11/08/2026
অনেক মেধাবী কেন জীবনে ভালো করে না: অভিজ্ঞতা থেকে ৮টি কারণ
বাদল সৈয়দ
এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। অনেকে খুব ভালো করেছে—অনেকের আশানুরূপ হয়নি।
যারা ভালো করেছে তাদের অভিনন্দন।
যারা করেনি তাদের বলি, একশ মিটার স্প্রিন্টে যারা শুরুতে প্রথম দিকে থাকে তারা সবসময় বিজয়ী হয় না। পেছনের কেউ তাদের ছাড়িয়ে যায়। অতএব হতাশ হওয়ার কারণ নেই। স্টার্ট এগেইন। আবার শুরু করো।
তবে, আমার আলোচ্য বিষয় রেজাল্ট নয়। তা হলো কেন অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে জীবনে ভালো করে না।
আমাদের সময় খুবই ভালো ছাত্র ছিল হাসান। এসএসসি এবং এইচএসসি দুটোতেই স্ট্যান্ড করেছিল। আমরা নিশ্চিত ছিলাম, সে জীবনে বিশাল কিছু করবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার পর তার সাথে আর যোগাযোগ রইল না। শুনলাম, সে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
অনেকদিন পর আমাদের আরেক বন্ধু আবিষ্কার করল, হাসান চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে একটি টংয়ের চা দোকান চালায়!
যে ছেলের মেধায় দেশ আলোকিত হওয়ার কথা ছিল তার জীবন কাটছে টং দোকানের উনুন জ্বালিয়ে! ভাবা যায়!
এ রকম অসংখ্য হাসান আছে। যারা খুব মেধাবী ছিল, পরীক্ষায় দুর্দান্ত রেজাল্ট করেছিল, কিন্তু জীবনে সফল হতে পারেনি। জ্বলে উঠেই নক্ষত্রগুলো ঝরে গেছে!
এর কারণ কী?
আমার অভিজ্ঞতা বলে—
১) ধারাবাহিকতার অভাব:
অনেকেই কোনো পরীক্ষায় খুব ভালো করার পর তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারে না। এর কারণ অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। তারা ধরেই নেয় যে, চেষ্টা না করলেও শুধু মেধা দিয়ে পরের পরীক্ষায় ভালো করবে। এটি ভুল ধারণা। ‘মেধা’ পরীক্ষা দেয় না, তা পরীক্ষার বিষয়বস্তু দ্রুত আয়ত্ত করতে এবং তা চমৎকারভাবে উপস্থাপন করতে সাহায্য করে মাত্র। না পড়লে ‘মেধা’ কিছুই করতে পারে না। আমি নিজেই এর উদাহরণ। এসএসসিতে ভালো করার পর আমার গায়ে বেশ চর্বি এসেছিল। ভেবেছিলাম, মেধা দিয়ে পরের পরীক্ষা উতরে যাব। কিন্তু পরীক্ষার ছয় মাস আগে চোখে অন্ধকার দেখলাম। স্ট্যান্ড তো দূরের কথা, সেকেন্ড ডিভিশন পাই কি না সন্দেহ!
এই সময় এক অতি কঠোর সহপাঠী আমাকে ঘাড় ধরে পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে এনেছিল। সে না থাকলে আমি হয়তো গোল্লায় যেতাম।
২) অকাল প্রেম:
এটি অপ্রিয় সত্য। অনেক মেধাবীকে দেখেছি কলেজ-ইউনিভার্সিটি শুরু না করতেই প্রেমে জড়িয়ে পড়েছে। তারপর প্রেম ভাঙে, ছেলে বা মেয়েটিও ভাঙে। ভাঙতে ভাঙতে ধুলোকণায় পরিণত হয়।
যদি এই বয়সী কোনো ছেলেমেয়ে এ লেখা পড়ে, তবে তাকে বলছি—অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ে না যাওয়া পর্যন্ত প্রেম না করাই ভালো। কিন্তু আমি তো তোমার হৃদয়কে খাঁচাবন্দি করতে পারব না। তাই প্রেমে যদি পড়েই যাও, তবে তাতে পুড়ে ছাই হয়ে যেও না।
প্রেম করার জন্য অনেক সময় পাবে। কিন্তু পরের পরীক্ষার জন্য অত সময় নেই। তাই পড়াশোনা ঠিকভাবে করো। নয়তো পরীক্ষায় খারাপ করলে প্রেম জানালা দিয়ে উড়াল দেবে। নড়বড়ে ভবিষ্যতের সাথে প্রেম লটকে থাকে না। সটকে পড়ে। তখন যে প্রেমকে আজ মধু মনে হচ্ছে, সেটিকেই মনে হবে বিষ।
৩) রাজনীতি:
