09/08/2026
নবজাতক ঘরে এসেছে—আমরা তাকে কী দিয়ে স্বাগত জানাচ্ছি?
একটি শিশুর জন্মের খবর এলে ঘরজুড়ে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। ছোট জামা কেনা হয়, নাম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, কে কোলে নেবে তা নিয়ে ব্যস্ততা থাকে, ছবি তোলা হয়, আত্মীয়দের জানানো হয়। এগুলো স্বাভাবিক আনন্দ। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই খুব সহজে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়—এই শিশুটি শুধু আমাদের সন্তান নয়, আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত।
সে পৃথিবীতে এসেছে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ অবস্থায়। এখন তার চারপাশের পরিবেশ, তার কানে পৌঁছানো শব্দ, তার জন্য বেছে নেওয়া নাম, তার ঘরে দেখা দ্বীন—সবকিছু ধীরে ধীরে তার পরিচয়ের অংশ হবে।
তাই ইসলাম নবজাতককে স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রেও আমাদের কিছু সুন্দর আদব ও সুন্নাহ শিখিয়েছে। এগুলো শুধু কয়েকটি “রীতি” নয়। একটু গভীরভাবে দেখলে প্রতিটির ভেতরে যেন একটি বার্তা আছে—শিশুর জীবনটা শুরু হোক আল্লাহকে কেন্দ্র করে।
১. কানে আযান—জীবনের শুরুতেই আল্লাহর বড়ত্বের ঘোষণা
হাসান ইবন আলী رضي الله عنه জন্মগ্রহণ করলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর কানে সালাতের আযানের মতো আযান দিয়েছিলেন—এমন একটি বর্ণনা জামে আত-তিরমিযিতে এসেছে। এ বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পরবর্তী মুহাদ্দিসদের মধ্যে কিছু আলোচনা রয়েছে; তাই এটিকে ফরজ বা না করলে গুনাহ—এভাবে বলা ঠিক নয়। তবে বহু আলেম নবজাতকের ডান কানে আযান দেওয়াকে মুস্তাহাব বলেছেন।
একটু ভাবুন—শিশুটি পৃথিবীতে এসে কত শব্দ শুনবে। একদিন তাকে বলা হবে, “বড় হও”, “ভালো চাকরি কর”, “অনেক টাকা আয় কর”, “মানুষের চেয়ে এগিয়ে যাও”। কিন্তু তার জীবনের একেবারে শুরুতেই যদি তার কানে পৌঁছে যায়—
الله أكبر — আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।
তাহলে যেন বাবা-মা নিজেদেরও মনে করিয়ে দেন: “আমরা তোমাকে পৃথিবীর জন্য বড় করব, কিন্তু পৃথিবীকেই তোমার রব বানাব না।”
একটি সতর্কতা: নবজাতকের বাম কানে ইকামত দেওয়ার প্রচলিত বর্ণনা শক্তভাবে প্রমাণিত নয়। তাই সুন্নাহর নামে এমন কিছু নিশ্চিত করে বলা উচিত নয়, যা নিশ্চিত নয়।
২. তাহনীক—নবজাতকের জন্য বরকতের দু‘আ
সাহাবি আবু মূসা رضي الله عنه তাঁর নবজাতক ছেলেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে নিয়ে গেলে তিনি শিশুটির নাম ইবরাহিম রাখেন, খেজুর দিয়ে তাহনীক করেন এবং তার জন্য বরকতের দু‘আ করেন। সহিহ বুখারিতে ঘটনাটি এসেছে।
তাহনীক বলতে অল্প পরিমাণ নরম করা খেজুর শিশুর তালুতে লাগানো বোঝায়। এটি খাবারের আয়োজন নয়; বরং সুন্নাহর একটি কোমল আমল। নবজাতকের ক্ষেত্রে যেকোনো কিছু করতেই নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি।
কিন্তু তাহনীকের দৃশ্যটি আমাকে আরও একটি কথা মনে করিয়ে দেয়—আমরা সন্তানকে জীবনের প্রথম দিন থেকেই কত কিছু দিতে চাই। দামি জামা, সুন্দর ঘর, খেলনা, ভালো স্কুল। অথচ সবচেয়ে বড় চাওয়া হওয়া উচিত—
“হে আল্লাহ, আমার সন্তানের জীবনে বরকত দিন।”
কারণ অনেক পাওয়া আর বরকত পাওয়া এক জিনিস নয়।
৩. সুন্দর নাম—কারণ এই নামেই তাকে ডাকা হবে
