17/06/2026
আমাদের ডিভোর্সের আট বছর পর, আমার প্রাক্তন স্বামী আমাদের কলেজের পুনর্মিলনীতে আমাকে দেখে হেসে বলল, “এখনও একা, অনন্যা?” সে জানত না যে আমি আবার বিয়ে করেছি—আর সেই হলের যে মানুষটাকে সে সবচেয়ে বেশি ভয় পেত, সেই মানুষটিই একটু পর সবার সামনে আমাকে নিজের স্ত্রী বলে পরিচয় দিতে যাচ্ছে।
নিমন্ত্রণপত্রটি আমার ডাইনিং টেবিলে টানা দুই দিন ধরে একটা ফাঁদের মতো পড়ে ছিল।
অফ-হোয়াইট খাম।
সোনালী অক্ষরে লেখা—**২০১০ ব্যাচের পুনর্মিলনী, ঢাকা বিজনেস স্কুল (ডিবিএস)।**
চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিল, আর আমি ওটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। দীর্ঘ আট বছর। আটটি বছর আমি এই মুখগুলোর মুখোমুখি হইনি। আট বছর আগে আমি এক কাপড়ে, একটা ভাঙা সংসার আর এক বুক ক্ষোভ নিয়ে রাফসান আহমেদের বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছিলাম। আর পেছনে ফেলে এসেছিলাম একদল মানুষের কানাঘুষা—মেয়েটা সংসার ধরে রাখতে পারল না!
অথচ একসময় আমাদের ব্যাচের সবচেয়ে মেধাবী মেয়ে বলা হতো আমাকে।
তারপর রাফসানের সাথে আমার বিয়ে হলো।
আর রাতারাতি আমার পরিচয় হয়ে গেল—"স্বামী পরিত্যক্তা নারী।"
মানুষের ড্রয়িংরুমের মুখরোচক গল্প।
বত্রিশ বছর বয়সে এসে আমি একটা জিনিস খুব ভালো করে বুঝেছি—ডিভোর্স শুধু একটা বিয়েই ভেঙে দেয় না, সমাজকে অধিকার দিয়ে দেয় আপনার নামটা নিয়ে যত্রতত্র চিবিয়ে খাওয়ার। রাফসান এই কাজটা খুব নিখুঁতভাবে করেছিল। সে সবাইকে বলেছিল আমি নাকি বড্ড অহংকারী, ক্যারিয়ার ছাড়া কিছু বুঝি না, ভীষণ কোল্ড আর ঘরকন্ঠার কাজের অযোগ্য।
সে কাউকে বলেনি যে সে কীভাবে আমার অল্প বেতনের চাকরিটা নিয়ে প্রতিনিয়ত খোঁটা দিত। বলেনি কীভাবে তার মা আমার আলমারি চেক করত, যেন আমি চোর! সে এও বলেনি যে একদিন সে আমার এমবিএ-র সার্টিফিকেটটা মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলেছিল, "ডিগ্রি দিয়ে তো আর ভালো বউ হওয়া যায় না!"
এরপর আমি আর কোনো রিইউনিয়নে যাইনি। একটাতেও না।
কিন্তু এবার আমন্ত্রণপত্রের নিচে হাতে লেখা একটা লাইন ছিল:
"প্লিজ এসো, অনন্যা। কিছু মানুষের দেখা দরকার তুমি আজ কোথায় পৌঁছেছ।"
কোনো নাম সই ছিল না। শুধু ওই একটা বাক্য।
তাই আমি গেলাম।
আমি একটা গাঢ় সবুজ রঙের জামদানি শাড়ি পরলাম, কানে ছোট ডায়মন্ডের টপ, আর মুখে সেই শান্ত ভাব—যা কোনো প্রশংসার অপেক্ষায় থাকে না।
উত্তরা’র ফাইভ স্টার হোটেলের বলরুমটা ফেয়ারি লাইট আর বিলাসী আবহাওয়ায় ঝলমল করছিল। পুরনো সহপাঠীরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করছিল। পুরুষরা নিজেদের গাড়ির মডেল নিয়ে বড়াই করছিল, আর নারীরা তুলনা করছিল তাদের সন্তান, বিদেশ ভ্রমণ, স্কিন ট্রিটমেন্ট আর স্বামীদের।
আমি রেজিস্ট্রেশন ডেস্কের কাছে পৌঁছানো মাত্রই কেউ একজন ফিসফিস করে আমার নাম উচ্চারণ করল। তারপর আরেকজন। পুরো রুমের মানুষ যেন হঠাৎ আমাকে মনে করতে পারল।
"অনন্যা রায়হান না?"
