22/05/2026
আমার ছোট বোন আমার হবু স্বামীকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল… তারপর পুরো বিশ বছর কোনো খোঁজ ছিল না।
আর আজ… তার ছেলেটা হঠাৎ আমার বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়ালো।
কারণ পৃথিবীতে যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা তার নেই।
ছেলেটা গেটের সামনে এমনভাবে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন খুব ছোটবেলাতেই শিখে গেছে— কেউ তাকে ভালোবেসে বুকে টেনে নেয় না।
একদম শুকনো গড়ন।
গায়ে ঢোলা একটা পুরোনো জ্যাকেট, কাঁধ থেকে ঝুলে পড়ছে।
এক হাতে ছোট্ট একটা ট্রাভেল ব্যাগ।
আমি তখন রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ডাল বসাচ্ছিলাম। জানালার ফাঁক দিয়ে তাকাতেই বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল।
ছেলেটার বয়স তেরো-চৌদ্দ হবে।
এখনো পুরোপুরি বড় হয়নি।
তবু মুখের ভেতর এমন এক ক্লান্তি… যেটা এই বয়সের কোনো ছেলের চোখে মানায় না।
চিঠিটা এসেছিল দশদিন আগে।
ময়মনসিংহ থেকে এক মহিলা পাঠিয়েছিল।
লিখেছিল, সে আমার বোন “ঊর্মি”-র পাশের বাসার মানুষ ছিল।
চিঠিতে লেখা ছিল—
“আপা, খুব দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, ঊর্মি আপা নিউমোনিয়ায় মারা গেছেন। তার ছেলে আরিব এখন একদম একা। তিন বছর আগে ওর বাবাও সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আত্মীয় বলতে এখন শুধু আপনি আছেন।”
শুধু আমি।
চিঠিটা চারভাঁজ করে আলমারির ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলাম।
পুরোনো বিদ্যুৎ বিল, বাবার রিপোর্ট আর না-ছোঁয়া কিছু কাগজের নিচে।
দুই দিন আমি কোনো উত্তর দিইনি।
তৃতীয় দিন শুধু দুইটা শব্দ লিখে পাঠিয়েছিলাম—
“পাঠিয়ে দিন।”
আর কী-ই বা বলতাম?
যে আমি বিশ বছর আমার বোনের মুখ দেখিনি?
যে তার নামটা পড়লেও আজও বুকের ভেতর পুরোনো ক্ষতটা ধকধক করে ওঠে?
কিছু ব্যথা পুরোনো হয়ে যায়…
কিন্তু কখনো শেষ হয় না।
তবু ছেলেটার তো কোনো দোষ নেই।
আমি হাত মুছে বাইরে বের হলাম।
আরিবকে দেখেই বুঝলাম—
ও ঊর্মির ছেলে।
একদম সেই একই ঠোঁট।
একই রকম জেদি মুখ।
একইভাবে নিচু চোখে তাকানো… যেন আগে থেকেই ধরে নিয়েছে, দরজাটা তার মুখের ওপর বন্ধ হয়ে যাবে।
শুধু চোখ দুটো আলাদা।
হালকা ধূসর।
স্বচ্ছ।
হয়তো বাবার কাছ থেকে পাওয়া।
সে আস্তে বলল,
— আসসালামু আলাইকুম… আমি আরিব… ঊর্মির ছেলে।
কাঁধ থেকে ব্যাগটা পড়ে যাচ্ছিল, তাড়াতাড়ি ধরে ফেলল।
মনে হচ্ছিল নিজের অস্বস্তিটা লুকাতে চাইছে।
আমি শুকনো গলায় বললাম,
— আমি জানি তুমি কে। ভেতরে আসো।
ঘরে ঢুকেই সে জুতো খুলে দরজার পাশে সুন্দর করে রেখে দিল।
তার মোজার গোড়ালির দিকটা সেলাই করা।
বাঁকা সেলাই… কিন্তু খুব যত্ন নিয়ে করা।
আমি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
ও কি নিজেই সেলাই করেছে?
নাকি ঊর্মি মারা যাওয়ার আগে করে দিয়েছিল?
হঠাৎ বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
আমি দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে বললাম,
— ভাত-ডাল আছে। খাবে?
