27/08/2025
আজকের দিনের হিরো হবার কথা ছিল ডাঃ শীর্ষ শ্রেয়ানের। প্রতিটা নিউজ মিডিয়ার একটা করে ক্যামেরা খাড়া থাকার কথা ছিল তার দিকে। ইন্টারভিউ দিতে দিতে তার অবস্থা হতে পারতো পাগলপ্রায়।
ভাগ্যিস, তার কিছুই হয়নি। কেন ভাগ্যিস, পরে বলছি। শ্রেয়ানের কীর্তিটা আগে জানিয়ে দিই।
স্ট্রোকের রোগী এখন ঘরে ঘরে। ধরুন আপনার বাবা বা মা মাথা ঘুরে পড়ে গেছেন। আপনি হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন। সিটি স্ক্যান, এমআরই হবে। ডাক্তার জানাবেন, আপনার বাবা/মা স্ট্রোক করেছেন। শরীর প্যারালাইজড। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। খাওয়া দাওয়া দেয়া হচ্ছে নাকের নলে। প্রচণ্ড অসহায় সময়। আপনি ডাক্তারকে ভীষণ আশা নিয়ে জিজ্ঞেস করবেন, আমার রোগী সুস্থ হবে তো?
ডাক্তাররা তখন আপনাকে দেবেন ভয়ানক এক নির্মম উত্তর।
"স্ট্রোক ভালো করার কোনো চিকিৎসা নেই।"
আপনি ধাক্কা খাবেন। কথাটা বিশ্বাস হতে চাইবেন না। এত কমন রোগ, চিকিৎসা নেই মানে? কিন্তু নির্মম হলেও এটাই সত্যি। স্ট্রোকের সরাসরি চিকিৎসা হয় না। এই রোগের অনেক রোগীই হাতে পায়ে সেন্স ফিরে পায়, কেউ কেউ পুরোদমে স্বাভাবিক জীবনেও ফেরে। এটা শরীরের নিজস্ব মেকানিজম ঘটে। মেডিসিন শুধু স্ট্রোক প্রতিরোধ করতে পারে, নিরাময় নয়। শরীরের বল ও সেন্স কিছুটা উদ্ধার করে ফিজিওথেরাপি। সেটাও এক দু দিনে নয়। মাসের পর মাস বছরের পর বছর থেরাপীর ধৈর্য ও সক্ষমতা থাকলে তারপর উন্নতির আশা।
প্রবাদ আছে, টাকায় বাঘের দুধও পাওয়া যায়। জ্বি, স্ট্রোকের মেডিসিন একেবারেই নেই কথাটা সত্যি নয়। আঘাতটা যদি হেমোরেজিক না হয় এবং স্ট্রোক করার পর দ্রুত হাসপাতালে নেয়া যায় তাহলে একটা উপায় আছে। নতুন শতাব্দীতে একটা ঔষধ এসেছে। কিছু প্যারামিটার ঠিক থাকলে এবং ভাগ্য সহায় হলে এই বাঘের দুধ স্ট্রোক প্রায় পুরোপুরি সারিয়ে তুলতে সক্ষম।
বাঘের দুধের জেনেরিক নাম Alteplase। এই মেডিসিন বাংলাদেশে বানায় একটামাত্র কোম্পানী, র্যাডিয়েন্ট ফার্মা।
ও হ্যাঁ, দাম?
