07/11/2022
কেমন স্বামী ছিলেন আমার পিতা?
দাম্পত্য কলহ একটি অতি সাধারন ব্যাপার। ঝগড়া করেনি এমন দম্পতি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অথচ এই অসম্ভব ব্যাপারটিই লক্ষ্য করলাম আমার বাবা-মায়ের মধ্যে। প্রায় ৬৩ বছরের দাম্পত্য জীবন ছিল তাঁদের। ভাইদের মধ্যে আমি আমার বাবা-মাকে সবচেয়ে বেশী কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছি। আমি দ্বিধাহীনভাবে বলতে পারি যে আমি একদিনও আমার বাবা-মাকে ঝগড়া করতে দেখিনি। এটা সম্ভব হয়েছে তাঁদের দুজনের মধ্যে গভীর ভালবাসা, ত্যাগের মনোভাব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ, এবং ক্রোধ নিবারনের মতো অসাধারন গুনের কারনে। তবে তাই বলে তাঁদের দাম্পত্য জীবন রসকষহীন ছিল তা কিন্তু নয়। আব্বা মাঝে মাঝে আম্মাকে খোঁচা দিতেন, আর আম্মাও কম যেতেন না। সমান তালে তিনিও জবাব দিতেন। তবে কোনদিন আমি তাঁদের কাউকে একে অপরকে অপমানসূচক কথা বলতে শুনিনি।
আমার আম্মা অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত মুসলীম পরিবার থেকে এসেছেন। বিয়ের আগে তিনি ফাযেল পর্যন্ত পড়েছিলেন, তবে বিয়ের পর আমাদের বিরাট পরিবারের দায়িত্ব নেয়ার পর আর পড়াশুনা করতে পারেন নি। এই নিয়ে আমার বাবা সারাজীবন আফসোস করেছেন যে কেন তাঁকে আর পড়ালেন না। অনেক মানুষের মধ্যেই স্ত্রীর পড়াশুনা কম থাকলে তাকে খাটো করে দেখার একটা প্রবনতা থাকে। নিজে স্ত্রীকে সম্মান না দেয়ায় সন্তানরাও মাকে সম্মান করেনা। অথচ আব্বাকে দেখেছি সম্পূর্ণ উল্টো। আম্মার প্রাপ্য সম্মানতো দিতেনই, এর পাশাপাশি ছোট বড় সব বিষয়ে আম্মার সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতেন। আমাদেরকে তিনি শিখিয়েছেন মায়ের মর্যাদা কি এবং ছোট সময় কখনও যদি আম্মার সাথে একটু বিরক্ত হয়ে কথা বলেছি, তবে তিনি কঠোরভাবে তিরস্কার করতেন। আম্মার সাথে বেয়াদবী করে পার পেয়ে যাবার কোন উপায় ছিলনা। শুধু তাই নয়, আমাদের কোন দাবির ব্যাপারে আম্মা রাজী না থাকলে তিনি নিজে রাজী হলেও আম্মাকে উপেক্ষা করে আমাদের অনুমতি দিতেন না।
আব্বা সবসময় বলতেন, “আমি আমার স্ত্রী ও ছেলেদের বাসায় লজিং থাকি। ছেলেরা টাকা দেয় আর আমার স্ত্রী সংসার চালায়। এখানে আমার অবদান তেমন নেই”। আমার মায়ের ত্যাগের কারনেই আব্বা দিনরাত সংগঠন ও লেখালেখি চালিয়ে যেতে পেরেছেন। আব্বা সবসময় এ জন্য আম্মার নিকট কৃতজ্ঞ ছিলেন। খাওয়া দাওয়া নিয়ে অনেক পুরুষ মানুষ স্ত্রীর সাথে রাগারাগি করে থাকেন। আব্বাকে সেরকম রাগ করতে কোনদিন দেখিনি। আম্মা যথাসম্ভব চেষ্টা করতেন আব্বার পছন্দের খাবার রেডী রাখতে। খাবারে কখনও লবন কম হলে মজা করে বলতেন, “লবন কম হয়েছে বলতে চাইনা, কারন এরপর না আবার লবন বেশী হয়ে যায়”। আবার লবন বেশী হলে খুঁজতেন কোন খাবারে লবন কম হয়েছে, তারপর বলতেন, “ও, এ দুটা খাবার একসাথে খাওয়ার ব্যাবস্থা করা হয়েছে”। হাস্যরসের মাধ্যমে এসব বলতেন – কখনও কাউকে অপমান করে এসব বলতেন না। খাবার মজা হওয়া না হওয়া নিয়ে তিনি এমন চমৎকার কথা শিখিয়েছেন যে আমি এটা সবসময় পালন করার চেষ্টা করি। তিনি বলতেন, “হাদিসে আছে, খাবার মজা হলে তা পাচককে জানানো উচিৎ যাতে সে খুশি হয়, কিন্তু মজা না হলে চুপ থাকা উচিৎ। যে কষ্ট করে রান্না করেছে তাকে মজা হয়নি এ কথা বলে ব্যাথা দিতে রাসুল (সঃ) নিষেধ করেছেন”।
আম্মার সাথে আমার বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। দেশে যতদিন ছিলাম, প্রতিদিন মাগরিবের নামাজের পর আম্মার সাথে আড্ডা দিতাম অনেকক্ষণ। আম্মা মন খুলে আমাকে অনেক কিছু বলতেন। কিন্তু একদিনের জন্যও উনি কখনও আব্বা সম্পর্কে কোন কটু কথা বলেননি। আব্বা কোনদিন আম্মাকে কষ্ট দিয়েছেন, তা কখনও শুনিনি।
আব্বা সবসময় বলতেন, ছোটবেলায় মা/বাবা হারালে সন্তান এতিম হয় আর বুড়ো বয়সে স্ত্রী হারালে সে এতিম হয়ে যায়। আমার দু চাচা স্ত্রী আগে হারিয়েছেন এবং তাঁদের কষ্ট আব্বা দেখেছেন। আব্বা সবসময় দোয়া করতেন যেন আম্মাকে আল্লাহ তাঁর আগে উঠিয়ে না নেন। আমাদেরকেও সে দোয়া করতে বলতেন। তিনি বলতেন, “তোমার আম্মা ছাড়া আমি থাকতে পারব না”। যদিও শেষের তিনটি বছর এক সাথে থাকতে পারেন নি, কিন্তু প্রতি দু সপ্তাহে একবার তাঁদের দেখা হত। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেছেন। আব্বার ইন্তেকালের প্রায় ৫ বছর পর আম্মা আমাদের ছেড়ে চলে যান।
আল্লাহ্ দুজনকে জান্নাতে একত্রিত করুন!
- সালমান আল আযমী