17/09/2022
রাত্রির ভিন্নতা
আজকের রাত টা আট দশটা রাতের মতো নয়। এই রাতকে ঘিরে প্রতিটা ছেলে-মেয়েদের নানা রকম ভাবনা জরিয়ে থাকে। থাকে অনেক প্লান । রুমের চারপাশে নানান রকমের ফুল দিয়ে সাজানো ।
এতো ফুল তা কল্পনাতিত। কল্পনাতেও এতো সৌন্দর্য ফুটে উঠে নি। বিছানায় চাদর দেখা যাচ্ছে না, মেঝেতে কি রংয়ের টাইলস বোঝা যাচ্ছে না । ফুলের বিছানায় বসে আছি অয়নের অপেক্ষায়। ফুলের সমারোহ দেখে বোঝা যায় অয়ন আমাকে কতটা ভালবেসে ফেলেছে । জানিনা আজ আমার ভাগ্যে কি আছে?কি ভাবে রিএক্ট করবে অয়ন, আমার অতীত জেনে।
যদি এখানে জায়গা না হয়,অন্য কোথাও যেতে হবে, বাবার বাড়ি ফিরে যাওয়া অসম্ভব। সবাই জেনে যাবার পর হয়তো ,আমাকে কেউ স্বাভাবিক ভাবে নেবে না । রবি আর আমার সম্পর্কটা অবৈধ ছিল না।
১৪ ফেব্রুয়ারি । দিনটা অন্যরকম ছিল আমাদের জন্য । আগে থেকেই ঠিক করা ছিল ওই দিন টা আমরা একসাথে কাটাবো ।
রাতটা কাটতে দেড়ি,উঠতে দেড়ি না। সারারাত ঘুম আসছিল না,রবির সাথে দেখা হবে দুই মাস পর,রবি চাকরির সুবাদে চিটাগাং থাকে।ওর বাবা মা ঢাকায়। ওদের মিরপুরে নিজেদের বাড়ি। সকালে বাড়িতে চলে এসেছে।
সকাল নয়টা। দাঁড়িয়ে আছি নিউমার্কেট দুই নাম্বার গেঁটে। অপেক্ষা,, ,,
দশটা ,, ,, ,, এগারোটা,, ,, ,,বারোটা,, ,, ,,
ফোন টা বেজেই যাচ্ছে , রিসিভ করছে না অয়ন ।
চুলের খোঁপায় গোঁজা বেলী ফুলের মালা লালচে হয়ে গেছে। রোদের তাপে মুখটা কালচে হয়ে গেছে।রবির দেখা নেই। রাস্তায় এভাবে দাড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছে না। ভার্সিটি চলে এলাম। দুইটা ক্লাস মিস হয়ে গেছে,একটার ক্লাসটা করার জন্য।
মাথার বেলী ফুলের মালা খুলে ফেললাম। চোঁখের কাজলে, কালো হয়ে গেছে চোখ দুটো। ভালোবাসা বড় কাঁদায়,ক্লাসে মন দিতে পারছি না।কি হল? এলো না কেন? তবে কি ওর মা?
রবির মা আমাকে পছন্দ করেন না, আমার কাছ থেকে দূরে সরাতে চাইছে।হয়তো তাই আমার কাছে আসতে দেয়নি। রবির সাথে রাতেও কথা হয়েছিল,বলল সকালে ঘুমাবে না বেশি ,চলে আসবে আমার কাছে।কি হল।ক্লাস শেষ। বাসায় কি চলে যাবো?চলেই যাই।
বাস কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আছি।বাসের অপেক্ষায়। হঠাৎ মনে হলো,কে যেন আমার হাতটা ধরে দাঁড়াল।পাশে তাকাতেই দেখি রবি দাঁড়িয়ে, একটুও রাগ করতে পারিনি,এক ঝলক হাসতেই মনে হল হাসছি কেন আমার তো রাগ করার কথা ।পরোক্ষনেই রাগ রাগ ভাব নিলাম।
রবি :রাগলে তোমাকে ভাল লাগে, কিন্তু তুমি রাগ করে থাকতে পারো না।তাই কষ্ট করে রাগ করো না।
আনিকা:তাই বুঝি। আজ সত্যি আমার অনেক কষ্ট হচ্ছিলো।এমন কেন করলে? বলেই চোখের পানি ঝড়তে শুরু করে।
রবি: কি করব বল , মা আমাকে আসতে নিষেধ করেছিল, অনেক বুঝিয়ে তোমার কাছে এলাম। ঘুমাতেও পারিনি।
আনিকা : এভাবে বুঝিয়ে কি হবে ? তার থেকে একটা কাজ কর , তুমি তোমার মায়ের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে কর । বুঝানোর ঝামেলা থাকবে না।
রবি : অভিমান হচ্ছে?
