03/05/2026
স্বামীর কবরের মাটি তখনো ঠিকমতো শুকায়নি, তখনই ছেলেমেয়েরা জাহানারা বেগমের হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে বলল, “আম্মা, এটাই এখন আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো হবে।” কিন্তু সেই খামের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল জাহানারা বেগমের এক নতুন রাজত্ব।
৭২ বছর বয়সী জাহানারা বেগম যখন খামটা হাতে নিলেন, তখন তার সন্তানদের মুখে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি—ঠিক যেন কোনো বৈষয়িক যু*দ্ধে জিতে আসা বিজয়ীর হাসি।
দীর্ঘ আটটা বছর জাহানারা বেগম নিজের হাতে স্বামী আলতাফ চৌধুরীকে আগলে রেখেছেন। ওষুধ, খাবার, ওজু করানো, নির্ঘুম রাত, ব্যথার আর্তনাদ, ডাক্তারের বিল আর সংসারের খরচ—সব সামলেছেন একা। অন্যেরা যখন সেবা করতে ক্লান্ত হয়ে সটকে পড়ত, জাহানারা তখনো হার মানেননি। অন্যেরা যখন অজুহাত দিত, জাহানারা বেগম তখন মাঝরাত পর্যন্ত জায়নামাজে বসে দোয়া করতেন আর দিনের বেলা সেলাইয়ের কাজ করে ওষুধের টাকা জোগাতেন।
আলতাফ চৌধুরী একসময় নামকরা ব্যবসায়ী ছিলেন। তার জমিজমা, ভাড়াবাড়ি আর ব্যাংক ব্যালেন্সের অভাব ছিল না। কিন্তু পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায় পড়ে যাওয়ার পর থেকেই সন্তানদের নজর তার শরীরের চেয়ে সম্পত্তির ওপর বেশি পড়তে থাকে।
কুলখানির পর যখন উকিল সাহেব উত্তরাধিকারের উইল পড়া শুরু করলেন, ঘরজুড়ে এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। বড় মেয়ে ফারহানা সাদা সালোয়ার কামিজ পরে খুব সাবধানে শোকের অভিনয় করছিল। ছেলে আরিফ বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। আর পুত্রবধূ শায়লার মুখে শোকের চেয়ে বেশি ফুটে উঠছিল অস্থিরতা।
আলতাফ চৌধুরী তার মেয়ে ফারহানার নামে ঢাকার বনানীর দুটো ভাড়াবাড়ি লিখে দিয়েছেন।
ছেলে আরিফ পেল তিনটে গাড়ি, সাভারের সব জমি আর মোটা অংকের নগদ টাকা।
বাকি সব সঞ্চয় আর গয়নাগাটিও তাদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হলো।
আর জাহানারার জন্য?
তার জন্য বরাদ্দ হলো শুধু একটা ছোট্ট ভাঁজ করা খাম।
কোনো চাবি নেই।
কোনো দলিল নেই।
কোনো ব্যাখ্যা নেই।
কাউকে কিছু না জিজ্ঞেস করেই ফারহানা তার মায়ের হাত থেকে খামটা ছিনিয়ে নিয়ে সবার সামনে খুলে ফেলল, যেন কোনো মূল্যহীন রসিকতা দেখছে। ভেতরে ছিল শুধু একটা বিমানের টিকিট।
গন্তব্য: সিলেট।
যাত্রা: তিন দিন পর।
শায়লার মিটিমিটি হাসিটা সবার আগে ফুটে উঠল। সে হালকা গলায় বলল, “সিলেট খুব শান্তির জায়গা আম্মা। মাজার জিয়ারত করে আর চা-বাগান দেখে আপনার সময় ভালো কাটবে।”
আরিফ নির্বিকার গলায় যোগ করল, “এই বয়সে ওইসব নির্জন জায়গাই ভালো। আমরা সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি, ওখানে গিয়ে ইবাদত-বন্দেগি করবেন।”
ফারহানা শীতল গলায় বলল, “ওখানকার আবহাওয়া চমৎকার। এখানে একা একা এই বড় বাড়িতে থেকে কী করবেন?”
