10/06/2026
“অতিন খালেদ আল-মাসরি”। মাত্র ৮ বছর বয়সে সে পুরো সিরিয়ার ‘পাঠ চ্যালেঞ্জ’-এ দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই অল্প বয়সেই সে প্রায় ২০০টি কিতাব পাঠ করে শেষ করেছে। তার এই অসাধারণ অর্জনের জন্য সিরিয়া সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে সম্মাননা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে।
একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন...!
একটি রাষ্ট্র কেমন প্রজন্ম চায়, তা বোঝা যায় সেই রাষ্ট্র কাদের সামনে তুলে ধরে, সম্মানিত করে এবং কাদেরকে অনুসরণীয় হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে।
একটি রাষ্ট্র যখন ছোটবেলা থেকেই শিশুদের বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে চায়, তাদের জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করে, পাঠাভ্যাসকে সম্মানিত করে এবং মেধাকে পুরস্কৃত করে তখন সেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে একটি চিন্তাশীল, মননশীল ও সভ্য প্রজন্ম গড়ে তোলে।
সিরিয়ায় একটি ৮ বছরের শিশুকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করা হচ্ছে কারণ সে বই পড়েছে, জ্ঞান অর্জন করেছে, চিন্তা করতে শিখেছে। রাষ্ট্র তার শিশুদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে যে বই পড়া গৌরবের, জ্ঞান অর্জন সম্মানের, চিন্তাশীল হওয়া সফলতার প্রতীক। ফলে সেখানে ছোটবেলা থেকেই বইয়ের সঙ্গে শিশুদের গভীর সখ্যতা গড়ে উঠছে। তারা শুধু তথ্য মুখস্থ করছে না; তারা ভাবতে শিখছে, বিশ্লেষণ করতে শিখছে, প্রশ্ন করতে শিখছে। এর ফলাফল দেখা যায় তাদের চিন্তার গভীরতায়, কথাবার্তায়, মূল্যবোধে এবং সামাজিক আচরণে।
অন্যদিকে আমাদের দেশের বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই উদ্বেগজনক।
আমাদের সমাজে বইপড়া, গবেষণা, জ্ঞানচর্চা কিংবা মননশীলতাকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, বাস্তবে ততটা দেওয়া হয় না। বরং অনেক সময় এমন সব কনটেন্ট ও ব্যক্তিত্বকে সামনে আনা হয়, যাদের মূল শক্তি জ্ঞান নয়, বরং সাময়িক বিনোদন, চটকদার উপস্থাপনা কিংবা ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা।
আজকের শিশু-কিশোরদের বড় একটি অংশ বইয়ের পাতার চেয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে বেশি সময় কাটাচ্ছে। রিলস, শর্ট ভিডিও, ভাইরাল ট্রেন্ড এবং তাত্ক্ষণিক জনপ্রিয়তার সংস্কৃতি তাদের মনোজগৎকে ক্রমশ গ্রাস করছে। তারা গভীর মনোযোগ দিয়ে একটি বই পড়তে পারছে না, কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করতে পারছে।
এর প্রভাব শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে নয়, সামাজিক আচরণেও পড়ছে।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যের ঘরগুলো একবার চোখ রাখলেই বোঝা যায়, আমরা মানসিকতা ও মূল্যবোধের দিক থেকে কোন পথে এগোচ্ছি। আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশের
চিন্তাধারা ও রুচির প্রতিফলন যেন সেখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি মেয়ের ছবি, কোনো নারীর সাফল্যের খবর, কিংবা একটি একেবারেই সাধারণ ভিডিওর নিচেও প্রায়ই এমন নোংরা, অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য দেখা যায়, যা একটি সভ্য ও সুস্থ সমাজে কল্পনা করাও কঠিন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেকেই এসব ভাষা ও আচরণকে হাস্যরসের নামে স্বাভাবিক করে তুলছে, আবার কেউ কেউ এগুলোকে আধুনিকতা, স্মার্টনেস বা জনপ্রিয়তা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করছে। ফলে শালীনতা, সম্মানবোধ ও সামাজিক দায়িত্বশীলতার জায়গাগুলো দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
প্রশ্ন হলো, এই মানসিকতা কোথা থেকে তৈরি হচ্ছে?
যে প্রজন্ম বইয়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠে, সে সাধারণত ভাষার সৌন্দর্য শেখে, মানবিকতা শেখে, অন্যকে সম্মান করতে শেখে। আর যে প্রজন্ম সারাক্ষণ নিম্নমানের বিনোদন, কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট ও অগভীর চিন্তার মধ্যে বড় হয়, তার চিন্তার জগতও তেমনই হয়ে ওঠে। আর এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক।
এ কারণেই আজ আমরা প্রতিনিয়ত সামাজিক অবক্ষয়ের বিভিন্ন চিত্র দেখছি। পারিবারিক ভাঙন, সহিংসতা, অশ্লীলতা, মাদক, নৈতিক অবক্ষয় এসব সমস্যার পেছনে বহু কারণ থাকলেও চিন্তার দারিদ্র্য এবং জ্ঞানচর্চা থেকে দূরে সরে যাওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
এখানেই সিরিয়ার সঙ্গে আমাদের পার্থক্য।
সিরিয়া তাদের শিশুদের হাতে বই তুলে দিচ্ছে, পাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে, জ্ঞানীদের সম্মানিত করছে, চিন্তাশীল প্রজন্ম তৈরির চেষ্টা করছে।
আর আমরা বইপড়া শিশুদের নয়, বরং শুধুমাত্র ভাইরাল হওয়া মানুষদের সামনে এনে বারবার পুরস্কৃত করি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও সেই পথকেই সাফল্যের পথ মনে করবে। কারণ শিশুরা শুনে কম শেখে, দেখে বেশি শেখে।
তবে অতিনের অর্জনের চেয়েও আমাকে বেশি মুগ্ধ করেছে তার একটি সাক্ষাৎকার।
সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
“তুমি যদি বিজয়ী না হতে, তাহলে কেমন লাগত?”
