05/05/2026
আহা ভালোবাসা! পরনের ড্রেস দেখে বুঝতে পেরেছেন কিছু? হয়তো না। তুমুল প্রেম চাচাতো বোনের সঙ্গে। চারটা বছর ধরে। এরপর সিদ্ধান্ত নিলেন দুজন বিয়ে করার। কিন্তু ছবির এই লোকের চাচি অর্থাৎ মেয়ের মা মানেনি। ভদ্রলোক তখন টগবগে যুবক। প্রবল জেদ। এক পর্যায়ে মেনে নিল মেয়ের মা তাদের জেদ দেখে। মেয়েকে তুলে দিল এই যুবকের হাতে। কিন্তু চালচুলো নেই যুবকের। তবে প্রেমের শক্তি আর মনের জোর তাদের এগিয়ে নিতে থাকলো সংসার জীবনের পথে। ঘর আলো করে এলো ছেলে ও এক মেয়ে। নানান হিসাব নিকাশ আর সংগ্রাম করতে করতে তাদের ছেলে মেয়ে বড় হতে থাকলো। কিন্তু লোকটার ভালোবাসার মানুষটা, তার প্রিয়তমা স্ত্রী ক্যান.সারে ভুগে মা.রা গেল এক অবেলায়।
এরপর কেটে গেল ২০টা বছর। আর বিয়ে করেননি এই ভদ্রলোক। কাজ করেছেন দোকানের কর্মচারীর। কখনো এর ওর ফরমায়েশ খেটেছেন।
বললেন, ছেলেটা আমাকে খুব সম্মান করে। নিজের ছেলে বলে বলছি না। খেয়ে না খেয়ে মানুষ করেছি। মাস্টার্স পাস করিয়েছি। সে চেষ্টায় আছে একটা চাকরির। আল্লাহর রহমতে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি । জামাইটাও ভালো।
আজ থেকে কয়েক বছর আগে এই ভদ্রলোক চাকরি নিয়েছেন মিরপুর ১ এর এক ফুডকোর্টে। সেখানে টুল নিয়ে বসে থাকেন গেটে। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা। বেতন দশ হাজার।
বললাম, এই বেতনে কীভাবে চলেন! আকাশ দেখিয়ে দিলেন। বললেন, আল্লাহ আছে না? উনিই পার করে দেন। এখনতো তেমন টেনশন নেই। ছেলেকে এতদূর আনছি।
বললেন, সেই চাচি অর্থাৎ আমার শাশুড়ি আমাকে এক সময় মেনে না নিলেও এখন আমাকে খুব স্নেহ করেন। আমার রান্না বান্না করে দেন। তার মহব্বতের কারণে আজও টিকে আছি ছেলে মেয়ে নিয়ে। আমার নিজের জমি জমা কিচ্ছু নাই। আমার শ্বাশুড়ি তিন শতাংশ জমি আমার স্ত্রীর নামে দিয়েছিলেন। ওটা এখন আমার ছেলে ও মেয়েকে দেব। কিছুতো দিতে পারিনি নিজে।
কী হলো চাচা কাঁদছেন নাকি! বললেন, না না। কাঁদি না। তবে আপনার চাচি মানে আমার স্ত্রীর কথা খুব মনে পড়ে বাবা।
জানেন, দুইজন কতদিন না খেয়ে থেকেছি। যখন আপনার চাচিরে বিয়ে করি তখন আমি ক্লাস টেনের ছাত্র। কত মানুষ কত কথা বলতো। কিন্তু সে আমাকে কখনো কোনোদিন ভুল বুঝেনি। কত অভাবে থাকছি। আল্লাহ তার দয়ায় দিনগুলো পার করে দিছেন। কিন্তু দেখন আজ আমার স্ত্রী নেই। যে আমাকে ছাড়া থাকতে পারতো না সে কিনা সবকিছু ছেড়েই চলে গেল। কী হতো অসুখ নিয়েই নাহয় বেঁচে থাকতো। আমিতো একলা হতাম না।
তা বিয়ে করেননি কেন আর? বললেন, না না। আমার ছেলে মেয়ে দুটার কোনো অসুবিধা হোক তা চাইনি। আর তাছাড়া আমার বুকে স্ত্রীর মায়া আজো লেগে আছে। সেখানে অন্য কাউকে জায়গা দেয়া সম্ভব না কোনোদিন।
বললাম, চাচা আপনার হতাশ লাগে? মন খারাপ লাগে?
এবার আর চোখের পানি যেন ধরে রাখতে পারলেন না।
বললেন, হতাশ হইনা আমি। একভাবে না একভাবে জীবন কেটে যাচ্ছেই। আর আছিই বা দুনিয়ায় কতদিন! হ্যাঁ আমার অনেক টানাটানি হয় চলতে কিন্তু এসব আমার কাছে কিছু না। এর চেয়ে কত কঠিন দিন কাটাইছি আমি আর আপনার চাচি।
আমার খালি মন খারাপ লাগে আপনার চাচির জন্য।
আচ্ছা যখন খারাপ লাগে তখন কী করেন!
বললেন, তখন আর বসে থাকতে পারি না টুলে। জোরে জোরে এদিক ওদিক হাঁটি। আর মনকে বুঝ দেই। একদিন দেখা হবে, একদিন দেখা হবে। এমন করে করে মনটা একটু ভালো হলে তখন আবার কাজে মন দেই।
এভাবেই চলে যাচ্ছে বছরের পর বছর ইউনুস নামের এই লোকটার।
চলে আসার সময় বললাম, থাকেন চাচা যাই। দোয়া করি ভালো থাকেন। বললেন, আপনার চাচির জন্যও দোয়া কইরেন একটু বাবা। সেও যেন ওই দুনিয়ায় খুব ভালো থাকে। আমাদের যেন আবার দেখা হয়।
আহা প্রেম, আহা ভালোবাসা! প্রিয়তমার কথা ভেবে কাটিয়ে দিচ্ছেন বাকি জীবন। এর পাশাপাশি বাবা হয়ে মানুষ করেছেন ছেলে, মেয়েকে। তিনি একজন প্রিয়তম, তিনি একজন বাবা, একজন দায়িত্ববান মানুষ।
বললেন, জীবনে সুখ দুঃখ আসবেই। সব স্মৃতি ভুলতে নাই। এইটাও একটা শক্তি ভাতিজা। আমি এই শক্তি নিয়েই থাকি। আর কিছু চাই না।
ঢাকার নবাবগঞ্জের এই মানুষটার বয়সে পেকেছে চুল, পায়ে পুরনো স্যান্ডেল। জরাজীর্ণ জীবন। কিন্তু বুকের ভেতর তার স্ত্রীর জন্য মায়া আজও নতুন, টাটকা। হয়তো তিনিও গেয়ে ওঠেন কখনো কখনো- তুমি একবার দেখা দাও দরদি, যদি মনে চায়...