জাহানারা বেগম সন্তানদের দিকে তাকালেন। সেই মুহূর্তে তার শোক দাফন হওয়ার চেয়েও বেশি ভারী মনে হচ্ছিল। তিনি প্রথমবার স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, তার সন্তানরা তাদের বাবার মৃ**ত্যুতে ভেঙে পড়েনি—বরং তারা হাফ ছেড়ে বেঁচেছে। যেন বড় কোনো আপদ বিদায় হয়েছে। আট বছর ধরে জাহানারা খেটে খেটে নিজের শরীর শেষ করে ফেলেছেন, কিন্তু এই তিনজনের কাউকেই কোনোদিন এক গ্লাস পানি নিয়েও তার পাশে দাঁড়াতে দেখেননি তিনি।
তার মনে পড়ল আলতাফ চৌধুরীর সেই শেষ রাতের কথা, যখন তিনি ফিসফিস করে বলেছিলেন:
“জাহানারা, যা সামনে দেখছ তা দিয়েই সবকিছুর বিচার করো না। সবচেয়ে মূল্যবান আমানতগুলো মাঝে মাঝে খুব সাধারণ মোড়কেই আসে।”
তখন তিনি ভেবেছিলেন অসুস্থ মানুষের আবোলতাবোল কথা। কিন্তু এখন সেই কথাগুলো কানে অন্যরকমভাবে বাজছে।
সেদিন রাতে জাহানারা একা বসে ছিলেন। ঘরভর্তি মানুষ, অথচ তার জন্য সব ফাঁকা। ছেলেমেয়েরা আলমারি খুলছে, স্বর্ণের ওজন দিচ্ছে, আর দলিলের হিসাব মেলাচ্ছে। কেউ একবারও জিজ্ঞেস করল না মা কিছু খেয়েছেন কি না। অনেক রাতে তিনি স্বামীর পুরনো ডেস্কের ড্রয়ারটা খুললেন। ভেতরে একটা পুরনো সাদা-কালো ছবি পেলেন যা তিনি আগে কখনো দেখেননি।
ছবিতে তরুণ আলতাফ চৌধুরী একজন অচেনা মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। পেছনে পাহাড়ের সারি আর কুয়াশা। আলতাফ চৌধুরীর মুখে এমন তৃপ্তির হাসি জাহানারা গত কয়েক যুগেও দেখেননি।
ছবির উল্টো পাশে লেখা ছিল:
“আলতাফ ও আরশাদ। সিলেট, ১৯৭৮।”
জাহানারা নামটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। পঁতাল্লিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে আলতাফ চৌধুরী কোনোদিন এই আরশাদের নাম নেননি। কে এই আরশাদ? আর কেনই বা সিলেট?
তিন দিন পর জাহানারা বেগম একটা ছোট্ট ব্যাগ গুছিয়ে নিলেন। কয়েকটা সুতির সাদা কাপড়, তসবিহ, জায়নামাজ আর সামান্য কিছু জমানো টাকা। ছেলেমেয়েরা তাকে আটকানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করল না। ফারহানা শুধু বলল পৌঁছে যেন একটা ফোন দেন। আরিফ বিদায় বেলায় মায়ের দোয়া নেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করল না।
সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরে নামার সাথে সাথেই চেনা মাটির ঘ্রাণ তাকে জড়িয়ে ধরল। পরনে সাদা পোশাক, চোখে বার্ধক্যের ক্লান্তি নিয়ে তিনি সেই পুরনো ছবিটা হাতে নিয়ে ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে রইলেন। বুকে একরাশ অনিশ্চয়তা।
ভিড়ের মধ্য থেকে একজন মার্জিত চেহারার মধ্যবয়স্ক মানুষ তার দিকে এগিয়ে এলেন—পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর টুপি, চোখে এক গভীর আভিজাত্য।
“আপনিই কি বেগম জাহানারা চৌধুরী?” তিনি আদবের সাথে জিজ্ঞেস করলেন।
জাহানারা মাথা নাড়লেন।
“আমার নাম ব্যারিস্টার লুৎফুর রহমান। আমি একজন আইনজীবী। আমি দীর্ঘ আট বছর ধরে আপনার এই আগমনের অপেক্ষায় আছি।”
জাহানারার বুকটা ধক করে উঠল।
গাড়ি শহরের পথ ছেড়ে চা-বাগানের নির্জন রাস্তার দিকে চলতে শুরু করল। লুৎফুর রহমান সাহেব খুব মেপে মেপে কথা বলছিলেন। তিনি জানালেন, আলতাফ চৌধুরী অসুস্থ হওয়ার অনেক আগে থেকেই সব পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন। তিনি এও বললেন যে, সন্তানরা সেটুকুই পেয়েছে যা তাদের দেওয়াটা জরুরি ছিল। আর জাহানারা বেগম খুব শিগগিরই এমন কিছু পেতে যাচ্ছেন যা আলতাফ চৌধুরী দুনিয়ার কারো কাছে প্রকাশ করেননি।
গাড়িটা যখন একটা বিশাল চা-বাগানের বাংলোর সামনে গিয়ে থামল এবং আইনজীবী তার দিকে ফিরে তাকালেন, তিনি শুধু একটা প্রশ্ন করলেন:
“আলতাফ চৌধুরী কি কখনো আপনাকে ‘আরশাদ মুস্তফা’ নামটা বলেছিলেন?”
জাহানারা বেগমের হাত থেকে ছবিটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল।
কারণ, তার হাতে থাকা ছবির পেছনে ঠিক ওই নামটাই লেখা ছিল...
চলবে....
আপন মানুষ
পর্ব ০১
লেখক The Story Haven
খুব শীঘ্রই দ্বিতীয় পর্ব পোস্ট করা হবে সবাই পেজটি ফলো করে ছোট একটা কমেন্ট করবেন প্লিজ তাহলে দ্বিতীয় পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে নোটিফিকেশন পেয়ে যাবেন।