৫০ মিগ্রা এর ইনজেকশন ও ইনফিউশনের পার ভায়াল দাম মাত্র ৫০ হাজার টাকা। ডোজ ব্যাপারে শিওর বলতে পারব না। তবে রোগী ৬০ কেজির বেশি হলে দুই ভায়াল লাগার কথা। অর্থাৎ এক লাখ টাকা।
অর্থাৎ এই মেডিসিন গরীব তো বটেই, অধিকাংশ মধ্যবিত্তের নাগালেরও বাইরে। স্ট্রোকের চিকিৎসা স্বপ্নের বাইরে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন ডাঃ শীর্ষ শ্রেয়ানের কল্যাণে রাজশাহী অঞ্চলের গরীব রোগীরা স্বপ্ন দেখার একটা সুযোগ পেয়েছেন। এই অল্প বয়সী জেদী ছেলেটা নেদারল্যান্ডস থেকে ১৭ কোটি টাকার Alteplase নিয়ে এসেছে দেশে। এই ১৭ কোটির মালিক এখন রাজশাহী অঞ্চলের গরীব লোকজন।
১৭ কোটির ঔষধ শ্রেয়ান কীভাবে ম্যানেজ করেছে বিস্তারিত জানা নেই। তার আইডিতে গিয়ে ট্যাগ করা পোস্ট থেকে দেখছি এসবের জন্য সে যোগাযোগ করেছে World Stroke Organization এবং Direct Relief ও Angels Initiative এর মতো এনজিওর সাথে।
WSO কাউকে ডোনেশন দেয় না, দেয় ডিরেক্ট রিলিফ। শ্রেয়ান সম্ভবত তিনটা সংস্থার সঙ্গে কোলাবরেশন করে কাজ উদ্ধার করেছে। প্রচণ্ড দক্ষ, দাঁত ভাঙা শপথ না থাকলে এসব সম্ভব না। অবশ্য একটা বাচ্চা ছেলের হাতে ১৭ কোটি টাকা কেউ এমনি এমনি দেয় নাকি? আমি চিন্তা করছি এই ডোনেশনের জন্য তার ঠিক কতটা মেইল করতে হয়েছে, কতবার চেক করেছে রেস্পন্স। কজনের পক্ষে এসব সম্ভব জানি না।
একটা ২৩-২৪ বছরের ছেলে বিসিএসের পড়া বাদ দিয়ে বা পড়ার ফাঁকে, জেনজির রাজনৈতিক ডামাঢোল উপেক্ষা করে এবং সমস্ত ঘৃণাবাদকে দূরে সরিয়ে বিদেশী সংস্থার কাছে ধর্ণা দিচ্ছে দেশের গরীব মানুষ বাঁচানোর জন্য!
কী অসাধারণ ব্যাপার! কী অস্বাভাবিক ব্যাপার!
দুই দিন অপেক্ষা করে দেখলাম, এই অতুলনীয় খবরটি কোনো নিউজ মিডিয়ায় জায়গা পায়নি। ডাক্তার ও ডাক্তারদের কয়েকটা ফেসবুক পেজ ছাড়া কোথাও কেউ শীর্ষ শ্রেয়ানকে ধন্যবাদ দেবার দরকার মনে করছে না। ডাক্তারদের বহু দোষ আছে, বদনাম আছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে এদেশের ডাক্তাররা মিরাকল ঘটিয়ে ফেলেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে। আমি প্রতিবারই দেখি এসব মিরাকল ডাক্তার প্রচার করছে, ডাক্তারই লাইক দিচ্ছে, ডাক্তারই ডাক্তারকে শুভেচ্ছা, ধন্যবাদ, শুভকামনা জানাচ্ছে। অন্য কেউ পুছেও না। আমার তখন এক প্রকার কৌতুকময় করুণা কাজ করে।
শুরুতে যেটা বলছিলাম, আজকের নিউজফিড ডাঃ শীর্ষ শ্রেয়ানের দখলে থাকার কথা ছিল। কোথাও ছেলেটা নেই।
