01/03/2026
অভিনেতা জাহের আলভী–এর স্ত্রী ইকরা আত্মহত্যা করেছেন—অধিকাংশ পত্রিকার নিউজের ক্যাপশন এটা। কয়েকজন লিখেছেন, ইকরা ফেসবুকে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন।
আমি তার ফেসবুকের পোস্ট কিছু সময় নিয়ে দেখলাম। তাদের দুজনের বেশ কয়েকটা ইন্টারভিউ দেখলাম। নানান মানুষ নানানভাবে ব্যাপারটার ব্যাখ্যা দিচ্ছে।
আমাকে কয়েকটা ব্যাপার পীড়া দিয়েছে।
প্রথমত, ইকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা করা একটা মেয়ে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের শেখায় না যে দুঃখ এবং কষ্টকে কীভাবে ম্যানেজ করতে হয়। ইকরা তার কষ্টকে কিংবা বিষণ্ণতাকে ম্যানেজ করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে।
দ্বিতীয় যে ব্যাপারটা খুব দুঃখজনক—আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নির্ভরতা। আমি ইকরা মেয়েটার অসংখ্য পোস্ট দেখলাম—তার বিবাহিত জীবন নিয়ে, ছেলেকে নিয়ে, বন্ধুদের নিয়ে, তার নানান দেশ ভ্রমণ নিয়ে। সেখানে মানুষের অসংখ্য কমেন্ট।
কি সুন্দর জুটি। কি দারুণ মজা হচ্ছে। রূপকথার জীবন মনে হচ্ছে।
সাইকোলজির গভীরে গেলে দেখা যায়, এটা এক ধরনের অসুস্থতা। এটা এক ধরনের নিজের তৈরি করা নিজের ওপর আত্মঘাতী চাপ।
মানুষের এসব মন্তব্য পোস্টদাতা কিংবা দাত্রী একসময় বিশ্বাস করতে শুরু করে। সিরিয়াসলি নিতে শুরু করে। সে নিজেকে আরও দারুণভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সে ভাবতে শুরু করে—আমরা আদর্শ জুটি। আমরা দারুণ। আমরাই সবার আইডল।
আমরা যে কেউ এই পৃথিবীতে পারফেক্ট না। আমাদের যে দুঃখ, কষ্ট, বিষণ্ণতা, সীমাবদ্ধতা আছে—সেটা এই মানুষগুলো ভুলে যায়।
আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য যে সুখের সময়ে সুখের স্মৃতি তৈরি করা আর বৃষ্টির দিনের জন্য ছাতা কিনে রাখা—সেটা আমরা ভুলে যাই।
প্রতিদিন যে একইভাবে চলবে না, সেটা আমরা বেমালুম ভুলে যাই।
একটা সময় একটা লোক দেখানো প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।
কিছুদিন পূর্বেই ইকরা তার স্বামীর জন্মদিন পালন করে। অভিনেতা জাহেদ আলভী সেদিন বাসায় আসে রাত দুটার সময়। তাদের পাঁচ বছরের ছেলে রাত দুটা পর্যন্ত জেগে থেকে তাকে সারপ্রাইজ দেয়। বাবাকে শুভ জন্মদিন বলে। কেক কাটে। নিশ্চয় এটা ইকরার প্ল্যান ছিল।
এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সেটা ভিডিও করে যখন আপনি ফেসবুকে দেবেন, তখন বুঝতে হবে—আপনাদের নিজেদের আনন্দ থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টটা আপনার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গিয়েছে।
বাংলাভিশন–এ আমি তাদের একটা ইন্টারভিউ দেখলাম। সেখানে ছেলেটা বলছিল—আমি ব্যালেন্স করতে পারি। অর্থাৎ অভিনেতা জাহেদ আলভী বিশ্বাস করতেন, তিনি ব্যালেন্স করতে পারেন।
এবং রিলসগুলো দেখলে তার কিছুটা সত্যতাও মেলে। তিনি অধিকাংশ রিলসে তার স্ত্রীকে সঙ্গ দিতেন। ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ কঠিন মনে হয়েছে। সারাদিন শুটিং করে এসে বউয়ের সঙ্গে রিলসে নাচানাচি করা কঠিনই বটে।
কিন্তু জাহেদ আল্ভী যেটা বুঝতে পারেননি সবকিছু তিনি ব্যালেন্স করতে পারেন না। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বিপদ ডেকে আনে।
অন্যদিকে সেই ইন্টারভিউতে আমার কাছে মনে হয়েছিল, ইকরা তার স্বামী আলভীর ভুল ধরতে চেষ্টা করছিলেন। ভালোবাসায় তিনি আলভীর থেকে এগিয়ে আছেন—সেটা বারবার প্রমাণে তিনি ব্যস্ত ছিলেন।
এটা তখনই হয় যখন কেউ মানুষের কাছে নিজেকে একজন পারফেক্ট প্রেমিকা কিংবা বৌ হিসেবে উপস্থাপন করতে চান।
আমরা ভুলে যাই সংসার জীবন হচ্ছে জীবনের একটা অংশ। পুরো জীবন না।
এখানে পারফেকশন জরুরী না।
অনেকেই ধারণা করছেন, তাদের দাম্পত্য কলহ চলছিল।
কিন্তু দাম্পত্য কলহের জন্য আত্মহত্যা করতে হবে?
স্বামী চলে যাবে কিংবা বউ চলে যাবে—দেখে আত্মহত্যা করতে হবে?
বিশ্বাসভঙ্গ করেছে—তাই আত্মহত্যা করতে হবে?
আমাদের সমাজব্যবস্থা এত বেশি স্বামী কিংবা বউকেন্দ্রিক কেন?