একটি শিশুর নাম শুধু জন্মনিবন্ধনের একটি ঘর পূরণ করার বিষয় নয়। এই নামটি সে সারাজীবন বহন করবে। মা তাকে এই নামে ডাকবেন, বন্ধুরা এই নামে চিনবে, একদিন হয়তো তার সন্তানরাও এই নামের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় জুড়বে।
তাই নাম বাছাইয়ের সময় শুধু “ইউনিক” বা “স্টাইলিশ” শুনাচ্ছে কি না, এটুকুই দেখলে হয় না। নামের অর্থ সুন্দর কি না, ইসলামীভাবে গ্রহণযোগ্য কি না—এটিও দেখতে হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নামগুলোর মধ্যে রয়েছে আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান।
নবজাতকের জন্মের দিনও নাম রাখা যায়; আবার সপ্তম দিনে নাম রাখার বর্ণনাও এসেছে।
তাই নাম নিয়ে মাসের পর মাস এমন প্রতিযোগিতা করার প্রয়োজন নেই—“কারও সন্তান যেন এই নাম না রাখে”, “সবচেয়ে rare নাম চাই।” বরং প্রশ্ন হোক: এই নামের অর্থ শুনে আমি খুশি হব তো? এই নাম আমার সন্তানের জন্য একটি সুন্দর পরিচয় হবে তো?
৪. সপ্তম দিনে আকীকা—সন্তানের আগমনকে ইবাদতে পরিণত করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ নবজাতকের সপ্তম দিনে আকীকা করার কথা বলেছেন। একটি সহিহ বর্ণনায় এসেছে—সপ্তম দিনে তার জন্য পশু জবাই করা হবে, নাম রাখা হবে এবং মাথা মুণ্ডন করা হবে।
ছেলে শিশুর জন্য দুটি এবং মেয়ে শিশুর জন্য একটি পশুর কথা হাদিসে এসেছে।
কিন্তু এখানে একটি সুন্দর শিক্ষা আছে। সন্তান জন্মেছে—আমরা আনন্দ করব। ইসলাম আনন্দ বন্ধ করেনি। বরং সেই আনন্দকেও আল্লাহর আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
অর্থাৎ আমাদের celebration শুধু decoration, cake, photo shoot আর social media announcement-এর মধ্যে আটকে থাকবে না। আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করব, মানুষকে খাওয়াব, আত্মীয়দের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করব।
আর কারও আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে আকীকার জন্য ঋণে ডুবে যাওয়া বা লোকলজ্জায় নিজেকে কষ্ট দেওয়া ইসলামের উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।
৫. মাথা মুণ্ডন ও সদকা—আনন্দের সঙ্গে অন্যের হকও মনে রাখা
হাসান رضي الله عنه-এর আকীকার সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ ফাতিমা رضي الله عنها-কে তাঁর মাথা মুণ্ডন করে চুলের ওজন পরিমাণ রূপা সদকা করতে বলেছিলেন—এমন বর্ণনা তিরমিযিতে রয়েছে।
এখানে বিশেষভাবে ছেলে শিশুর মাথা মুণ্ডনের বিষয়টি হাদিসে এসেছে। মেয়ে শিশুর মাথা মুণ্ডন নিয়ে ফকিহদের বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে; তাই সব নবজাতকের ক্ষেত্রে একভাবে প্রয়োগ করে দেওয়া ঠিক নয়।
তবে দৃশ্যটা কত সুন্দর—আপনার ঘরে নতুন একজন মানুষ এসেছে, আর সেই আনন্দের দিনেই একজন দরিদ্র মানুষও আপনার আনন্দের অংশ পাচ্ছে।
আমরা সন্তানের জন্য উপহার জমাই। ইসলাম যেন শেখায়—সন্তানের আগমনে শুধু ঘরের ভেতর নয়, ঘরের বাইরেও কিছু কল্যাণ ছড়িয়ে দাও।
৬. ছেলে শিশুর খতনা—ফিতরাতের একটি অংশ
রাসূলুল্লাহ ﷺ খতনাকে ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত আমলগুলোর একটি বলেছেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—খতনা ঠিক জন্মের পরপরই বা সপ্তম দিনেই করতেই হবে—এমন নির্দিষ্ট সময় সহিহ হাদিসে নির্ধারিত নেই। তাই এটিকে “সপ্তম দিনের আবশ্যিক সুন্নাহ” হিসেবে প্রচার করা ঠিক নয়। শিশুর নিরাপত্তা, উপযুক্ত চিকিৎসাব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট ফিকহি নির্দেশনা বিবেচনায় সঠিক সময়ে এটি করা হবে।
কিন্তু এর পর?