আনিকা : অভিমান ? না । আমি যখন একা একা তোমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলাম তখন , কেন জানিনা , মনে হচ্ছিল তোমার মা হয়তো তোমাকে বাঁধ সাধলো।বিয়ে তো শুধু তুমি আর আমিতে নয়,
বিয়েটা দুই পরিবারে।তবে কেন শুধু শুধু আমার কারণে এতো গুলো মানুষ কে কষ্ট দেয়া।তার চেয়ে চল নিজেদেরকে আলাদা করে ফেলি ।
রবি বলে উঠল বিরক্তস্বরে,আনিকা জার্ণিটা তোমার আমার । বিয়ের আগেই এরা এদের কর্তিত্ব ফলাবে এরপর কেউ আমাদের খোঁজ ও নেবে না। তবে কেন এদের লোক দেখানো ভালোবাসায় আমার ভালবাসাকে হারাবো।আমি রাতের ট্রেনে চলে যাবো। তুমি কি এভাবেই মুখ গোমড়া করে থাকবে?
আনিকা কোন কিছু না ভেবেই,বলে উঠল,আমাকে আজ এই মূহুর্তে বিয়ে করবে ? হ্যা অথবা না ।
রবি : পরীক্ষা নিচ্ছো ? কেমন ভালোবাসি?
আনিকা: আমি জানিনা । শুধু তোমাকে চাই। তোমার আমার মাঝখানে কাউকে সহ্য করব না। মায়ের অধিকার অনেক ,সেই অধিকার দিয়ে যদি তোমাকে আমার কাছ থেকে আলাদা করে?
রবি : চল,চল আমার সাথে ।
আনিকা: কোথায়?
রবি : সুখের ঠিকানায়।
সেদিন আমাকে রবি নিজের হাতে সাজিয়ে দিল ,বধুবেশে । ওর টিকলি খুব পছন্দের ছিল ,একটা ছোট গলার সোনার হার, আর টিকলি ,পরনে লাল বেনারসি।
কাজী অফিসে বিয়ে হল ।বিয়ের পর রবির বন্ধু লিমন ভাই ,আর তার গার্লফ্রেন্ড আমরা একসাথে খেলাম।
সন্ধ্যা নামছে ।রবিকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না।রবি বাসায় দিয়ে আসতে চাইল।
বললাম যাবো না।
আনিকা পাগলামি করছ কেন ? রাত দশটা য় ট্রেন । আমার যেতে হবে।
ফোন বাজছে আনিকার ,মা কল করেছে ।
-হ্যালো মা বল।
- আনিকা তোমার দাদু খুব অসুস্থ ।আমরা বাড়ীতে যাচ্ছি। তুমি বাসায় চলে এসো ।বাসা খালি ।চাবি নিচের কাকাবাবু র কাছে দিয়ে যাচ্ছি ।
- ঠিক আছে।
সেদিন প্রথম রবিকে নিয়ে বাসায় যাই। তারপর,,,, ,,,,,, ,,,,
অয়ন এলো ঘরে ।
অয়ন: কেমন হয়েছে সাজানো? পছন্দ হয়েছে?
-হুম হয়েছে।
- তোমার কি কোন কারণে মন খারাপ ?
- না ,এমনি।
- আমার কি কোথাও কোনো কমতি আছে,যা নিয়ে তুমি চিন্তিত ?
- না না। কোথাও কোন কমতি নেই,বরং তার চেয়ে বেশি আছে।
- তাহলে কেন মন খারাপ ?
- আজ আমি কিছু বলব , অনেক আগেই বলতে চেয়েছি ,বলা হয়ে ওঠে নি। আমি জানিনা কেন আপনি আমাকে এতোটা ভালবেসেছেন , জানিনা কিভাবে এতো দ্রুত বিয়ের আয়োজন করেছেন।
অয়ন , আপনি আমার আর রবির সম্পর্কটা ও জানেন,এবং তা মেনেও নিয়েছেন ।এ আমার ভাগ্য । বলা চলে সৌভাগ্য।
অয়ন , আনিকা কে থামিয়ে দিয়ে বলল ,কেন আজ রাত টা পুরোনো কথা দিয়ে সাজাচ্ছো ? সামনের দিকে এগিয়ে যাই ।নতুন কিছু ভাবি নতুন করে।
আনিকা বলল, নতুন যদি পুরাতন কে ভুলে শুরু করা যেত তবে অনেক ভালো হতো । কিন্তু এ নতুনের সাথে পুরাতনটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে, কিভাবে এগিয়ে যাব ?