নিউজফিড ও নিউজ জুড়ে ডাকসু। শিবিরের সাদিক কায়েম হাসছেন, এটা অভাবনীয় নিউজ...ছাত্রদলের আবিদ ক্যান্টিনে খাচ্ছেন এটা বিস্ময়কর সংবাদ। এক জিএস সিগারেটের পিছে আগুন জ্বালিয়েছে, দেশ দুইভাগে বিভক্ত। আরেক ভিপি সুন্দর স্পিচ দিচ্ছেন, দেশের মানুষের দিন ভালো যাচ্ছে। একজনের বাড়ির সামনে মাইক নিয়ে গালাগাল হচ্ছে, সব মিডিয়ার ক্যামেরা সেখানে।
একচুয়ালি মিডিয়ার একেবারেই দায় নেই। মিডিয়া সন্ন্যাসীদের আখড়া না৷ টিভির বুম ধরে যে হাত তার ভাতের দরকার আছে, ক্যামেরা যে কাঁধে রাখে তার কাঁধে আছে পরিবার। এদের বেতন যে লোক দিচ্ছে, নিউজ থেকে টাকা তুলেই তবে সেটা দিতে হয়। মসজিদ মন্দিরে দোয়া প্রার্থনা চাইতে গেলেও আগে কিছু টাকা দেবার অলিখিত নিয়ম আছে।
১৭ কোটি টাকার জীবনদায়ী ঔষধে মানুষের যদি আনন্দ হতো, যদি আগ্রহ থাকতো কিংবা ন্যূনতম কৃতজ্ঞতা...টিভি ও মিডিয়া ক্যামেরা ঠিকই খোঁজে বের করতো ডাঃ শীর্ষ শ্রেয়ানকে।
ভাগ্যিস, কেউ এখনো দরকার মনে করছে না।
একবার ক্যামেরা যাকে পেয়ে যায়, তার পরিণতি দুইটা। বাটপার অথবা ভিলেন। শীর্ষ নীরবে কাজ করেছেন। ক্রেডিটের লোভে এত দূর যাওয়া কারো পক্ষে সম্ভব না। এদেশে ক্রেডিট পাওয়া খুবই সহজ। বহু তরিকা আছে, যেগুলোর সফলতা পরীক্ষিত।
শীর্ষের বয়স এখনো কম। হুট করে বিখ্যাত বনে গেলে মিডিয়ার সার্ভেলেন্সে পড়ে যাবে। তারপর হঠাৎ একদিন ভুল কিছু বলে ফেলল অথবা ঠিকই বলেছে কিন্তু অনেকের কাছে ভুল মনে হলো...দেশের জনতা স্রেফ নরক বানিয়ে দেবে জীবন। ১৭ কোটি অভিশাপ দিয়ে দেবে একদিনে। তার এনে দেয়া মেডিসিনে যে লোকটা হাতে পায়ে বল পেয়েছে, সেও পা দাপিয়ে হাত উচুঁ করে মারতে ছুটবে শীর্ষকে মারতে।
ক্রেডিটের দরকার নেই, গুণকীর্তন নিষ্প্রয়োজন। আপাতত মিডিয়া ও প্রশাসন এই বিরল ও ভীষণ দরকারি ঔষধগুলোর ন্যায্য বিতরণে কাজ করুক। ধনীদের সর্বগ্রাসী পেটে যেন এগুলো অন্তত না ঢুকে।
অভিনন্দন ও ভালোবাসা ডাঃ শীর্ষ শ্রেয়ান। তোমার প্রচেষ্টার ফলাফল যেন জীবনে পেয়ে যাও। আশা করি এই উদ্যম তুমি ধরে রাখবে। যে দেশে এক রাতে এক হাজার কোটি টাকার বিদ্যুতের তার চুরি হয়, যে দেশে ছাত্রনেতাদের সম্পদ হয় হাজার কোটির স্কেলে...সেখানে ১৭ কোটি টাকার মূল্য সবার কাছে নাও থাকতে পারে। এসবে হতাশ হইয়ো না।
কিন্তু অল্প হলেও এখনো কিছু মানুষ আছে যারা ভালো মানুষকে ভালোবাসে, সম্মান করে। তাদের সম্মান ও ভালোবাসার আলোয় তুমি পথ দেখো।
Joynal Abedin