এখানেই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে।
আপনি শিশুর কানে আযান দিলেন। তাহনীক করালেন। সুন্দর নাম রাখলেন। আকীকা করলেন। সদকা করলেন। খতনাও করালেন।
তারপর?
যে শিশুর কানে জন্মের পর “আল্লাহু আকবার” শোনালাম, সে যখন পাঁচ বছর বয়সে আমাদের সালাত ফেলে দিতে দেখবে, তখন কী শিখবে?
যার সুন্দর ইসলামী নাম রাখলাম, সে যখন ঘরে গীবত, মিথ্যা, গালি আর হারাম-হালালের ব্যাপারে উদাসীনতা দেখবে—তখন শুধু নামটি কি তাকে দ্বীনের মানুষ বানাবে?
যার জন্য আকীকা করলাম, তার সামনে যদি আমরা হালাল-হারামের সীমা নিজেরাই ভাঙি, তাহলে প্রথম সপ্তাহের সুন্নাহগুলো কি যথেষ্ট হবে?
এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় আত্মসমালোচনা।
নবজাতকের সুন্নাহ শুধু জন্মের সাত দিনের একটি checklist নয়। এগুলো যেন বাবা-মায়ের কাছে একটি ঘোষণা—
“এই শিশুটিকে আমরা শুধু বড় করব না; আল্লাহকে চিনিয়ে বড় করার চেষ্টা করব।”
তার প্রথম কয়েক দিনের সুন্নাহ সুন্দর হোক, কিন্তু তার পরের পাঁচ বছর, দশ বছর, বিশ বছরও যেন দ্বীনের ছায়ায় সুন্দর হয়।
একদিন এই ছোট্ট শিশুটি বড় হবে। আপনার কোলে থাকবে না। নিজের সিদ্ধান্ত নেবে, নিজের বন্ধু বেছে নেবে, নিজের জীবন গড়বে।
তখন হয়তো আপনার সবচেয়ে বড় স্বস্তি হবে না যে তার ভালো চাকরি হয়েছে বা সে অনেক টাকা আয় করছে।
আপনার সবচেয়ে বড় শান্তি হবে যদি দেখেন—
সে একা থাকলেও আল্লাহকে ভয় করে।
কষ্টে পড়লে আল্লাহর কাছে ফিরে যায়।
হারামের সামনে “না” বলতে পারে।
সালাতকে বোঝা মনে করে না।
আর আপনার মৃত্যুর পরও আপনার জন্য দু‘আ করে।
তাই নবজাতককে স্বাগত জানানোর সবচেয়ে সুন্দর সুন্নাহ শুধু তার জন্মের দিনগুলোর আমল নয়।
সবচেয়ে বড় সুন্নাহ হলো—তার সামনে এমন একটি ঘর তৈরি করা, যেখানে ইসলাম শুধু শেখানো হয় না, বেঁচে দেখানো হয়।
আল্লাহ আমাদের সন্তানদের চোখের শীতলতা বানান, তাদের ঈমান ও চরিত্র সুন্দর করুন এবং আমাদের এমন বাবা-মা বানান, যাদের দেখে সন্তান দ্বীনকে ভালোবাসতে শেখে। আমিন।
📌 পোস্টটি এমন কোনো নতুন মা-বাবার কাছে পৌঁছে দিন, যাদের হয়তো এই কথাগুলো এখনই জানা দরকার।
🌿 বাস্তব জীবনের প্রশ্ন, চিন্তা ও সমস্যার ইসলামিক সমাধান পেতে NahWa Ad-Deen Follow করে রাখুন।
📚 ফ্রি ইসলামিক বই পেতে ইলমযাত্রা | Free Islamic Books গ্রুপে যুক্ত হোন।
🎓 ফ্রি দ্বীনি ক্লাস করতে রিহলাতুল ইলম | Free Islamic Classes গ্রুপে যুক্ত হোন।