20/08/2026
শিলংয়ে নেতাজী এবং বিবেকানন্দের মূর্তি ভাঙচুর। KSU-র আন্দোলন ঘিরে হিংসা: কেন পথে নামল খাসি ছাত্র সংগঠন?
স্বামী বিবেকানন্দ এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু—ভারতের ইতিহাস ও সমাজজীবনে দুই অনন্য ব্যক্তিত্ব। আর সেই দুই মহান ব্যক্তির মূর্তি ভাঙচুরের অভিযোগ ঘিরে বুধবার উত্তাল হয়ে উঠল মেঘালয়ের রাজধানী শিলং।
খাসি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা KSU-র ডাকা কালো পতাকার বাইক র্যালিকে কেন্দ্র করে শহরের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। অভিযোগ, র্যালির সময় একাধিক গাড়িতে ভাঙচুর করা হয়, অন্তত দুটি সরকারি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রিলিফ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন কলোনিতে থাকা স্বামী বিবেকানন্দ ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মূর্তিও ভাঙচুর করা হয়েছে বলে পুলিশ ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কেন এই আন্দোলন?
এর পিছনে রয়েছে KSU-র একাধিক দাবি। গত ৪ আগস্ট মেঘালয় সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানিয়ে ১৫ দিনের সময়সীমা দিয়েছিল সংগঠনটি। KSU-র অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার তাদের দাবির বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ করেনি। এরপরই আন্দোলন তীব্র করার ঘোষণা দেয় তারা।
KSU-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হল **Meghalaya Residents Safety and Security Act বা MRSSA, 2016-এর কার্যকর বাস্তবায়ন** এবং মেঘালয়ে বাইরে থেকে আসা শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ ও নথিভুক্তিকরণ। সংগঠনটি রাজ্যের চাকরিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংস্কারের দাবিও তুলেছে।
বিশেষ করে Grade B, C এবং D পদে ব্যক্তিগত ইন্টারভিউ তুলে দেওয়া, Meghalaya Public Service Commission এবং District Selection Committee-র নিয়োগ ব্যবস্থায় সংস্কার এবং স্থানীয়দের জন্য সরকারি চাকরিতে উপযুক্ত সুরক্ষার দাবি রয়েছে তাদের।
এছাড়াও NEIGRIHMS-এ নার্স নিয়োগের পদ্ধতি, স্থানীয় Khasi-Jaintia এবং Garo প্রার্থীদের প্রতিনিধিত্ব এবং নিয়োগ পরীক্ষা মেঘালয়ের ভিতরে করার দাবিও তুলেছে KSU।
আন্দোলনের আরেকটি বড় বিষয় হল **East Jaintia Hills-এ Shree Cement-এর প্রস্তাবিত চুনাপাথর খনি প্রকল্প**। ৩১ জুলাইয়ের জনশুনানির পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তুলে সেই শুনানি বাতিল করার দাবি জানিয়েছে KSU। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেছে সংগঠনটি।
KSU আরও দাবি করেছে **Inner Line Permit বা ILP বাস্তবায়ন**, অভিবাসী শ্রমিক সংক্রান্ত আইন কার্যকর করা এবং মেঘালয় সরকারের পূর্বের অবস্থান অনুযায়ী ইউরেনিয়াম খনির বিরোধিতা অব্যাহত রাখা।
এই দাবিগুলিকে সামনে রেখেই বুধবার শিলংয়ে কালো পতাকার বাইক র্যালির ডাক দিয়েছিল KSU। প্রশাসন শর্তসাপেক্ষে র্যালির অনুমতিও দিয়েছিল এবং পুলিশ-প্রশাসন KSU নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল বলে জানানো হয়েছিল।
কিন্তু শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াল?
র্যালির সময় বিভিন্ন গাড়িতে হামলা, সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং স্বামী বিবেকানন্দ ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মূর্তি ভাঙচুরের ঘটনায় সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে যে কলোনিতে দুই মহান ব্যক্তির মূর্তি রয়েছে, সেটি তৈরি হয়েছিল ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা মানুষের পুনর্বাসনের জন্য। সেই জায়গায় মূর্তি ভাঙচুরের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে আরও গভীর উদ্বেগ।
অন্যদিকে, আন্দোলনের দাবিগুলি এক বিষয়—আর হিংসা, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস কিংবা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের মূর্তি ভাঙচুর সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।**
দাবি আদায়ের জন্য গণতান্ত্রিক পথে আন্দোলনের অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই আন্দোলন যদি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, সরকারি সম্পত্তি কিংবা জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত স্মারককে আঘাত করে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—**দাবি আদায়ের এই পথ কি সত্যিই সমাধানের পথ?
শিলংয়ের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং KSU নেতৃত্ব এই ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কী অবস্থান নেয়, এখন সেদিকেই নজর সবার।
শিলংয়ে আন্দোলনের আসল দাবি তাই শুধু বোঝা দরকার নয়—আন্দোলনের নামে হিংসার ঘটনাগুলিরও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।