একটি করুণ বাস্তবতার কথা বলি—অনেকের ভবিষ্যৎ হারিয়ে যায় রাজনীতিতে জড়িয়ে। সৎ রাজনীতি একটি মহান পেশা। কিন্তু তাতে ভালো করার জন্য দীর্ঘ সময় ও ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রয়োজন। অল্প আয়ের পরিবারের সন্তানের পক্ষে এত সময় লেগে থাকা খুব কঠিন। তাই তারা একসময় ঝরে পড়ে, মাঝখান থেকে পড়াশোনা নষ্ট হয়। তাই পারিবারিক অবস্থা ভালো না হলে মেধাবীদের পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া উচিত। অন্য পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েও দেশ এবং জাতিকে অনেক কিছু দেওয়া সম্ভব। (তবে রাজনীতি সচেতন হতে বাধা নেই)
৪) পুঁথিগত বিদ্যা:
কিছু মেধাবী আছে যাদের কাছে একমাত্র পড়াশোনাই ধ্যানজ্ঞান। এর বাইরে তাদের কিছু জানা থাকে না।
কথায় আছে—‘পুঁথিগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে ধন, হলে প্রয়োজন।’
শুধু পুস্তকের জ্ঞান দিয়ে রিয়েল লাইফে টেকা যায় না। সেখানে টিকতে হলে বইয়ের বাইরেও অনেক কিছু শিখতে হয়। শুধু বরশি ফেলে বসে থাকলে মাছ ধরা যায় না। কখন বরশিতে টান দিতে হবে সেটাও জানতে হয়। একইভাবে সারাদিন পড়ার টেবিলে বসে থাকলেও কাজ হবে না, যদি ঠিক সময়ে সাফল্যের বরশি টানার দক্ষতা অজানা থেকে যায়।
৫) অন্য কাজে বেশি মনোযোগ:
শুধু পুঁথিগত বিদ্যা যেমন সমস্যা, একই সমস্যা হয় পড়াশোনা ছেড়ে অন্য কাজে খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে গেলে।
যেমন, অনেকেই মূল পড়াশোনা ছেড়ে শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি এগুলো নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে যায়। এগুলোতে জড়িত থাকা খুব ভালো—এতে অনেক সমৃদ্ধ হওয়া যায়। কিন্তু তাতে মূল পড়ালেখা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
৬) পারিবারিক পরিবেশ:
শুধু মেধাবী হলে হবে না। এ মেধা ধরে রাখার জন্য সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ দরকার। বাসায় সারাক্ষণ ঝগড়াঝাঁটি, অশান্তি থাকলে কারো পক্ষে পড়ালেখায় মনোযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে পরিবারকে সতর্ক থাকতে হবে।
আপনি আশা করছেন, আপনার সন্তান অমর্ত্য সেন হবে, অথচ তার কানের পাশে বাজাচ্ছেন অশান্তির বাঁশি! আপনার আশা দূরাশা হতে বাধ্য।
৭) আর্থিক সমস্যা:
আমি অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর কথা জানি যারা আর্থিক কারণে ঝরে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে অবস্থাপন্ন আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধব এগিয়ে এলে শুধু শিক্ষার্থীর ভাগ্য বদলায় না। তার পরবর্তী প্রজন্মের ভাগ্যও বদলে যায়।
৮) মাদকাসক্তি:
এটি নিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে না। লিখতে গেলেই আমার অতি মেধাবী বন্ধু নোহেলের লাশের ছবি ভাসে। যে ছেলেটির দেশবরেণ্য হওয়ার সম্ভাবনা ছিল—মাদকের কারণে সে অকালে টন টন মাটির নিচে শুয়ে আছে।
মেধা হচ্ছে মোমবাতির মাথায় থাকা সলতে। একবার জ্বালানোর পর যত্ন না নিলে তা দপ করে নিভে যায়। দীর্ঘ সময় তা জ্বালাতে হলে সলতেটির দিকে খেয়াল রাখতে হয়।
Keep your candle burning.
তোমার মোমবাতির সলতের দিকে নজর রাখো, যাতে তা নিভে না যায়।
অনেক শুভ কামনা।
⸻
সংগৃহীত - Badal Syed
পাদটীকা: নামগুলো বদলে দেওয়া হয়েছে।