আমাদের সুখের কি অন্য কোনো উৎস নেই? আমাদের বেঁচে থাকার আর কোনো কারণ নেই?
আপনি যখন আপনার জীবনের সব ইনভেস্টমেন্ট একটা জায়গায় করবেন, তখন আপনার বিষণ্ণতা আসবেই।
আমরা কিন্তু প্রচুর ভিডিও দেখি, রিলস দেখি। ইকরাকেও দেখলাম কয়েকটা ভিডিও শেয়ার করতে। একটা ভিডিওতে দেখলাম—ইন্ডিয়ান একজন অভিনেত্রী মেয়েদের উদ্দেশে বলছে,
তোমার একটা ফ্রেন্ড সার্কেল করো, যেখানে তুমি তোমার জীবনের রাগ, দুঃখ, ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারবে।
সেটা ইকরা শেয়ার করে লিখেছে—ইয়েস ইয়েস।
অথচ ইকরা নিজেই সেটা করেনি।
কেন করেনি?
এই মেসেজটাকে অনুধাবন করে তার গভীরে সে যেতে পারেনি।
আমরা একের পর এক রিলস দেখতে থাকি। সেই আগের দিনের মতো বই পড়ে অনুভব করার মানুষ এখন কই?
দশ সেকেন্ডের একটা রিলস দেখে আমরা পরের রিলসে চলে যাই। আমাদের আর শেখা হয় না জীবনবোধ। আমাদের আর বুঝা হয় না।
অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে—আমাদের উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত মানুষগুলো খুব নাজুক। আমরা শিক্ষিত, কিন্তু মানসিকভাবে শক্তিশালী না।
আমি আমার কাজের মেয়ের এই পর্যন্ত তিনজন স্বামী দেখলাম। সে কিছুদিন পরপর গ্রামে যায়, বিয়ে করে, আবার কিছুদিন পর তার ডিভোর্সও হয়।
এদের মধ্যে কোনো আত্মহত্যার প্রবণতা নেই। যদিও তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি থাকার কথা ছিল।
চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করলাম—
বিয়ে কী?
সে উত্তরে বলল—
বিয়ে হলো সামাজিক, ধর্মীয় ও আইনগতভাবে স্বীকৃত একটি সম্পর্ক, যেখানে একজন পুরুষ ও একজন নারী একসঙ্গে সংসার করার অঙ্গীকার করে।
এরপর আবার জিজ্ঞেস করলাম—
বিয়ে কি ভাঙা যায়?
উত্তরে বলল—
হ্যাঁ, বিয়ে ভাঙা যায়—তবে সেটা নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
ইসলামে বিয়ে একটি চুক্তি। তাই প্রয়োজনে তা বিচ্ছেদ করা যায়।
• স্বামী তালাক দিতে পারে।
• স্ত্রীও নির্দিষ্ট শর্তে বিচ্ছেদ করতে পারে।
• কোর্টের মাধ্যমেও ফয়সালা হতে পারে।
যেটা ভাঙা যায়, সেটা নিয়ে আমাদের এত সিরিয়াসনেসের কোনো কি কারণ আছে?
কিন্তু এটা নিয়ে আমরা দারুণ সিরিয়াস। মনে হয়, মানবজীবনের প্রধান কাজ হচ্ছে বিয়ে করা।
মানুষ বেঁচে থাকে শুধু সংসার করার জন্য।
আমাদের খুব কাছের দেশ মালদ্বীপ। মুসলিম দেশ। সেই দেশে বিবাহবিচ্ছেদের হার পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। সেখানে প্রতি বছর বিয়ে এবং বিচ্ছেদের হার প্রায় একই—১০০ জন বিয়ে করে, আবার ১০০ জনের বিচ্ছেদ হয়।
মুসলিম দেশ হলেও সেখানে এই নিয়ে কোনো সমস্যা তৈরি হয় না।
সমাজ খুব সহজভাবে এটা মেনে নেয়।
আর আমাদের দেশে বিবাহবিচ্ছেদ মানে এক ধরনের ক্রাইম। প্রচণ্ড মানসিক চাপ, সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
ইকরা আত্মহত্যা করে নিজেকে মুক্ত করে দিয়েছে।
অভিনেতা আলভীও নিজের মতো জীবন বেছে নেবে।
কষ্টটা হবে তাদের সন্তানের। বাচ্চাটা বড় হলেও হয়তো এত কষ্ট হতো না। পাঁচ বছরের বাচ্চাটার জন্য কষ্ট হচ্ছে।
এদের জন্য প্রচণ্ড রাগ হয়।
আমাদের দেশে আইন করে বাচ্চা নেওয়ার আগে মানসিক স্থিরতা চেক করা উচিত। অসুস্থ থাকলে, বিষণ্ণতা থাকলে মানসিক কাউন্সেলরের কাছে যাওয়া উচিত। তাদের কখনোই বাচ্চা নেওয়া উচিত না। বাচ্চা নেওয়ার আগে মানসিক স্থিরতার সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা উচিত। প্রতিবছর তার নবায়নের ব্যবস্থা থাকা উচিত।
জীবনে উত্থান-পতন আসবে—তাই বলে নিজেকে শেষ করার কোনো অর্থ হয় না।
জীবনে মানুষ আসবে-যাবে—কারো জন্য নিজেকে শেষ করার কোনো অর্থ হয় না।
পাছে লোকে কী বলবে—তার জন্য নিজেকে মেরে ফেলার কোনো অর্থ হয় না।
প্রত্যেকের জীবন শুধুমাত্র তার। অন্য কারও না। তার সুখও তার, তার দুঃখও তার। অন্য কেউ জীবনে নিজের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।
লেখক : Mohammad Aminul Islam