05/06/2026
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
🌐 ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্যে জিলহজ মাস:
⏳ সোনালী অতীতের কুশলী নির্মাতা:
🗓️ ১৮ জিলহজ্ব ১৪৪৭ হিজরী:
💠 হযরত উসমান ইবন আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর ওফাত দিবস:
🖊️ ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান ইবন আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু। ৬৪৪ থেকে ৬৫৬ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত খিলাফতে অধিষ্ঠিত ছিলেন। খলিফা হিসেবে তিনি পাঁচজন খুলাফা-ই-রাশিদুনের একজন। হযরত উসমান আস-সাবিকুনাল আওয়ালুনের (প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী) অন্তর্ভূক্ত। এছাড়াও তিনি আশারায়ে মুবাশ্শারা'র একজন এবং সেই ৬ জন সাহাবীর মধ্যে অন্যতম যাদের উপর প্রিয় নবি মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তুষ্ট ছিলেন। তাঁকে সাধারণত হযরত উসমান হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
✅ জন্ম:
হযরত উসমানের জন্ম সন ও তারিখ নিয়ে বেশ মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশের মতে তাঁর জন্ম ৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ ‘আমুল ফীল’ বা হস্তীসনের ছয় বছর পর। এ হিসেবে তিনি প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়ে বয়সে ছয় বছরের ছোট। অধিকাংশ বর্ণনামতেই তার জন্ম সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে। অবশ্য অনেকের বর্ণনামতে তাঁর জন্ম তায়েফ নগরীতে বলা হয়েছে।
✅ পরিবার ও বংশ:
হযরত উসমানের উপাধি জুন-নুরাঈন এবং জুল-হিযরাতাইন। তাঁর পিতা আফ্ফান এবং মাতা আরওরা বিনতু কুরাইজ। তিনি কুরাইশ বংশের উমাইয়্যা গোত্রের সন্তান ছিলেন। তাঁর ঊর্ধ্ব পুরুষ আবদে মানাফে গিয়ে প্রিয় নবির বংশের সাথে মিলিত হয়েছে। তাঁর নানী বায়দা বিনতু আবদুল মুত্তালিব ছিলেন প্রিয় নবি (সা.)-এর ফুফু। সেই হিসাবে তিনি প্রিয় নবি’র ভাগ্নে।
ইসলাম গ্রহণের পর প্রিয় নবি তাঁর কন্যা রুকাইয়্যার সাথে উসমানের বিয়ে দেন। উসমান এবং রুকাইয়্যা ছিলেন প্রথম হিযরতকারী মুসলিম পরিবার। তাঁরা প্রথম আবিসিনিয়ায় হিযরত করেছিলেন। সেখানে তাঁদের একটি ছেলে জন্ম নেয় যার নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ ইবন উসমান। আবদুল্লাহ্ ইবন উসমান ছয় বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। বদরের যুদ্ধের পরপর রুকাইয়্যা ইন্তিকাল করেন। এরপর হযরত উসমানের সাথে উম্মে কুলসুমের বিয়ে হয় যদিও তাঁদের ঘরে কোনো সন্তান আসে নি। হিজরি নবম সনে উম্মে কুলসুমও ইন্তিকাল করেন।
প্রিয় নবি (সা.) বলেছেন, হযরত ইব্রাহীম ও হযরত লুত আলাইহিসসালামের পর উসমান (রাদ্বি.)ই প্রথম ব্যক্তি- যিনি আল্লাহর পথে নিজের স্ত্রী সহ হিযরত করেন।
✅ প্রাথমিক জীবন:
অন্যান্য অনেক সাহাবীর মতোই ইসলাম গ্রহণের পূর্বে হযরত উসমানের জীবন সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় নি। উসমান কুরাইশ বংশের অন্যতম বিখ্যাত কুষ্ঠিবিদ্যা বিশারদ ছিলেন। কুরাইশদের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল। ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও তার এমন বিশেষ কোনো অভ্যাস ছিল না যা ইসলামী নীতিতে ঘৃণিত। যৌবনকালে তিনি অন্যান্য অভিজাত কুরাইশদের মতো ব্যবসায় শুরু করেন। ব্যবসায়ে তাঁর সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। মক্কার সমাজে একজন ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন বলেই তাঁর উপাধি হয়েছিল গনি যার অর্থ ধনী।
✅ মক্কায় থাকাকালীন অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ:
৬১১ সালে তিনি সিরিয়া থেকে বাণিজ্য করে ফিরে প্রিয় নবির ইসলাম প্রচার সম্পর্কে জানতে পারেন এবং হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র মাধ্যমে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র নিকট ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি প্রথম দিকের ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম।
হিযরতের পর মদীনায় থাকাকালীন অবস্থায়:
হযরত উসমান খুব লাজুক সভাবের ছিলেন। নবি (সা.) ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন যে, উসমান আল্লাহ্ তোমাকে পোশাক পরাবে কিন্তু লোকেরা সেটা খোলার চেষ্টা করবে। তুমি খুলবেনা। সেই পোশাকটির উদ্দেশ্য ছিলো খিলাফতের দায়িত্ব পাওয়া।
✅ অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রশাসন:
তিনি বায়তুল মাল থেকে জনগণকে দেওয়া ভাতা ২৫% বাড়িয়ে দেন যা উমার রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র সময় সবার জন্য নির্দিষ্ট ছিল। বিজিত অঞ্চলের কৃষি জমি বিক্রির উপর উমারের নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে তিনি এর অনুমোদন প্রদান করেন। তাঁর করা অর্থনৈতিক পুনঃগঠনের কারণে খিলাফতের মুসলিম অমুসলিম সবাই অর্থনৈতিক সুফল ভোগ করতে পারতো।
✅ ওফাত লাভ:
হযরত উসমান যেদিন খলিফা নির্বাচিত হন, সেদিন তিনি সর্বোত্তম ব্যক্তি ছিলেন। আর যখন তাঁকে হত্যা করা হয়, সেদিনও তিনি উত্তম ছিলেন। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহর হিকমত অনুসারে জিন্নুরাঈনের ওপর মতানৈক্য দেখা দেবে এবং লোকেরা তাঁকে শহীদ করবে। অথচ তিনি তখন হকের ওপরই থাকবেন এবং তার বিরোধীরা থাকবে বাতিলের ওপর।" শেষ পর্যন্ত মিসর, বসরা ও কুফার বিদ্রোহী গোষ্ঠী একাট্টা হয়ে ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় সমবেত হয়ে খলিফার পদত্যাগ দাবি করে। হজ উপলক্ষে অধিকাংশ মদিনাবাসী মক্কা গমন করায় তারা এ সময়কেই মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। খলিফা পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানালে তারা হত্যার হুমকি দিয়ে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখে। হযরত উসমান রক্তপাতের সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। বিশাল মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে মুষ্টিমেয় বিদ্রোহীর কঠোর শাস্তিদানের পরিবর্তে তিনি তাদের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে থাকলেন। হযরত আলী, তালহা ও জুবাইরের ছেলেদের দ্বারা গঠিত ১৮ নিরাপত্তারক্ষী বিপথগামী বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় ব্যর্থ হন। অবশেষে তারা ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুন হিজরি ৩৫ সনের ১৮ জিলহজ শুক্রবার আসরের নামাযের পর ৮২ বছর বয়স্ক বৃদ্ধ খলিফাকে অত্যন্ত বর্বরভাবে পবিত্র কোরআন পাঠরত অবস্থায় শহীদ করা হয়।
📓 তথ্যসূত্র: ‘বাংলা উইকিপিডিয়া’।