"কতদিন পর!"
"ওকে তো বেশ অন্যরকম লাগছে।"
"একাই এসেছে নাকি?"
শেষ প্রশ্নটা রাফসানের গলা থেকে এসেছিল। না তাকিয়েও আমি ওই কণ্ঠ চিনতে পারি। ও বারের কাছে একটা নেভি ব্লু সুট পরে দাঁড়িয়ে ছিল। আগের চেয়ে কিছুটা মুটিয়ে গেছে, কিন্তু ঠোঁটের সেই চেনা হাসিটা একই আছে—এমন একটা হাসি, যেন এই পৃথিবীর সব ডমিনেন্স তারই।
তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তার দ্বিতীয় স্ত্রী, নাবিলা। লাল শাড়ি আর হাতভর্তি সোনার চুড়ি পরে সে আমার দিকে এমন এক অলস কৌতূহল নিয়ে তাকাল, যেন রাতে ঘুমানোর আগে রাফসান তাকে আমার চরিত্রের সবচেয়ে কুৎসিত গল্পগুলো শুনিয়ে ঘুম পাড়াত।
রাফসান ধীরপায়ে আমার দিকে এগিয়ে এল।
"অনন্যা," সে বলল, "কী সারপ্রাইজ!"
আমি হাসলাম, "রাফসান।"
তার হাসির ধার আরও বেড়ে গেল। "এখনো একাই আসো সব জায়গায়?"
আশেপাশের মানুষজন এমন ভাব করছিল যেন তারা কিছুই শুনছে না, যার মানে হলো—সবাই কান খাড়া করে আছে।
নাবিলা মৃদু হাসল, "রাফসান আমাকে বলেছিল তুমি নাকি ভীষণ ক্যারিয়ার-ওরিয়েন্টেড। কিছু মেয়ে আসলে ফ্যামিলির চেয়ে ফাইলের গুরুত্ব বেশি দেয়।"
আশেপাশের কয়েকজন অস্বস্তিকর হাসি হাসল। আমি আমার ক্লাচ ব্যাগটা শক্ত করে ধরলাম। দুর্বলতার কারণে নয়, বরং পুরনো ক্ষতগুলো তার মালিককে চেনে বলেই।
রাফসান আরও একটু কাছে এগিয়ে এল, "তুমি যে আসবে আগে জানালে পারতে। তোমার সাথে বসার জন্য অন্তত একজন পার্টনারের ব্যবস্থা করে দিতাম।"
"তোমার অনেক দয়া," আমি বললাম।
সে হালকা হাসল, "এটাই তোমার সমস্যা ছিল। অতিরিক্ত ইগো। দেখলে তো, অহংকার তোমাকে কোথায় এনে দাঁড় করালো?"
আমি তার দিকে তাকালাম। এই সেই লোক যার জন্য আমি একসময় রাতে বালিশ ভিজিয়ে কাঁদতাম। এই সেই লোক যার নাম আমার পাসপোর্ট আর আইডি কার্ড থেকে মুছে ফেলতে গিয়ে আমার হাত কাঁপছিল মাসের পর মাস। অথচ সে ভাবছে, সে যেখানে আমাকে ফেলে গিয়েছিল, আমি আজো সেখানেই থমকে আছি।
সে তার গ্লাসটা বাতাসে তুলল, "টু ওল্ড মেমোরিজ! আর আমাদের নতুন জীবনের জন্য। আমরা অন্তত পরিবার তো গড়তে পেরেছি।"
নাবিলা আলতো করে তার পেটে হাত রাখল। সে প্রেগন্যান্ট। অবভিয়াসলি। পুরো রুমের মানুষ সেটা নোটিশ করল, আর রাফসান ঠিক সেটাই চেয়েছিল। কেউ একজন হাততালি দিল, কেউ অভিনন্দন জানাল।
তারপর সে আবার আমার দিকে ঘুরল, "তা অনন্যা, এখনো কি কোনো ছোটখাটো ফার্মে চাকরি করছ?"
