28/02/2025
আলহামদুলিল্লাহ আরব দেশসমূহে রমজান শুরু হয়ে গেছে । আল্লাহ চাহেন তো কাল রাতে আমরা তারাবি পড়বো । পরীক্ষা, চাকরি, ক্যারিয়ার, ব্যবসা আর জাগতিক কত কিছুর জন্য আমরা কত উত্তম পরিকল্পনা করি , আসুন আসছে এ রমজানে দুনিয়া এবং আখেরাতের জন্য আমি একটা উত্তম পরিকল্পনা করি । পরিকল্পনা করলে কিছু তো অন্তত জোটে ।
আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে এবারের রমাদান প্ল্যান :
১. সাহরি খেতে উঠুন । সাহরি বাদ দিবেন না কারন এই খাবারটা খুবই বরকতময়।
২. আর সাহরি যেহেতু খেতে উঠবেনই, তাহলে এরকম একটা সময়ে তাহাজ্জুদের এই সুযোগ রমজান মাসে কেন মিস করবেন ?
৩. আর সাহরি শেষ করে আযানের জন্য অপেক্ষারত সময়টা গল্প গুজবে না কাটিয়ে দোয়া আর ক্ষমা প্রার্থনায় মেতে উঠুন, এই অল্প সময়টা আপনার জন্য একটা স্পেশাল বোনাস-দোয়া কবুল আর ক্ষমা প্রার্থনার ।
৪. একটু রেস্ট নিয়ে কাজে বেরোবার আগে দু'রাকাত ইশরাকের নামাজ পড়ে বের হতে পারেন ।
৫. আর বেলা একটু বাড়লে যদি সম্ভব হয় চার রাকাত সালাতুত দুহা ।
৬. ১২ঃ১০ এর দিকে যোহরের ওয়াক্ত শুরু হয় । ঠিক সে সময় আকাশের দরজা খুলে যায় । সম্ভব হলে যোহরের জন্য ওযুর নিয়ত করে চার রাকাত যাওয়ালের নামাজ পড়ে ফেলতে পারেন । এ নামাজটা নবীজি সারাজীবন পড়েছেন ।
৭. যোহরের নামাজটা জামাতেই পড়বেন । আমাদের অনেকের একা নামাজ পড়ার অভ্যাস আছে, এ রমজানে জামাতের নামাজ পড়ার অভ্যাসটা গড়ে ফেলতে পারেন ।
৮. যোহরের পরে কর্মক্ষেত্রে চেয়ারে হেলান দিয়ে হলেও কাইলুলার নিয়ত করে একটু ঝিমিয়ে নিতে পারেন । অভূক্ত শরীরটা একটু ঝরঝর হয়ে ওঠে, আর নবীজির একটা সুন্নত আদায় হয়ে যায় । চাইলে অভ্যাসটা রমজানের পরেও বহাল রাখতে পারেন, এটা খুব কাজে দেয় ।
৯. আসরের জামাত আদায় করে কমসে কম 20 মিনিট এক জায়গায় বসে থাকবেন, শুধু সুন্নাহ সম্মত জিকির । ফরজ নামাজের পর ঠাঁয় বসে থাকার যে কত ফায়দা, অথচ এই সময়টা শয়তান এসে আমাদেরকে গুতাগুতি করে যেন দ্রুত উঠে যাই, এ রমজানে এ অভ্যাসটা গড়ে উঠুক ।
১০. আপনি যত ব্যস্তই থাকুন , আপনি এখন সারাদিন কষ্ট করে রোজা রাখার পুরস্কার নেওয়ার সময়ে উপনিত । মাগরিবের আগের সময়টা দোয়া কবুল হয়, আপনার কোন দোয়াই ফিরিয়ে দেওয়া হবে না ।
আপনি রমজানে ৩০ দিনে কোন দিনে কি দোয়া করবেন তার একটা লিস্ট করতে পারেন । আপনি এ বিশ্বাসটা গভীরভাবে ধারণ করবেন যে আপনি যা চাবেন তাই পাবেন, সুতরাং ৩০ দিনে ৩০ রকম দোয়া হবে, NO REPEAT.. ইনশাআল্লাহ ।
লম্বা সময় দোয়া করতে পারা একটা আর্ট ।
দোয়ার টিপস:
- অজু করে কেবলামুখী হয়ে হাত উঠিয়ে দোয়া করুন ।
-দয়াময় রবের প্রশংসা দিয়ে শুরু করুন । যত প্রকার প্রশংসা বাক্য আপনি জানেন । যত খুশি জপতে থাকুন ।
-এবার প্রিয় নবীজির উপর দরুদ পড়ুন, যত প্রকার দরুদ জানা আছে, যত খুশি বার ।
-এবার আপনি ,তওবা করুন, ক্ষমা প্রার্থনা করুন ।
-এবার আপনি দয়ামের কাছে চাইতে থাকুন আপনার মনের যত প্রকার চাওয়া আছে । আল্লাহর কাছে চাওয়ার সুন্নাত হচ্ছে আগে নিজের জন্য চাইবেন, তারপর পরিবার-পরিজন, তারপর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব,দেশের জন্য, মুসলিম উম্মাহর জন্য ।
-দোয়ার ফাঁকে ফাঁকে আল্লাহর প্রশংসা এবং দরুদ পড়তে থাকুন ।
-দোয়ার শেষটা হবে তওবা ইস্তেগফার দুরুদ আর আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে ।
