16/09/2024
হেযবুত তওহীদের ফিলোসফি সম্পর্কে একটু জেনে রাখুন..
সকলকে হেযবুত তওহীদের পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও সালাম। আপনারা সকলেই অবগত আছেন যে, সম্প্রতি বাংলাদেশে একটি বিশাল গণ-অভ্যূত্থান সংঘটিত হয়েছে। এই গণ-অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটেছে এবং একটি সেনা-সমর্থিত অন্তবর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘবদ্ধভাবে সহিংসতা ঘটানো হচ্ছে, এক গোষ্ঠী আরেক গোষ্ঠীর উপর হামলা করে তাদের বাড়িঘর, কার্যালয় ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ভেঙে গুড়িয়ে দিচ্ছে। মব, ধর্মীয় উন্মাদনা ও গণহিংস্রতা সৃষ্টি করে ভিন্ন ধর্মের বা ভিন্ন মতের মানুষকে নির্বিচারে পিটিয়ে মেরে ফেলছে। উত্তেজিত বে-আইনী জনতার বিরুদ্ধে পুলিশ, সেনাবাহিনী তেমন কোনো শক্তিশালী ভূমিকা নিতে পারছে না। এমন একটি অরাজক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আমাদের উপরও একের পর এক হামলা চালানো হচ্ছে এবং হত্যাযজ্ঞ চালানোর ষড়যন্ত্র করে চলছে একটি ধর্মীয় কট্টরপন্থী ও উগ্রবাদী গোষ্ঠী।
হেযবুত তওহীদ সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংস্কারমূলক ইসলামি আন্দোলন। এ আন্দোলনটি সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে মানবতার কল্যাণে নিজেদের সদস্যদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে ধর্মীয় উগ্রবাদ, উন্মাদনা, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ধর্মান্ধতা, লিঙ্গবৈষম্য ইত্যাদির বিরুদ্ধে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রচারের কাজ করছে। কারণ আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। তাদের ধর্মীয় অনুভূতিকে ভুল খাতে প্রবাহিত করে আমাদের দেশে যুগের পর যুগ ধরে দাঙ্গা-সহিংসতার বিস্তার ঘটিয়ে যাচ্ছে উগ্রবাদী গোষ্ঠী।
তাদের প্রচারিত অপব্যাখ্যার বিপরীতে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষাকে মানুষের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুলতানী ও জমিদার পন্নী পরিবারের সন্তান এমামমুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী (১৯২৫-২০১২) হেযবুত তওহীদ নামের এ আন্দোলনটি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরু থেকেই আন্দোলনের নীতিমালা একদম স্পষ্ট-
১. আমরা কোন ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত হবো না।
২. কোন প্রকার আইন ভঙ্গ করব না। অবৈধ অস্ত্রের সংস্পর্শে যাব না।
৩. আমাদের কর্মক্ষম সদস্যরা বৈধ পথে উপার্জন করবেন এবং তা থেকে আন্দোলনের কাজে ব্যয় করবেন।
৪. হেযবুত তওহীদের সদস্য নয় এমন কারো থেকে কোন অর্থ গ্রহণ করা হবে না।
৫. আন্দোলনের কোনো গোপন কর্মকাণ্ড থাকবে না।
বিগত তিরিশ বছর ধরে আমরা এই নীতিমালা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আসছি। আমাদের দেশে যখন যে সরকার এসেছে সেই সরকাকেই আমরা আমাদের কার্যক্রমের ব্যাপারে অবগত করেছি। উগ্রবাদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিগত দশ বছরে আমরা দুই লক্ষাধিক জনসভা, সেমিনার, র্যালি, মানববন্ধন করেছি।
শুরু থেকেই একদল উগ্রবাদী, সাম্প্রদায়িক, কট্টর ধর্মান্ধ গোষ্ঠী হেযবুত তওহীদের আদর্শকে যুক্তি দিয়ে মোকাবেলা করতে না পেরে তাদের সংখ্যাধিক্যের দাপটে হেযবুত তওহীদকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার চেষ্টা করছে। তাদের বিরোধিতার কারণ ধর্মীয় কিছু বিষয়ে আদর্শিক মতানৈক্য। যেমন:
(১) আমরা বিশ্বাস করি, পৃথিবীর সকল মানুষ এক পিতা-মাতার সন্তান, তারা সবাই ভাই-ভাই। আমরা বাংলাদেশের হিন্দ, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, আদিবাসী সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বহু সর্বধমীয় সভা-সেমিনার করেছি। কিভাবে সকল ধর্মমতের মানুষেরা যার যার মানবাধিকার সুরক্ষিত রাখতে পারে, ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা হতে পারে এবং উগ্রবাদকে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলা করতে পারে সে আদর্শ আমরা পত্রিকা, হ্যান্ডবিল, বই-পুস্তকের মাধ্যমে তুলে ধরেছি। এতে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠী ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নেমেছে।
(২) আমরা মানুষের সামনে প্রকাশ করেছি যে, ইসলামে ধর্মের কাজ করে বিনিময় নেওয়া ও স্বার্থ হাসিল করা নিষিদ্ধ। কোর’আনের বহু আয়াতে আল্লাহ তা হারাম করেছেন। পৃথিবীতে যত নবী রসুল এসেছেন কেউ ধর্মকে তাদের জীবিকার মাধ্যম করেননি। কারণ স্বার্থ জড়িয়ে গেলে ধর্ম বিকৃত হয়ে যায়, সেটা আর মানবতার কল্যাণে কাজে আসে না। কিন্তু বর্তমানে টাকা ছাড়া ধর্মের কল নড়ে না।
