12/07/2023
চামড়ার মূল্য কম, কিন্তু জুতার মূল্য বেশী কেন?
নিম্নের বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা পড়লে বুঝতে পারবেন।
অনেকে আক্ষেপ করে প্রশ্ন করেন যে চামড়ার দাম অনেক কম, কিন্তু লেদারের জুতার দাম এত বেশী কেন? আবার জবাবটাও প্রশ্নকারীরাই দিয়ে দিয়ে থাকেন - এটা হচ্ছে চামড়া ব্যবসায়ী বা ট্যানারী মালিকদের কারসাজি বা সিন্ডিকেটের ফসল।
প্রথমেই বলে রাখি, কাঁচা চামড়া ব্যাবসায়ী, ট্যানারী মালিক এবং জুতা প্রস্তুতকারক পেষাগতভাবে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ী।
যিনি কাঁচা চামড়ার ব্যবসা করেন তিনি ট্যানারী ব্যবসা করেন না। যিনি ট্যানারী ব্যবসা করেন তিনি জুতা উৎপাদন করেন না। আবার কাঁচা চামড়া সারা দেশের গ্রাম/হাট/বাজার থেকে সংগ্রহ করে ট্যানারী পর্যন্ত পৌঁছাতে ২/৩ বার হাত বদল হয়। যিনি প্রথম সংগ্রহ করেন তিনি লবন প্রয়োগ করেন । প্রত্যেক বদলের সময় বিক্রেতার বিনিয়োগের সাথে ট্রান্সপোর্ট খরচ ও কিছু মুনাফা যোগ হয়। কাজেই চামড়াটি প্রথম ক্রেতা যে দামে সংগ্রহ করেন সেটি ট্যানারী পর্যন্ত পৌঁছাতে তার মূল্য দ্বিগুন বা আরও বেশী হয়ে যায়।
চামড়া ব্যবসায় ঝুঁকি প্রচুর। পশুর দীবদ্দশায় তার রোগ ব্যাধি, হাল চাষ ও নানা প্রাকৃতিক কারনে চামড়ার গায়ে স্থায়ী দাগের/ক্ষতের সৃষ্টি হয় যা চমড়াকে নিম্ন মানের করে ফেলে।
চামড়া ছাড়ানোর সময় ছুড়ির আঁচর, লবন দিতে দেরী করাও চামড়া নষ্ট হবার অন্যতম কারন।
একটি ১ নং গ্রেডের চামড়ার মূল্য যদি ১০০০ টাকা হয়, তবে ৮ম গ্রেডের দাম ১০০ টাকা। অথচ উভয় প্রকার চামড়ার জন্য প্রক্রিয়াকরন খরচ একই। ক্ষতির মূল যায়গাটা হল যে সম্পূর্ন প্রসেসিং শেষ না হওয়া পর্যন্ত বোঝা মুশকিল যে কোন চামড়া থেকে কোন গ্রেডের লেদার পাওয়া যাবে।
জুতা তৈরী একটি স্বতন্ত্র ব্যবসা। আপনি হয়ত জ্ঞাত আছেন যে বর্তমানে আপনারা যে জুতা কিনছেন তার বিশাল অংশই লেদারের নয় বরং সিনথেটিক ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরী। জুতা বিক্রেতারা সিনথেটিক পন্য দিয়ে তৈরী জুতাকে আর্টিফিশিয়াল/সিনথেটিক লেদারের জুতা বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। ক্রেতারাও সরল মনে লেদার ভেবে সিনথেটিক পন্য কিনে ঘরে ফিরছেন। আসলে সিনথেটিক বা আর্টিফিসিয়াল লেদার বলতে কিছু নেই। সবই বিক্রেতার চালাকি।পশুর শরীর থেকে প্রাপ্ত এবং প্রক্রিয়াজাত চামড়াকে লেদার বলা হয়। অন্য কিছুকে লেদার বলা যায় না।
