23/12/2025
হযরত আয়েশা (রা.)-প্রতি মিথ্যা অপবাদ ও আল্লাহর পক্ষ থেকে পবিত্রতা ঘোষণা!
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন বনু মুস্তালিকের যুদ্ধ থেকে ফিরছিলেন, তখন হযরত আয়েশা (রা.) তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন। কাফেলা মদিনার কাছাকাছি পৌঁছালে যাত্রাবিরতি দেয়। আয়েশা (রা.) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ক্যাম্পের বাইরে যান। ফিরে এসে দেখেন তাঁর গলার হার হারিয়ে গেছে। তিনি হার খুঁজতে আবার ফিরে যান।
ইতিমধ্যে কাফেলা যাত্রার প্রস্তুতি নেয়। আয়েশা (রা.) তখন খুব হালকা-পাতলা ছিলেন। তাই বাহক লোকেরা হাওদা (পালকি) উঠানোর সময় বুঝতে পারেনি যে ভেতরে কেউ নেই। তারা ভাবল আয়েশা (রা.) ভেতরেই আছেন। কাফেলা চলে গেল। আয়েশা (রা.) ফিরে এসে দেখলেন কেউ নেই। তিনি সেখানেই চাদর মুড়িয়ে বসে রইলেন, ভাবলেন লোকেরা তাকে না পেয়ে ফিরে আসবে। কিন্তু তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন।
কাফেলার পেছনে পড়ে থাকা জিনিস কুড়ানোর দায়িত্বে ছিলেন সাহাবি সাফওয়ান বিন মুয়াত্তাল (রা.)। তিনি সকালে সেখানে পৌঁছে একজন ঘুমন্ত মানুষকে দেখলেন। পর্দার বিধানের আগে তিনি আয়েশা (রা.)-কে দেখেছিলেন, তাই চিনতে পারলেন। তিনি উচ্চস্বরে "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন" পড়লেন। শব্দ শুনে আয়েশা (রা.) জেগে উঠলেন এবং চাদর দিয়ে মুখ ঢাকলেন। সাফওয়ান (রা.) কোনো কথা না বলে নিজের উটটি বসিয়ে দিলেন। আয়েশা (রা.) উটে উঠলেন এবং সাফওয়ান (রা.) উটের রশি ধরে হেঁটে মদিনায় নিয়ে এলেন।
মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এই দৃশ্য দেখে কুৎসা রটালো। সে আয়েশা (রা.) এবং সাফওয়ান (রা.)-এর চরিত্রে মিথ্যা অপবাদ দিল। কিছু সরলমনা সাহাবি (যেমন মিসতাহ বিন উসাসা, হাসসান বিন সাবিত ও হামনা বিনতে জাহশ রা.) এই গুজবে কান দিলেন।
মদিনায় ফিরে আয়েশা (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি গুজবের কিছুই জানতেন না। কিন্তু তিনি লক্ষ্য করলেন, নবীজি (সা.) তার সাথে আগের মতো উষ্ণ ব্যবহার করছেন না। পরে তিনি উম্মে মিসতাহর কাছে সব শুনলেন। দুঃখে-শোকে দিনরাত কাঁদতে লাগলেন।
ওহি না আসায় নবীজি (সা.) খুব চিন্তিত ছিলেন। তিনি হযরত আলী (রা.) ও উসামা (রা.)-এর সাথে পরামর্শ করলেন। উসামা (রা.) আয়েশার পবিত্রতার পক্ষে বললেন। আলী (রা.) বললেন, "দাসী বারীরাকে জিজ্ঞেস করুন।" বারীরাও আয়েশা রা. এর পক্ষে সাক্ষ্য দিলেন।
নবীজি মসজিদে মিম্বরে দাঁড়িয়ে বললেন: "কে আমাকে সেই ব্যক্তির (আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই) হাত থেকে রক্ষা করবে, যে আমার পরিবারকে কষ্ট দিয়েছে? আল্লাহর কসম! আমি আমার পরিবার ও ওই ব্যক্তি (সাফওয়ান রা.) সম্পর্কে ভালো ছাড়া কিছুই জানি না।"
এক মাস কেটে গেল। একদিন নবীজি আয়েশা (রা.)-এর কাছে এলেন এবং বললেন: "হে আয়েশা! যদি তুমি নির্দোষ হও তবে আল্লাহ তোমাকে পবিত্র ঘোষণা করবেন। আর যদি ভুল হয়ে থাকে তবে তওবা করো।"
আয়েশা (রা.) বললেন: "আমি কিছুই বলব না। আমি শুধু ইউসুফ (আ.)-এর বাবার (ইয়াকুব আ.) মতো বলব—'ফাসাবরুন জামিল' (ধৈর্যই শ্রেয়)..."
ঠিক তখনই নবীজির ওপর ওহি নাজিল হতে শুরু করল। তার শরীর থেকে ঘাম ঝরতে লাগল। ওহি শেষ হলে তিনি হেসে বললেন:
"হে আয়েশা! সুসংবাদ নাও! আল্লাহ তোমাকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন।"
আল্লাহ তায়ালা সূরা নূরের ১০টি আয়াত নাজিল করে আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতা ঘোষণা করলেন।
হযরত আবু বকর (রা.) মিসতাহকে (যিনি অপবাদে জড়িত ছিলেন) খরচ দিতেন। তিনি কসম করলেন আর খরচ দেবেন না। তখন আল্লাহ আয়াত নাজিল করলেন: "তোমাদের মধ্যে যারা মর্যদাবান তারা যেন আত্মীয় ও গরিবদের দান করা বন্ধ না করে... তোমরা কি চাও না আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?" (সূরা নূর: ২২)।
আবু বকর (রা.) সাথে সাথে বললেন, "অবশ্যই আমি চাই আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন।" তিনি আবার খরচ দেওয়া শুরু করলেন।
(সূত্র: বুখারী,মুসলিম)
চরম বিপদে এবং মান-সম্মানের ওপর আঘাত এলেও হযরত আয়েশা (রা.)-এর মতো 'ফাসাবরুন জামিল' বা উত্তম ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা উচিত। কেউ যদি সত্যিই নির্দোষ হয়, তবে দুনিয়ার মানুষ তার বিরুদ্ধে গেলেও স্বয়ং আল্লাহ তার সম্মান রক্ষার ব্যবস্থা করেন।
© Salman Farsi