ছেলেটা মাথা নিচু করে বলল,
— জি… কষ্ট না হলে।
সে খুব ধীরে ধীরে খাচ্ছিল।
এমনভাবে… যেন প্রতিটা লোকমা খাওয়ার আগে অনুমতি নিতে হয়।
না কোনো শব্দ।
না কোনো আবদার।
না দ্বিতীয়বার চাওয়া।
অদ্ভুতভাবে ব্যাপারটা আমাকে কষ্ট দিল।
হয়তো আমি চেয়েছিলাম সে একটু অভদ্র হোক।
একটু রাগী হোক।
তাহলে তাকে দূরে ঠেলে রাখা সহজ হতো।
কিন্তু সে শুধু চুপচাপ খাচ্ছিল আর মাঝেমধ্যে “ধন্যবাদ” বলছিল।
প্রথম কয়েকদিন আমাদের তেমন কথা হয়নি।
আমি ভোরের আগেই বের হয়ে যেতাম।
বাড়ির পাশেই ছোট্ট গরুর খামার ছিল।
সেই খামার নিয়েই আমার জীবন কেটে গেছে।
গরু দুধ দেওয়া বন্ধ করে না কারো কষ্টে।
সংসারের খরচও কারো দুঃখ বুঝে থেমে থাকে না।
বিকেলে ফিরে এসে দেখতাম আরিব কোনো না কোনো কাজ করছে।
কখনো উঠানের শুকনো পাতা পরিষ্কার করছে।
কখনো বাঁশের বেড়ার আলগা অংশ বেঁধে দিচ্ছে।
কখনো টিউবওয়েল থেকে পানি তুলে ড্রামে ভরছে।
কেউ তাকে এসব করতে বলেনি।
সে শুধু চারপাশে তাকিয়ে বুঝে নিত কোথায় কী দরকার… তারপর চুপচাপ করে ফেলত।
ব্যাপারটা আমাকে অবাক করত।
আর অদ্ভুতভাবে অস্বস্তিও দিত।
কারণ মনে হতো—
ছেলেটা যেন না বলেই বলছে,
“দেখুন… আমি ঝামেলা হব না। শুধু আমাকে তাড়িয়ে দেবেন না।”
একদিন দূর থেকে দেখলাম সে ভারী পানির বালতি টানছে।
দড়ি ঘষে তার হাতের চামড়া উঠে গেছে।
পাতলা হাত।
নরম হাত।
এই হাত মাঠে-ঘাটে বড় হয়নি।
হঠাৎ আমার মাথায় একটা কথাই ঘুরতে লাগল—
এই ছেলেটা একবারও অভিযোগ করেনি।
না আমার নীরবতা নিয়ে।
না এই বাড়ির অচেনা পরিবেশ নিয়ে।
না নিজের একা হয়ে যাওয়া নিয়ে।
তেরো বছরের একটা ছেলে…
যে হঠাৎ একদিন এমন এক খালার বাড়িতে এসে উঠেছে, যে খালা তাকে আদৌ চায় কিনা সেটাও জানে না।
আমি দ্রুত ঘরে ঢুকে পড়লাম।
কারণ বুঝতে পারছিলাম, আর একটু দাঁড়ালে কেঁদে ফেলব।
সবার আগে খবর নিতে এলো পাশের বাড়ির মর্জিনা বেগম।
মহিলার স্বভাবই এমন—
“তোর ভালোর জন্য বলছি” বলে মানুষের বুকের ভেতর ছুরি ঢুকিয়ে দেয়।
গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে বলল,
— শুনলাম ঊর্মির পোলা আইছে?
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম,
— জি।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— এতকিছুর পরও তুই ওই মাইয়ার ছেলেকে রাখবি? যা করছে তোর সাথে…
আমার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
— কিছু লাগবে খালা?
— আরে রাগ করিস ক্যান? তোর চিন্তায় কইতেছি। এই বয়সে একটা কিশোর ছেলেকে সামলানো সহজ না। তার ওপর অন্যের সন্তান…
আমি কথার মাঝখানেই থামিয়ে দিলাম।
— খালা, আপনি বাসায় যান।
তিনি মুখ গোমড়া করে চলে গেলেন।
কিন্তু আমি জানতাম, এটাই শেষ না।
ছোট শহরে খবর বাতাসের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়।
“যা করছে তোর সাথে…”
কথাটা মাথার ভেতর বারবার বাজছিল।
আমি আর ঊর্মি ছোটবেলায় এক বিছানায় ঘুমাতাম।
ওর চুল আমি বেঁধে দিতাম।
স্কুলে কেউ ওকে বিরক্ত করলে আমি ঝগড়া করতাম।
শীতের রাতে সে ঠান্ডা পা আমার গায়ে লাগিয়ে বলত,
— আপা, ঘুমায়ো না… গল্প করো।
তারপর আমরা বড় হলাম।
ঊর্মি সুন্দর হয়ে উঠল।
অতিরিক্ত সুন্দর।