-আবারও বলছি দোয়া হচ্ছে একটা আর্ট, এটা একদিনে হয়ে ওঠে না , করতে করতে হয় । প্রথম প্রথম অল্প সময় দোয়া করার পরে আর কিছু খুঁজে পাবেন না , একটা সময় দেখবেন 20 মিনিট30 মিনিট চলে গেছে, আপনার দোয়া শেষ হচ্ছে না ।
১১. প্রতিদিন অল্প কিছু টাকা দান করার প্লান করতে পারেন । ভাই আপনার যদি টাকা একেবারেই নাই থাকে, অন্তত ২ টাকা করে ৩০ দিনে ৬০ টাকার নিয়ত করুন ।
১২. এর চাইতে উত্তম আর কি হতে পারে যদি রোজাদার কাউকে নিয়ে আপনি ইফতার করতে পারেন । অথবা গণমানুষ একসাথে ইফতার করে এরকম জায়গা গুলোতে সাধ্যমত শরীক হতে পারেন । তাতে অনেকগুলো রোজাদারের সওয়াব অল্প খরচে খুব সহজেই তুলে নিতে পারেন ।
১৩. এশার নামাজ জামাতে পড়ে তারাবিটা ছাড়বেন না ।
১৪. এ রমজানের দুইটা গুরুত্বপূর্ণ গুনাহ থেকে আল্লাহ আমাকে আমাদের সবাইকে হেফাজত করুনঃ
-চোখের গুনাহ ।
-গীবত / পরনিন্দার গুনাহ।
এই দুই গোপন ঘাতক আমাদের সব ইবাদত খেয়ে ফেলে, এবাদতের মজা নষ্ট করে দেয়, আল্লাহর কাছে পৌছতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় । অথচ অদৃশ্য দেয়ালটা আমরা দেখতে পাই না ।
১৫. আপনার যদি সময় সুযোগ থাকে, রমজানের শেষ ১০ দিনের এতেকাফের সুযোগ ছাড়বেন না । নবীজি সারা জীবনে এতেকাফ ছাড়েননি ।
১৬. ভাই আপনি এবাদত কম করেন সমস্যা নাই, অন্তত এই রমজানে এই নিয়ত করুন যেন আমার আপনার দ্বারা কোন গুনাহ না হয় ।
১৭. যদি জিজ্ঞেস করেন এ রমজানের সবচেয়ে বেশি কোন আমলটা করবেনঃ
বেশি বেশি কোরআন পড়বেন ।
নবীজি সাহাবীরা তাবেঈ তাবে তাবেইন আর আল্লাহর প্রিয় বান্দারা এ রমজানে অন্য আমল ছেড়ে দিয়ে শুধু কোরআন নিয়ে পড়ে থাকতেন ।
ইবনে মাসউদ রাঃ বলেন, একবার নবীজি তাকে কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাতে বললে তিনি সূরা নিসার প্রথম অংশ তেলাওয়াত করেন । যখন এই আয়াতে পৌঁছেন,
'অতএব কেমন হবে তখন যখন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী প্রস্তুত করব এবং আপনাকে উপস্থিত করবো তাদের উপর সাক্ষী রূপে ?'
তখন নবীজি বললেন ব্যস, যথেষ্ট ।
ইবনে মাসউদ রাঃ বলেন, তখন আমি নবীজির দিকে তাকিয়ে দেখি তার চক্ষুদ্বয় থেকে অনবরত অশ্রু ঝরছে !
আবু হাতেম রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাঃ মদিনায় একজন বৃদ্ধার বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার দরজার বাইরে থেকে তেলাওয়াত শুনতে পান । বৃদ্ধা সূরা গাসিয়ার এই আয়াতটি বারবার তেলাওয়াত করছিলেন,
'তোমার কাছে আচ্ছন্নকারী কেয়ামতের সংবাদ পৌঁছেছে কি ?'
বৃদ্ধা এই আয়াতটি বারবার পড়ছিলেন আর কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন ।
রাসূলুল্লাহ সাঃ তার পড়া শুনতে লাগলেন আর তার পড়ার সাথে সাথে বারবার বলতে লাগলেন 'আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে, হ্যাঁ আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে ।
এ সংবাদ আল্লাহর রাসূল সাঃ আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন । কিন্তু আমরা তো বেহুশ, আমাদের অন্তর মরে গেছে ।
ভাই যদি চান আপনার অন্তরটা একটু নরম হোক, আপনি কোরআনের সাথে লেগে থাকুন । গোনাহের মরিচায় চাপা পড়া শক্ত অন্তর নরম করার এর চাইতে আর কোন বড় দাওয়া নাই ।
নরম মন্তরের বেনিফিট হল আল্লাহর কাছে চাওয়ার আগেই টপটপ করে পানি পড়ে । দুই ফোঁটা পানি ফেলতে পারলে আর চাওয়ার দরকার কি, সব পাওয়া হয়ে যায়... ।
আর যাকে দোয়া করার তৌফিক দেওয়া হয় , তার দোয়া কবুল করা হয় ।