21/04/2026
গল্প: “যখন মন বিগড়ে যায়…”
কোনো কারণ নেই…
হঠাৎ করেই সবকিছু কেমন উল্টে যায়।
মুখে হাসি থাকলেও ভেতরটা তিতকুটে হয়ে ওঠে।
চোখ দুটো জ্বালা করে—
আর কখন যে গাল বেয়ে নোনতা জল নেমে আসে, নিজেই টের পাওয়া যায় না…
মেজাজ?
সে তো তখন সপ্তমে উঠে বসে!
সকালটা শুরুই হয়েছিল একটা ফোন কল দিয়ে।
রত্নাদি ফোন করে বলল—
“কী রে সুমি, মেয়ের বিয়ে দিচ্ছিস না নাকি?
এভাবে আটকে রাখছিস কেন?
নিজের প্রয়োজনে মেয়েকে কাছে রাখতে চাস—এটা কিন্তু ঠিক না!”
সুমি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলেছিল—“আচ্ছা, পরে কথা বলছি…”
কলটা কেটে দিয়েছিল।
আর বোঝানোর ইচ্ছে করল না।
কী বলবে?
কীভাবে বোঝাবে—
প্রিয়া নিজের চোখে তার মায়ের জীবনের লড়াই দেখেছে,
ভাঙা সংসার, একা হাতে সব সামলানো—
এসব দেখে সে নিজেই বিয়েতে আগ্রহী নয়।
সুমি জানালার পাশে এসে বসে পড়ল।
বাইরে রোদ, কিন্তু তার ভেতরে অদ্ভুত এক অন্ধকার।
স্বামী তাকে অনেক আগেই ছেড়ে চলে গেছে।
একান্নবর্তী পরিবারে একমাত্র ভালো উপার্জন করা মানুষ ছিল সে-ই।
তার চলে যাওয়ার পর, পুরো সংসারটাই যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়েছিল।
কিন্তু সুমি ভাঙেনি।
শ্বশুর-শাশুড়ি, একমাত্র ননদ—
এতগুলো বছর ধরে, সবার “থাকা” সে একাই সামলেছে।
কখনো কম পড়তে দেয়নি কাউকে।
ননদের বিয়ে—
নিজের মেয়ের মতো করে, নিজের হাতে করেছে।
আজ সে বিদেশে,
মাসে একবার, গুনে গুনে দুটো কথা হয়—
এই পর্যন্তই।
শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর,
শ্বশুরকে সে নিজের বাবার থেকেও বেশি করে আগলে রেখেছিল।
ওষুধ, খাওয়া, যত্ন—সবকিছু নিজের হাতে।
আজ… তিনিও নেই।
কিন্তু সুমি থামেনি।
নিজের একমাত্র মেয়েকে—
ভালো করে পড়াশোনা করিয়ে,
নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো করে তুলেছে।
আজ সে কাজ করছে, নিজের জীবন নিজেই সামলাচ্ছে।
তবুও…
মানুষের কথাগুলো থামে না।
“মেয়ের বয়স তো হয়ে গেল, বিয়ে দাও…”
“আর কত দেরি?”
“এভাবে রাখাটা ঠিক না…”
আত্মীয়-স্বজন, পাড়াপড়শি—
সবাই যেন দায়িত্ব নিয়ে কথা বলে।
তার উপর আবার—
“সুমি এত সাজগোজ করে কার জন্য?”
“স্বামী নেই, তবুও এতো সাজা ঠিক না…”
কথাগুলো সরাসরি নয়,
কিন্তু কানে আসে—
হাসির আড়ালে, ফিসফিসে স্বরে।
সুমি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে—
“আমি এমন হই কেন?”
উত্তরটা সে জানে—
“কারো কেউ নয় আমি, কেউ আমার নয়…”
তবু…
সব জানার পরেও,
মনের ভেতর থেকে ‘এক্সপেক্টেশন’ নামের জিনিসটা মুছে ফেলা যায় না।
সে তো কাউকে ফাঁকি দেয়নি।
সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল।
নিজের ইচ্ছেগুলোকে এক এক করে সরিয়ে রেখেছিল।
তাহলে আজ—
এই একাকীত্ব, এই বিচার—
কেন?
সুমি কাঁদতে কাঁদতেই হঠাৎ থেমে গেল।
চোখের জল মুছল।
আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
তারপর আস্তে করে বলল—
“আর না…”
শুধু দায়িত্ব পালন করেই তো জীবন শেষ হয়নি।
এবার নিজের জন্যও বাঁচা দরকার।
মোবাইলটা—মেয়ে প্রথম মাইনে পেয়ে কিনে দিয়েছিল।
সেই ফোনটা হাতে নিয়ে, সুমি চুপচাপ স্ক্রল করছিল।
হঠাৎ…
একটা ড্রেসে চোখ আটকে গেল।
অজান্তেই থেমে গেল আঙুল।
আরও একটু খুলে দেখল—
Rubynique
ডিজাইনগুলো যেন অন্যরকম—
সরল, অথচ আত্মবিশ্বাসী।
সুমির মনে হল—
“এটা তো আমার মতোই…”
এক মুহূর্ত দেরি না করে,
ড্রেসটা অর্ডার করে দিল।
এই প্রথম—
কাউকে না ভেবে,
কোনো অনুমতি না নিয়ে,
নিজের জন্য কিছু করল সে।
ড্রেসটা শুধু একটা পোশাক ছিল না—
ওটা ছিল একটা সিদ্ধান্ত।
যে সিদ্ধান্ত তাকে
লোকের অযথা কথার বাইরে নিয়ে যাবে,
আবার নিজের মতো করে,
নিজের স্টাইলে—
আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে শেখাবে।
সুমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হালকা হাসল।
হয়তো এই ছোট্ট সিদ্ধান্তটাই—
তার নতুন জীবনের শুরু।
✍️ কলমে রুবি গাঙ্গুলি