যে ছেলেরা আগে ওকে নিয়ে হাসত, তারাই পরে ওর পেছনে ঘুরত।
তাদের মধ্যেই একজন ছিল—
শায়ান।
আমার হবু স্বামী।
আমাদের বিয়ে ঠিক হয়েছিল কার্তিক মাসে।
মা নিজের বিয়ের শাড়ি কেটে আমার জন্য নতুন শাড়ি বানিয়েছিলেন।
বাবা গ্রামের মানুষজনকে দাওয়াত দেওয়ার তালিকা করছিলেন।
সবাই জানত আমাদের বিয়ের কথা।
তারপর ঊর্মি শহর থেকে বেড়াতে এলো।
এক সপ্তাহ পর আমি শায়ানকে খুঁজতে গিয়ে দেখলাম…
সে ঊর্মির হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
শায়ানের গ্যারেজের ভেতর।
আর ঊর্মি হাসছে।
সেই পরিচিত সুন্দর হাসি…
যেটা দেখলে মানুষ সব ভুলে যেত।
আমি কোনো চিৎকার করিনি।
কোনো প্রশ্নও করিনি।
হাতে থাকা বাজারের ব্যাগটা মাটিতে পড়ে গিয়েছিল শুধু।
তারপর আমি হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছিলাম।
দুই দিন পর ঊর্মি একটা চিঠি রেখে চলে যায়।
“আপা, আমি দুঃখিত… কিন্তু নিজেকে আটকাতে পারিনি।”
তারপর সে শায়ানকে নিয়ে পালিয়ে যায়।
মা সেই কষ্টে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
বাবা আমার সঙ্গে কথা বলা কমিয়ে দেন… যেন দোষটা আমার ছিল।
আর আমি থেকে যাই।
এই বাড়িতে।
এই খামারে।
এই অপমানে।
আমার বিয়ের শাড়িটা আমি নিজ হাতে পুড়িয়ে ফেলেছিলাম।
আর ঊর্মির পাঠানো পনেরোটা চিঠি… কখনো খুলেও দেখিনি।
আরিব এসবের কিছুই জানত না।
মাঝেমধ্যে সে তার মায়ের কথা বলত খুব সাবধানে।
যেন নামটা উচ্চারণ করলেই কিছু ভেঙে যাবে।
একদিন খেতে খেতে বলল,
— আম্মু ডালটা পাতলা করে রান্না করত… আপনারটা একটু ঘন।
আমি কোনো উত্তর দিইনি।
কারণ কথাটা অদ্ভুতভাবে বুকের ভেতর বিঁধেছিল।
আমার কাছে ঊর্মি ছিল বিশ্বাসঘাতকতা।
কিন্তু তার কাছে?
সে শুধু তার মা।
যে মা মোজা সেলাই করত…
ডাল রান্না করত…
আর বর্ষার এক ভেজা সকালে মারা গেছে।
তৃতীয় সপ্তাহে ঘটনাটা ঘটল।
আমি খামার থেকে ফিরছিলাম।
বাজারের সামনে ভিড় দেখে দাঁড়ালাম।
মাঝখানে আরিব দাঁড়িয়ে।
চুপচাপ।
এক হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে আছে।
আর সামনে কসাইয়ের ছেলে রুবেল।
বয়সে বড়, স্বভাবে খারাপ।
সে জোরে জোরে বলছিল,
— তোর মা তো নিজের বোনের হবু স্বামী নিয়া পালাইছিল, না? খারাপ রক্ত তোদের শরীরেই আছে!
চারপাশের সবাই চুপ।
কেউ থামায়নি তাকে।
আরিব মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।
কোনো জবাব দেয়নি।
কিন্তু আমি স্পষ্ট দেখলাম…
তার চোখ বেয়ে একটা পানি গড়িয়ে পড়ল।
আর ঠিক তখন…
আমার ভেতরে বহু বছর আগে মরে যাওয়া একটা জিনিস আবার নড়ে উঠল।
কারণ এই ছেলেটা তার মায়ের পাপের শাস্তি পাচ্ছে।
যে পাপ সে করেনি।
সেই মুহূর্তে আমি একটা জিনিস বুঝলাম।
আমি হয়তো কোনোদিন ঊর্মিকে ক্ষমা করতে পারব না।
হয়তো তার চিঠিগুলো খুলেও দেখতে চাইব না।
কিন্তু পৃথিবীকে আমি কখনোই তার ছেলেটাকে ধ্বংস করতে দেব না।
আর সেদিন রাতেই…
বিশ বছর পর প্রথমবারের মতো আমি আলমারির ভেতর থেকে ঊর্মির পুরোনো চিঠিগুলো বের করলাম।
কারণ হঠাৎ মনে হচ্ছিল—
হয়তো আমি পুরো সত্যিটাই কোনোদিন জানতাম না…
চলবে…
নেক্সট পর্বের জন্য লাইক, কমেন্ট করুন যারা ফলো দেন নাই তারা ফলো দেন বাকি গুলোর মত এটাও আজকের মধ্যে সবগুলো পর্ব পাবেন ।