27/08/2021
সারাদিন সংসারের কাজের পর সন্ধ্যার দিকে রিজু বসে তার ছয় বছরের ছেলে মাহিনকে পড়াতে। মাথায় থাকে রাতের খাবার তৈরিসহ অন্যান্য কাজের চিন্তা। ওদিকে ২ বছরের মেয়েটার দুষ্টামি তো আছেই। তাই ছেলেকে পড়াতে বসে প্রতিদিনই কথায় কথায় চড়, থাপ্পড়, ধমক চলতেই থাকে। ছোট শিশু, তার উপর এতগুলো পড়া- অঙ্ক, ইংরেজি, বাংলা, ধর্ম কত কি সবতো ঠিকমতো লিখতে পারে না বা পড়তে চায় না। রিজুর এত ধৈর্য নেই যে, মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে ছেলেটাকে পড়াবে। এতে ফল হচ্ছে উল্টো। ইদানীং মাকে প্রচন্ড ভয় পাচ্ছে, পড়ার প্রতি কেমন যেন অনীহা তৈরি হয়েছে মাহিনের।
অনেক মা-বাবাই মনে করে, যে শিশুদের জন্য কিল, থাপ্পড় বা চড় হয়তো তেমন ক্ষতিকর নয়। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের মারধোর বা লাঠি দিয়ে পেটানো শিশু স্বাস্থ্যের এমনকি তার জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। মেরুদন্ডের নিচের দিকে সামান্য থাপ্পড়ের ফলে সমস্ত মেরুদন্ডে ব্যথা সৃষ্টি করতে পারে। প্রাপ্ত বয়সে আমাদের অনেকের পিঠ বা কোমর ব্যথা দেখা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ হচ্ছে বাল্যকালে সেসব চড় থাপ্পড়ের ফল। এ ধরনের শাস্তির ফলে যদি কোন স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হয় তবে শিশুর শরীর আংশিক বা পূর্ণভাবে চলৎশক্তিহীন হয়ে যেতে পারে। হাত পা অথবা বুকের খাঁচার হাড় ভেঙ্গে যাওয়ার ঘটনাও বিরল নয়। অনেকক্ষেত্রে গভীর কোন ক্ষত থেকে ক্যান্সারের জন্মও হতে পারে।
চড় থাপ্পড়ের চেয়েও ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের শিকার শিশু শ্রমিকরা। মালিক বা গৃহকর্ত্রীর কিল, ঘুষি, লাথি, সজোরে ধাক্কা, শরীরের কোন একটা অংশ পুড়িয়ে দেয়া, গভীর ক্ষত সৃষ্টি করা, গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাকা দেয়া, নির্জন প্রকোষ্ঠে বা বাথরুমে দিনের পর দিন আটকে রাখার কথাতো সর্বজনবিদিত। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে ছোট শিশুদের জোরে ঝাঁকুনি শিশু শরীরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। শারীরিক বৃদ্ধি বিঘ্নিত, বমি, স্নায়ু বৈকল্য, শ্বাসকষ্ট এসব ক্ষতি তো আছেই, সেইসাথে শিশুমনে বড়দের বিরুদ্ধে ক্রোধ ও ঘৃণার জন্ম দেয়। ফলে তাদের মনের যা কিছু সুন্দর ও কমনীয়তা হারিয়ে যায়। কোমল শিশুর মনে জন্ম নেয় সবকিছুর বিরুদ্ধে বিতৃষ্ণা। এগুলো ফুটে ওঠে কিশোর কিশোরী, তরুণ-তরুণীর অস্বাভাবিক আচরণ ও অপরাধ প্রবণতার মধ্যদিয়ে।
ইউনিসেফের এক জরিপে দেখা গিয়েছে বাংলাদেশের প্রতি ৪ টি শিশুর মাঝে ৩ জন মানসিক ভাবে অত্যাচারিত হয়; প্রতি ৩ জন শিশুর মাঝে ২ জন শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়।
শারীরিক শাস্তি হয়তো সাময়িকভাবে শিশুকে কথা শোনাতে বাধ্য করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটা ফলদায়ক নয়। কারণ প্রকৃতিগতভাবেই যারা শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করে তাদের প্রতি শিশুর ভালোবাসা জন্মায় না। বরং আদর, ভালোবাসা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে শিশুর সাথে আমাদের যে সম্পর্ক গড়ে উঠে তা হয় স্থায়ী ও দৃঢ়।
যে সব খারাপ কাজের জন্য মা-বাবা শিশুদের শাররিকভাবে আঘাত করে সেসব কাজের পেছনের কারণগুলোর আগে সমাধান করা উচিত, নয় কি? কম ঘুম, কম খাবার, অপুষ্টি, শারীরিক অসুস্থতা, মুক্ত বাতাস, খেলাধুলা, নিজের জগতে অবাধ বিচরণের সুযোগের অভাবে বাচ্চাদের মধ্যে দেখা দেয় অস্থিরতা, মাত্রাতিরিক্ত দুষ্টুমী, কাজে অমনোযোগিতা, খিটখিটে মেজাজ ইত্যাদি। তাই আগে ভেবে দেখুন, আপনার সন্তানের সমস্যা ঠিক কোথায়?
