29/05/2026
যে সকল বাবা মায়েরা ছেলে-মেয়েদেরকে অনেক বড় ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য হাড় ভাঙ্গা খাটুনি খাটছেন এবং ছেলে-মেয়েদের আমেরিকা কানাডা অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে সেখানে সেটেল করার জন্য পাগল হয়ে গেছেন তারা নিম্নলিখিত লেখাটি একটু মনোযোগ দিয়ে পড়বেন দয়া করে।
আমার নাম সুফিয়া। বয়স ৬২। গত তিন বছর ধরে এই ফ্ল্যাটটাই আমার পৃথিবী। এক সময় যখন আমার স্বামী বেঁচে ছিলেন, এই ঘরটা ছিল একটা ছোটখাটো স্টেশনের মতো। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী—কারও না কারও আনাগোনা লেগেই থাকত। এখন সেই ড্রয়িংরুমের সোফাগুলোতে ধুলো জমেছে, আর আমার গলার স্বর নিজের কানেই অচেনা লাগে।
আমার এক ছেলে আর এক মেয়ে। দুজনেই সুপ্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে আর্কিটেক্ট, উত্তরায় নিজের ফ্ল্যাটে থাকে। আর মেয়ে থাকে অস্ট্রেলিয়ায়।
মাঝে মাঝে যখন খুব বেশি একা লাগে, আমি রান্নাঘরে গিয়ে হাতা-খুন্তি নাড়াচাড়া করি। যেন মনে হয় কেউ একজন ডাইনিং টেবিল থেকে ডাক দিয়ে বলবে, "মা, খিদে পেয়েছে, খাবার দাও।" কিন্তু বাস্তব হলো, আমি এখন শুধু নিজের জন্য এক মুঠো চাল সেদ্ধ করি। মাঝেমধ্যে ফ্রিজ থেকে কালকের তরকারিটা গরম করার সময় ভাবি—কার জন্য এত যত্ন করে রান্না শিখলাম?
গত মাসে আমার শরীরটা একটু খারাপ হলো। মাথা ঘুরে বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলাম। ভাগ্য ভালো যে হাতে চোট লেগেছে শুধু। ছেলেকে ফোন করে বললাম, "বাবা, আমার তো বয়স হচ্ছে, একা থাকতে ভয় লাগে। তুই কি একটু আসবি?"
সে ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "মা, তুমি তো জানো সামনে আমার প্রজেক্ট সাবমিশন। আর বাচ্চার স্কুল শুরু হয়েছে। ড্রাইভারকে বলছি, সে তোমাকে ডাক্তার দেখিয়ে আনবে। আর ওষুধ তো অনলাইনেই অর্ডার দেওয়া যায়।"
আমি ফোনটা রেখে দিলাম। ওষুধ তো কেনা যায়, কিন্তু অসুস্থ শরীরে একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়াটা কি কোনো অ্যাপে অর্ডার দেওয়া যায়?
আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট হয় আমার নাতনির কথা ভাবলে। ও যখন ছোট ছিল, আমি রাত জেগে ওকে দোল দোল দিতাম। এখন ও ভিডিও কলে কথা বললে ফোনের স্ক্রিনটা বারবার হাত দিয়ে ছোঁয়, কিন্তু আমাকে ছুঁতে পারে না। ও বলে, "দাদিমা, তুমি আমাদের বাড়িতে আসো না কেন?" আমি উত্তর দিতে পারি না। কারণ ওর মা অর্থাৎ আমার ছেলের বউ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে—একা ঘরে ও বড় হয়েছে, বয়স্ক মানুষের "খিটখিটে স্বভাব" নাকি ওর বাচ্চার ওপর প্রভাব ফেলবে।
আমি কি সত্যিই খিটখিটে? আমি তো শুধু চেয়েছিলাম ওদের সাথে একটু গল্প করতে। আমি তো শুধু বলতে চেয়েছিলাম যে রাতের বেলা একাকীত্বের ভয়টা আমাকে গিলে খাচ্ছে।
প্রতিদিন সকালে আমি বেলকনিতে গিয়ে বসি। নিচের রাস্তায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুল ভ্যানে ওঠে। আমি হাত নাড়ি, ওরা হয়তো খেয়ালও করে না। তবুও আমি নাড়ি। মনে হয়, কেউ অন্তত আমাকে দেখছে।
মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে কারো সাথে একটু ঝগড়া করি, বা কাউকে একটু শাসন করি। কিন্তু বাসায় কথা বলার মতো আছে শুধু ওই দেয়াল ঘড়িটা। টিভিটা সারাদিন চালিয়ে রাখি, কারণ মানুষের কণ্ঠস্বর না শুনলে মনে হয় আমি একাই এই পৃথিবীতে বেঁচে আছি।
মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাদা চুলগুলো দেখি। মনে হয়, এই চুলগুলো তো শুধু বয়সের কারণে সাদা হয়নি, প্রতিটি চুলে লেখা আছে কত কত রাত একা জেগে কাটানোর ইতিহাস। আমি তো আমার সন্তানদের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলাম। আজ আমার হাতে সময় আছে, কিন্তু ওদের হাতে আমার জন্য দেওয়ার মতো পাঁচটা মিনিটও নেই।
আমি সহানুভূতি চাই না। আমি শুধু একটা স্পর্শ চাই। একটা ডাক শুনতে চাই—যে ডাকটা যান্ত্রিক হবে না।
আপনারা যারা এই লেখাটি পড়ছেন, আপনাদের ঘরে বা পাশের ঘরে যদি এমন কোনো সুফিয়া বেগম থাকে, তাকে শুধু জিজ্ঞেস করবেন, "কেমন আছেন?" দেখবেন তার চোখ দুটো জ্বলে উঠবে। কারণ বয়স্কদের জন্য কথা বলতে পারার চেয়ে বড় কোনো ওষুধ আর নেই।
সময় থাকতে ভালোবাসুন। কারণ ক্যালেন্ডারের পাতা ওড়ে, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানুষ আর ফিরে আসে না।
শেয়ার করবেন
নিঃসঙ্গ আমি
Farhana Yasmin ✍️
#মানবতা