(৩) আমরা বলেছি, নারীদেরকে ধর্মীয় অপব্যাখ্যার দ্বারা অবরুদ্ধ করে রাখা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরীপন্থী এবং তাদের মানবাধিকার সুস্পষ্ট লংঘন। ইসলাম নারীকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে কাজ করার অধিকার দিয়েছে। আমরাও আন্দোলনের সকল কাজে নারীদের অংশগ্রহণের অধিকার ও ক্ষমতায়নকে নিশ্চিত করেছি। নারী স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান কট্টরপন্থীরা মেনে নিতে পারছে না।
(৪) আমরা বলেছি, জোরজবরদস্তি করে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ, অথচ উগ্রবাদী মোল্লারা জোর করে মানুষের উপর তাদের মতবাদ চাপিয়ে দিতে চায়। উগ্রবাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ শক্তিধর দেশগুলো বিরুদ্ধে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করেছেন, অস্ত্র প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও নির্মুল করা যায় নি। আমরা ইসলামিক জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কাউন্টার ন্যারেটিভ তুলে ধরেছি এবং বলেছি যে, কেবল শক্তি দিয়ে জঙ্গিবাদীদের মোকাবেলা করা যাবে না, পাশাপাশি ইসলামের যুক্তি দিয়ে তাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে হবে। আমাদের উগ্রবাদবিরোধী জনসচেতনামূলক লক্ষ লক্ষ সভা ও প্রচারণা বাংলাদেশের মানুষের জঙ্গিবাদের বিপক্ষে মনোভাব তৈরিতে বিরাট ভূমিকা রেখেছে।
(৫) আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি, নাচ, গান, চিত্রাঙ্কন, নাটক ইত্যাদি শিল্প ও সৃজনশীলতার চর্চাকে মৌলবাদী গোষ্ঠী ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে ধ্বংস করতে চায়। তারা নববর্ষের সঙ্গীতানুষ্ঠানে বোমা হামলা করে বহু মানুষকে হত্যাও করেছে। কিন্তু আমরা ইসলামের রেফারেন্স উল্লেখ করে বলছি, ইসলাম শিল্পচর্চা ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির প্রতিপক্ষ নয়। আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন অশ্লীলতা ও মিথ্যাচার। যে সঙ্গীত, শিল্পচর্চা, নাটক, ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম অশ্লীল নয়, আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে না, তা অবৈধ নয়। বরঞ্চ যে সংস্কৃতিচর্চা মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার অতি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
(৬) আমরা মনে করি, ইসলাম একটি সার্বজনীন ধর্ম। ইসলাম আরবীয় ভাষা, সংস্কৃতি, পোশাক আশাক অন্য জাতির উপর চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতি নয়। তাই দাড়ি, টুপি, লম্বা জোব্বা ইত্যাদি বেশভূষা ধারণ করার বা না করার স্বাধীনতা প্রতিটি মুসলমানদের রয়েছে, কেননা পবিত্র কোর’আনে কোথাও এগুলোকে আল্লাহ বাধ্যতামূলক করেননি। সুতরাং এসব ঐচ্ছিক বিষয় নিয়ে কারো উপর হামলা করা, কাউকে অমুসলিম বলে ঘোষণা করা বা তাকে শাস্তি দেওয়ার বিধান ইসলামে নেই। আমাদের এই কনসেপ্টের কারণেও কট্টরপন্থীরা আমাদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা করে থাকে।
আমরা ইসলামকে একটি উদারনৈতিক, মানবতাবাদী, বৈজ্ঞানিক, যুক্তিশীল ধর্ম হিসাবে প্রমাণ করেছি। এ কারণেই রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীটি আমাদেরকে টার্গেট করেছে। আমাদের কার্যক্রমকে তাদের ধর্মের অপব্যবহার করে উগ্রবাদ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করছে। গত তিরিশ বছরে তারা সহস্রাধিকবার আমাদের উপরে হামলা চালিয়েছে। আমাদের বাড়িঘর, দোকানপাট, কার্যালয় ভাঙচুর করেছে, ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে। তাদের লাগাতার ষড়যন্ত্র ও হামলায় এ পর্যন্ত আমাদের ৫ জন সদস্য শহীদ হয়েছেন, আমাদের শতশত ভাইবোন আহত হয়েছেন।
২০০১ সনে তারা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতার পিতৃনিবাস করটিয়া জমিদার বাড়িতে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ পর্যন্ত চার বার তারা নোয়াখালীতে অবস্থিত আন্দোলনের বর্তমান এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমের গ্রামের বাড়ি ভাঙচুর ও ভস্মীভূত করেছে। ২০১৬ সালে তাঁর ও অন্যান্য সদস্যদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, নির্মাণাধীন মসজিদ গুড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি আন্দোলনের দুইজন সদস্যকে জবাই করে মরদেহ পুড়িয়ে দিয়েছে। নয় বছর হয়ে গেলেও এ হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্য শুরুই হয়নি।
এভাবে আমাদের উপর সহস্রাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। আইন হাতে তুলে না নিয়ে আমরা আইনের দ্বারস্থ হয়েছি। কিন্তু উস্কানিদাতা ও হামলাকারীরা নাম-পরিচয়হীন উত্তেজিত জনতার আড়াল নিয়ে আইনের আওতার বাইরে থেকে গেছে।