অতিন উত্তর দিয়েছিল,
“যা কিছু হয়েছে সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে। আমার কাজ চেষ্টা করা, আর ফলাফল আল্লাহ তাআলার হাতে। তবে আমি যদি এবার বিজয়ী না হতাম, তাহলে অবশ্যই আগের চেয়ে তিনগুণ বেশি মেহনত করতাম।”
সুবহানাল্লাহ!
মাত্র ৮ বছরের একটি শিশুর মুখে এমন কথা!
সে জিতেছে বলে খুশি নয়; সে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট। সে ফলাফলের চেয়ে প্রচেষ্টাকে বড় মনে করছে। সে পরাজয়কে ব্যর্থতা নয়, আরও বেশি চেষ্টা করার সুযোগ হিসেবে দেখছে।
এটাই প্রকৃত শিক্ষা।
এবং এটাই সুন্দর প্যারেন্টিংয়ের ফল।
আমাদের সমাজে অনেক মা-বাবা সন্তানের ওপর এমন প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দেন যে সন্তান ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক আনন্দ হারিয়ে ফেলে। ভালো নম্বর না পেলে, পছন্দের বিষয়ে পড়ার সুযোগ না পেলে কিংবা কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারলে অনেক সন্তান নিজেকে ব্যর্থ মনে করতে শুরু করে।
অতিরিক্ত প্রত্যাশা, তুলনা এবং মানসিক চাপের ফলে অনেক তরুণ হতাশায় ভোগে। কেউ আত্মবিশ্বাস হারায়, কেউ আল্লাহর তাকদীর নিয়ে অভিযোগ করতে শুরু করে, কেউ আবার নতুন করে চেষ্টা করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলে।
কিন্তু অতিনের শিক্ষা ভিন্ন।
সে শিখেছে চেষ্টা আমার দায়িত্ব, ফলাফল আল্লাহর হাতে।
আমি জিতলে আলহামদুলিল্লাহ।
না জিতলে আরও বেশি চেষ্টা করব।
এই শিক্ষা শুধু একটি শিশুর শিক্ষা নয়; এটি হাজারো মা-বাবার জন্যও শিক্ষা।
সন্তানকে শুধু জিততে শেখাবেন না, হার মেনে আবার উঠে দাঁড়াতে শেখান। শুধু নম্বর শেখাবেন না, তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে শেখান। শুধু প্রতিযোগিতা শেখাবেন না, কৃতজ্ঞতা শেখান। শুধু সাফল্য শেখাবেন না, ধৈর্য শেখান। যেন সে নিজের প্রাপ্তিকে আল্লাহর নেয়ামত মনে করে, অন্যের প্রাপ্তিকে হিংসা না করে এবং জীবনের প্রতিটি অবস্থায় কৃতজ্ঞ থাকতে শেখে।
মনে রাখবেন, আপনার সন্তান কোনো প্রোডাক্ট নয় যে তাকে নির্দিষ্ট ফলাফল উৎপাদন করতেই হবে। সে মহান রবের দেওয়া একটি আমানত, একটি নেয়ামত। আর নেয়ামতের যথাযথ হক আদায় করার অন্যতম উপায় হলো তাকে সুন্দর চরিত্র, বিশুদ্ধ আকীদা, জ্ঞানচর্চা ও সঠিক মূল্যবোধের মাধ্যমে গড়ে তোলা।
তাই তাকে চাপ দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুলুন। মুখস্থ করিয়ে নয়, ভাবতে শেখান। তুলনা করে নয়, আত্মবিশ্বাস দিন। তাকে এমন মানুষ বানান যে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে, মানুষের উপকার করবে, জ্ঞানকে ভালোবাসবে এবং প্রতিটি ব্যর্থতাকে নতুন সূচনার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করবে।
যেদিন আমরা আমাদের শিশুদের হাতে মোবাইলের চেয়ে বেশি বই তুলে দিতে পারব, যেদিন জ্ঞানী মানুষদের তারকার মর্যাদা দিতে পারব, যেদিন চিন্তাশীল ও চরিত্রবান মানুষদের সমাজের আদর্শ বানাতে পারব, সেদিনই আমরা একটি সত্যিকার অর্থে উন্নত, সভ্য ও মননশীল জাতি গঠনের পথে এগোতে পারব ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ আমাদের সঠিক উপলব্ধি দান করুন, সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের সমাজকে জ্ঞান, চরিত্র ও মূল্যবোধের আলোয় আলোকিত করুন। আমিন।