চামড়ার জুতার দাম অনেক বেশী বলে মানুষজন সিনথেটিক জুতা পরছেন। কথাটি একদম ঠিক নয়। এক জোড়া মাঝারী মানের জুতা তৈরী করতে যে পরিমান লেদার দরকার তার মূল্য চার থেকে ছ শ’ টাকা মাত্র। সিনথেটিক উপাদান অনেক সস্তা। কিন্তু অনেক সিনথেটিকের জুতা চামড়ার জুতার চেয়ে দামে বেশী।
জুতার দামের কারন-
লেদার বাদে জুতা তৈরীর জন্য আরো অনেক উপাদান আছেঃ লাস্ট, সোল, ইনসোল, হিল, লাইনিং, আইলেট, সূতা, এডেসিভ, স্টীফেনার, লেস, বাকল, ওয়েল্ট, ফিনিশিং ম্যাটেরিয়াল, অর্নামেন্ট, প্রিজারভেটিভ, শ্রমিক, বিদ্যুৎ, , প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল, আনুষংগিক অন্যান্য উপাদান। এছাড়াও আছে কারখানা তৈরীর মূলধন, জমি ও যন্ত্রপাতি।প্রত্যেক ধরনের জুতা তৈরীর পিছনে আছে জিজাইন ও প্যাটার্ন তৈরীর কাজ। কাজেই জুতা প্রস্তুত সামান্য কোন বিষয় নয়, বরং এটি একটি বিশাল প্রযুক্তিগত কর্মযজ্ঞই বটে।
যেদিন থেকে আপনি অভিজাত এসি মার্কেটের ঝকঝকে পরিপাটি শো রুমের চটপটে তরুন তরুনীর কাছ থেকে জুতা কিনতে আরম্ভ করেছেন সেদিন থেকেই জুতার দামের সাথে আপনি এসি চালানোর খরচ, শোরুমের অগ্রীম, ডেকোরেশন, ভাড়া, কেতাদুরস্ত ব্যাবস্থাপনা, বিজ্ঞাপন, ব্যাংক লোনের সুদ, ব্রান্ড ভ্যালু ও বিনিয়োগকারীর লাভ, ইত্যাদি পরিশোধ করছেন।কাজেই প্রকৃত উৎপাদন খরচ ১০০ টাকা হলে তার সাথে আরো ১০০/১৫০ টাকা যোগ না হলে আপনার কাংখিত জুতা পায়ে দিতে পারবেন না।
জুতার ব্যবসা গার্মেন্ট ব্যবসা থেকে অনেক বেশী ঝুঁকিপূর্ন। জামা, প্যান্ট, গেঞ্জি, মোজা একটু বড় বা ছোট হলে মানিয়ে নেয়া যায়, কিন্তু জুতা পায়ের সাথে খাপে খাপ মিলতে হবে। প্রত্যেকের পা আলাদা ধরনের। জুতা লম্বা অনুযায়ী বড়দের ৯টি ও ছোটদের ৬টি, মোট ১৫টি সাইজ। আবার প্রত্যেক সাইজের মধ্যে পায়ের চওড়া অনুযায়ী আরো ২/৪ ধরনের ফিটিং। সাইজ ও ফিটিং না মিললে জুতা হয় অস্বস্তিকর।গ্রাহকের এক ঘেয়েমি দূর করতে প্রত্যেক সাইজের মধ্যে আছে নানান ডিজাইন। এতসব মিলিয়ে তৈরী করা জুতা চট করেই শতভাগ বিক্রিযোগ্য নয়।
প্রসংগক্রমে বলে রাখছি আজকাল অনেকের শরীরেই ব্যাক পেইন হচ্ছে এবং ব্যাক পেইনের অন্যতম একটি কারন হচ্ছে জুতার বেঠিক সাইজ ও ফিটিং । হাই হিল জুতা মেয়েদের ব্যাক পেইনের একটি বড় কারন। এতসব কিছু মাথায় রেখে তৈরী করতে হয় জুতা।
অকএব, পাঠকগন বুঝতে পারছেন কি জুতা ও চামড়ার দামের সম্পর্ক কি এবং কতটুকু?
লেখাটি ফেসবুকে আম জনতার উদ্দেশ্যে লেখা। কারো কোন মন্তব্য/ উপদেশ থাকলে সাদরে গ্রহনযোগ্য।
# সংগৃহীত।