ব্যস্ত এ নগরজীবনে নিজেদের জীবনের নানা সমস্যা ও জটিলতার জন্য বাবা-মা ছেলেমেয়েদের সময় দিতে পারে না বা সময় দিতে চায়না। অথচ বাচ্চার সামান্য দুষ্টামি বা ত্রুটির জন্য তাকে মারতে হাত কাঁপেনা। ভেবেও দেখেনা তারা বাচ্চাটির দরকার ছিল একটু আদর, নির্যাতন নয়।
চিন্তা করে দেখুন, প্রতিদিন আপনি নিজে ব্যক্তিজীবনে সামাজিকভাবে বা অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবেও কত ধরনের বৈষম্য বা অন্যায়ের শিকার হচ্ছেন। সে সব অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দূরে থাক তার প্রতিবাদও করতে পারছেন না। কারণ তারা আপনার চেয়ে শক্তিশালী। অথচ আপনার ছোট ছেলে বা মেয়েটি অথবা ছাত্রছাত্রী অথবা আপনার বাসায় কাজ করছে সে শিশুর সামান্যতম ত্রুটিতে কত নিষ্ঠুর আচরণ করছেন ওদের সাথে। এ নির্যাতন ও হিংস্রতা শিশুটিকে শেখায়, “জোর যার মুল্লুক তার”। এর ফলে শিশুটির মনে দুর্বলকে আঘাত করার একটি মানসিকতা তৈরি হয় এবং তার চেয়ে কম শক্তিশালী কাউকে দাবিয়ে রাখার একটি প্রবণতা গড়ে উঠে।
সুতরাং শিশুর আচরণে ছোট-বড় যে কোন ধরনের ত্রুটিই দেখা যাক না কেন, তাকে মারধর না করে ঘটনাটির ব্যাখ্যা চাওয়া যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও বাবা-মা বা শিক্ষকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে পারে। কারণ সব শিশু যে সহজে মুখ খুলবে, আর খুললেও যে সত্য কথাই বলবে তাও ঠিক নয়। এজন্য একেবারে শুরু হতে মা-বাবা বা শিক্ষকের উচিত শিশুর সাথে দৃঢ় মানসিক বন্ধন তৈরি করা। এমন সম্পর্ক যাতে শিশুটি তার সব কথাই নিঃসঙ্কোচে বলতে পারে।
সন্তানের বন্ধু হতে চাইলে তাকে সময় দিতে হবে, জীবনে যতই ব্যস্ততা থাক না কেন, সন্তানকে সুন্দর সময় দেয়ার বিকল্প নেই। তার অভিযোগ বা সমস্যা থাকলে ধৈর্য্য সহকারে সেগুলো শুনতে হবে। কোন আবদার থাকলে তা যদি যৌক্তিক হয় এবং আপনার সাধ্যে কুলায় তবে তা পূরণের চেষ্টা করা উচিত।
মনে করি, আপনার ১০ বছরের ছেলেটি চিড়িয়াখানায় যেতে চাইল যা আপনার সাধ্যের মধ্যে। অথচ তা না করে ছুটির দিনে আপনি নিজেই বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরতে চলে গেলেন অথবা বিশ্রামের অজুহাতে সন্তানকে নিয়ে বাইরে গেলেন না বা কিছু মজার সময় উপহার দিলেন না। এটা কোনো দায়িত্ববান অভিভাবকের কাজ নয়। অথচ একটু ভাবলেই দেখবেন, যে ছুটির দিনে স্ত্রী, ছেলেমেয়ে নিয়ে যদি চিড়িয়াখানা, যাদুঘর, শিশুপার্ক বা একটু খোলামেলা জায়গায়, পার্কে, নদীর ধারে বেড়াতে যান তবে শিশুরা কতটা আনন্দময় সময় অতিবাহিত করে। এতে শিশুরা যেমন থাকে হাসিখুশি ও প্রাণবন্ত তেমনি দৃঢ় হয় পারিবারিক বন্ধন।
আর যদি সন্তানের আব্দার পূরণ সম্ভব না হয় তবে তাকে সেটা বুঝিয়ে বলতে চেষ্টা করুন। সন্তানের সাথে সম্পর্ক তৈরি করুন সত্য দিয়ে, মিথ্যা দিয়ে নয়। সারাক্ষণ গাম্ভীর্য দেখিয়ে কখনওই তাকে দূরে সরিয়ে দেবেন না। সন্তানকে শাসন তো অবশ্যই করতে হবে, তবে তার ক্ষতি করে নয়। শাসনের সাথে সাথে আদর ভালবাসাও দিতে হবে।
বাচ্চারা প্রশংসা পছন্দ করে বেশি। তাই তার ভালো কাজের প্রশংসা করতে ভুলে গেলে চলবেনা। আর বাচ্চারা তো দুষ্টামি করবেই। সে দুষ্টামি যদি ক্ষতিকর না হয় তবে তা দেখেও না দেখার ভান করাটাই শ্রেয়।
Childhood should be carefree, playing in the sun; not living a nightmare in the darkness of the soul.
উম্মে সালমা কলি
টরেন্টো, কানাডা
শিশুদের দিনলিপি 👨👩👧👦