আমার হাসি পেয়ে গেল। ছোটখাটো ফার্ম! সে যদি জানত। কিন্তু কিছু জবাব দেরিতে দিলেই বেশি সুস্বাদু লাগে।
"চাকরি করছি," আমি সংক্ষেপে বললাম।
"ভালো," সে উত্তর দিল, "একাকী মানুষদের ব্যস্ত থাকাটাই শ্রেয়।"
কথাগুলো তীরের মতো এসে বিঁধল। ঠিক আগের মতোই নিষ্ঠুর আর চেনা। এক সেকেন্ডের জন্য আমি আবার চব্বিশ বছরের সেই মেয়েটি হয়ে গেলাম, যে রাফসানের মায়ের রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল কারণ একটা রুটি পুড়ে গিয়েছিল। আর রাফসান ড্রয়িংরুমে বসে বন্ধুদের বলছিল, "বাদ দাও তো, ওসব ফ্যামিলি মেইনটেইন করা ওর কাজ না।"
ঠিক তখনই আমার ফোনটা ভাইব্রেট করল। একটা মেসেজ—*পিকড আপ। ৫ মিনিটে ঢুকছি।*
রাফসান নামটা দেখার আগেই আমি স্ক্রিন লক করে দিলাম। ও সেটা খেয়াল করল।
"বয়ফ্রেন্ড?" সে হেসে জিজ্ঞেস করল।
"না।"
"আহা, তাহলে কেউ একজন আছে?"
নাবিলা মিষ্টি করে হেসে বলল, "ভালো তো। একটা... 'ব্যর্থতা'র পর সবারই তো একজন সঙ্গী দরকার হয়।"
'ব্যর্থতা' শব্দটা পুরো সার্কেলের মধ্যে সুগন্ধির মতো ছড়িয়ে পড়ল। দামি, কিন্তু পচা সুবাস।
আমি আমার জুসের গ্লাসটা টেবিলে রাখলাম। "নাবিলা," আমি শান্ত গলায় বললাম, "একটা মেয়ের টিকে থাকার লড়াইকে 'ব্যর্থতা' বলো না, শুধু এই কারণে যে একজন পুরুষ তোমাকে তার নিজের সুবিধামতো বানানো গল্প শুনিয়েছে।"
নাবিলার মুখের হাসিটা জমে গেল। রাফসানের চোখ দুটো শক্ত হয়ে উঠল, "মুখ সামলে কথা বলো, অনন্যা।"
সেই পুরোনো হুমকি। আমি একটু স্পষ্ট করে কথা বললেই ও এই টোনে কথা বলত।
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই হলের লাইটগুলো নিভে গেল। অনুষ্ঠানের হোস্ট স্টেজে উঠলেন।
"লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, ডিনারের আগে আমাদের একটা বিশেষ অ্যানাউন্সমেন্ট আছে। আজ রাতে আমাদের প্রধান অতিথি এমন একজন মানুষ, যাকে আপনারা সবাই নামে চেনেন, যদিও সামনাসামনি দেখার সুযোগ হয়নি।"
পুরো বলরুমে একটা গুঞ্জন শুরু হলো। রাফসান সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখে লোভ আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা চকচক করে উঠল। সে ফিসফিস করে নাবিলাকে বলল, "ইনি নিশ্চয়ই আরিশ খন্দকার। ওনার সাথে যদি আজ রাতে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাকা করতে পারি, আমাদের কোম্পানির নতুন প্রজেক্ট ডান!"
আমি এন্ট্রান্সের দিকে তাকালাম। দরজা এখনো খোলেনি।
হোস্ট হেসে বলতে লাগলেন, "তিনি 'খন্দকার গ্লোবাল ভেঞ্চার্স'-এর ফাউন্ডার, বাংলাদেশের অন্যতম বড় এডুকেশন ফান্ডের পেছনের মানুষ, এবং আমাদের আজকের এই রিইউনিয়নের পুরো স্পন্সর।"
রাফসান তার সুটের কাফলিঙ্ক ঠিক করল। নাবিলা তার শাড়ির আঁচল টেনে নিল। হলের অর্ধেক মানুষ দরজার দিকে ঘুরে তাকাল।
তখনই হোস্ট শেষ লাইনটি বললেন—
"কিন্তু ওনাকে স্টেজে ডাকার আগে, ওনার একটা ব্যক্তিগত অনুরোধ আছে। উনি বলেছেন, উনি আজ রাতে এখানে কোনো চিফ গেস্ট হিসেবে প্রবেশ করতে চান না... বরং এই ২০১০ ব্যাচের সবচেয়ে স্ট্রং এবং সাকসেসফুল মেয়েটির স্বামী হিসেবে প্রবেশ করতে চান।"
রাফসান মনে মনে হেসে ফিসফিস করল, "কার ভাগ্য খুলে গেল রে বাবা!"
ঠিক তখনই বলরুমের বিশাল দরজা দুটো খুলে গেল। আর ভেতরে পা রেখেই, দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী আরিশ খন্দকার পুরো হলের ভিড়ের মাঝে সবার প্রথমে যার চোখ খুঁজছিল—সেটি ছিলাম আমি।
👉🏻নীরবতার_প্রতিধ্বনি
পর্ব_ ০১ চলবে
Asim_valobasa