আজ আমাকে বলতে দিন।
অয়ন বলল, তুমি যাই বলো আর যাই ভাবো আমাকে ছেড়ে যাবার কথা ভুলেও মনে করো না। কেন জানিনা তোমাকে ছাড়া নিজেকে ভাবতে পাড়ছি না এখন।
- অয়ন আপনাকে কষ্ট দেয়ার ইচ্ছা আমার নেই , এমনি ভাবে রবি ও আমাকে ভালোবাসত ,,,,,
দির্ঘশ্বাষ ছেড়ে আনিকা বলতে লাগে ,বড় ভয় হয় একজনকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি আপনাকেও,,,,, ,,,,,
অয়ন যে কথাটা বলতে চাইছি ,সেটা বলেই ফেলি ,,,
অয়ন আমি রবির সন্তানের মা হতে চলেছি ।এ কথাটা কেউ জানেনা শুধু আমি জানি এখন আপনি জানলেন।
অয়ন বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলল কি! কি বলছ এসব! অবৈধ সন্তান!
- না না না অয়ন , আমরা বিয়ে করেছিলাম । ১৪ ফেব্রুয়ারি। সেদিন হঠাৎ করে ই আমরা বিয়ে করি , সাক্ষীও আছে। সে দিন তিনটা থেকে রাত নয়টা আমরা একসাথে কাটিয়েছিলাম । সেই সন্ধ্যা রাতটা ছিল শুধু রবি আর আ্মার ।
সেদিন রাত ১০ টার ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে রবি চলে গেল। চলে গেল চিরতরে। রবির শোকটা কাটানোর জন্য বাবা-মা আমার বিয়ের চিন্তা করে । এমনি সময় আপনার আগমন আমার জীবনে।
অয়ন আমাকে ভুল বুঝবেন না প্লিজ ? আমি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন আমি জানিনা আমার কি করনীয়? তবে আপনি আমাকে যা বলবেন আমি তাই করব শুধু বেবিকে মিসক্যারেজ করতে বলবেন না।
চলে যেতে বললে এখনই চলে,,,,,,,
- কোথায় যাবে ? গম্ভীর গলায় বলল অয়ন।
- জানিনা ।বাবা - মায়ের কাছে যাবো না । আমি জানি, আমাকে মানতে অনেক কষ্ট হবে তাদের। কিছু করার নেই। আর আপনাকে মানতে বলছি না আমাকে । জীবনের এই সংকটাপন্ন অবস্থায় আমি নিজেই জানিনা আমার কি করণীয় । আমাদের হলুদের দিন রাতে আমি বুঝতে পারি।এরপর অনেক বার বলার চেষ্টা করি আপনাকে ,বলে উঠতে পারিনি ।আমাকে পারলে ক্ষমা করে দিবেন। অয়ন কিছু বলেন ?
অয়ন চুপ।
অয়ন আমাকে মেনে নেয়ার জন্য আমি আপনাকে জোর করবনা । কিন্তু কিছু তো বলেন ?
অয়ন চুপ।
আমি বুঝতে তে পেরেছি । ঠিক আছে ,ভাল থাকেন ।আমি চলে যাচ্ছি । কারো কষ্টের কারণ হতে চাই না ।
অয়ন বসে আছে খাটের এক কোণে , নির্বিকার ।কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না ।
আনিকা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিল। নিথর দেহে , অয়নের দিকে তাকানোর সাহস টুকু নেই আস্তে আস্তে দরজার কাছে দাঁড়ালো। দরজার লক খুলতে ই আনিকার হাত চেপে ধরে অয়ন ।
-আনিকা , আমি জানিনা আমার কি করণীয়? আমি জানিনা কি করা উচিত আমার? তবে এই রাত শুধু তোমার আমার । এ রাত মৃত কোন ব্যক্তির জন্য নষ্ট হয়ে যাক ,সেটা আমি সহ্য করতে পারব না।।।।।