়ার সময় বেশি লাগবে। সাদা ভাত যদি পান্তা করতে ২৪ ঘণ্টা লাগে, লাল ভাত লাগবে আনুমানিক ৪৮ ঘণ্টা। টেক্সচার এবং স্বাদও আলাদা হবে। সাদা পান্তার টেক্সচার হবে নরম। লালটার হবে চিউয়িং গামের মতো। সাদা ভাতের পান্তায় সহজে ল্যাকটিক অ্যাসিডের টক স্বাদ পাওয়া যাবে, লালটার স্বাদ আলাদা হবে কিছুটা।
রান্নার কতোক্ষণ পরে ভাতে পানি দিবো? ভাত ঠাণ্ডা করেই পানি দেয়া যায়। দুপুরে রান্না করে রাতে পানি দেয়া অর্থহীন। বাতাসে যতো বেশি থাকবে অ্যালকোহল এবং পরবর্তীতে পানিতে অ্যাসিটিক অ্যাসিড ফার্মেন্টেশান হবে। সুতরাং ভাত পুরনো করে ঘামিয়ে, নরম করে পানি দেয়া অপ্রয়োজনীয়।
কোন পাত্রে ফার্মেন্ট করবো? যে পাত্র ফার্মেন্টেশানে তৈরি হওয়া অ্যাসিডের সাথে রিয়্যাক্ট করবে না। মেলামাইল, প্লাস্টিক বা অ্যালুমিনিয়াম কিছুতেই না। কাঁচ, মাটির পাত্র ব্যবহার করতে পারেন। মাটির পাত্রের আরেকটা সুবিধা হলো, তাপমাত্রা সহজে বের হয় না।
পানি দিয়ে ভাত ঢেকে রাখবো নাকি খোলা রাখবো? অবশ্যই ঢেকে রাখতে হবে যেন ধুলো, মাছি, পোকা এগুলো না পড়ে।
ভাতে পানি দিয়েই ভারতীয় স্টাইলে তাড়কা ঢেলে দিলে কী হবে? ফার্মেন্টেশানে অনেক দেরি হবে। পানি ভেজানো ঠাণ্ডা ভাত, তাড়কা খাবেন কিন্তু সেটা প্রোবায়োটিক হিসেবে কাউন্ট হবার সম্ভাবনা কম। পুরোপুরি পান্তা খেতে চাইলে ফার্মেন্ট করে নিয়ে খাবারের আগে আগে তাড়কা বা যা ইচ্ছে নিয়ে খেতে পারেন।
ভাত ভিজিয়ে অনেকেই সাথে দই দিয়ে রেখে দেয়। সেক্ষেত্রে ফার্মেন্টেশান আরো দ্রুত হবে। কারণ দইয়ে অলরেডি ব্যাকটেরিয়া থাকবে। ভাত, পানি আর দই মিশিয়ে রাখলে এক রাতের মাঝেই প্রোপারলি পান্তা ভাত পাওয়া সম্ভব।
আরেকটা কাজ করতে পারেন, যেটা আমি করি। প্রথমদিন পান্তা বানিয়ে খাওয়ার পর আধা কাপ পানি ফ্রিজে রেখে দিই। পরের দিনের ফ্রেশ পানির সাথে এই পুরনো পানিটা ঢেলে দিলে পান্তা দ্রুত হয়।
পান্তার পানিও সমানভাবে ভালো। ফেলে না দিয়ে খেয়ে ফেলবেন। আর পান্তা হয়ে গেলে যদি খেতে দেরি হয়, তাহলে ফ্রিজে রাখবেন। এতে ফার্মেন্টেশান প্রসেস থেমে যাবে। কারণ এই প্রসেসটা তাপমাত্রা সেনসিটিভ। দই যেমন উষ্ণ জায়গায় পাততে হয়, এটাও তেমনি। হয়ে গেলে যেমন ফ্রিজে রাখতে হয়, এটাও তেমনি। কিন্তু ৩৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসের চেয়ে বেশি তাপমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া মরে যায়। মানে খুব গরমে ফার্মেন্টেশান হবে না।
আশা করি, ঠিকভাবে পান্তা ভাত তৈরি করে খেতে আর কোন সংশয় থাকবে না।