26/07/2023
ইতিহাসের উজ্জ্বল স্বারক ১০ই মহররম:
মহররম ত্যাগ ও ঐতিহ্যের উজ্জ্বলতম মাস। এ মাসের দশম তারিখ তথা আশুরার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করেই মাসটি ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। এ দিনের তাৎপর্যময় ঐতিহাসিক ঘটনাবলী নিচে উপস্থাপিত হল:
১) হযরত আদম আ. এর তওবা মহররমের দশম দিন তথা আশুরায় কবুল হয়েছে। বর্ণিত আছে, তিনি দীর্ঘ ৩০০ বছর কান্নার পর আশুরার দিন তাঁর তওবা কবুল হয়। (তাযকিরাতুল ক্বুরতুবী)
২) এ দিনে হযরত নূহ আ. এর জাহাজ মহাপ্লাবন শেষে জুদি পাহাড়ে (বর্তমানে আরারাত পর্বতশ্রেণিতে) এসে স্থির হয়। (মুসনাদে আহমাদ)
৩) আল্লাহ তায়ালা হযরত ইদরীস (আ.) কে আশুরার এ দিনে উঁচু মর্যাদায় আসীন করেন। (তাযকিরাতুল কুরতুবী)
৪) হযরত ইবরাহিম আ. আশূরার দিনে জন্মগ্রহণ করেন এবং আল্লাহ তায়ালা এ দিনে তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেন ও আগুন থেকে মুক্তি দেন। (তাযকিরাতুল কুরতুবী)
৫) হযরত ইউসুফ (আ.) এ দিনে জেল থেকে মুক্তি পান। (তাযকিরাতুল কুরতুবী)
৬) আল্লাহ তায়ালা এ দিনে হযরত মূসা (আ.) ও তার উম্মতকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। (মুসলিম)
৭) এ দিনে হজরত ইউনুস আ. মাছের পেট থেকে মুক্তি পান। (তাম্বীহুল গাফিলীন)
৮) এই দিনেই হযরত সোলাইমান আলাইহিস সালামকে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন বাদশাহী দেয়া হয়েছিল। (তাযকিরাতুল কুরতুবী)
৯) এ দিনে হজরত ঈসা আ.-কে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়। (তাযকিরাতুল কুরতুবী)
১০) আরশ, কুরসী, আসমান-জমিন, চন্দ্রসূর্য, তারকা, বেহেশত এ দিনেই সৃষ্টি করা হয়েছে। (তাযকিরাতুল কুরতুবী)
১১) এ দিনেই সর্বপ্রথম আসমান থেকে যমিনে বৃষ্টিপাত হয়েছিল। (তাযকিরাতুল কুরতুবী)
১২) আশুরার দিন পূর্ববর্তী আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ.)ও রোজা রাখতেন। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে উম্মতে মুহাম্মদির ওপর আশুরার রোজা ফরজ ছিল। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোজা নফল রোজায় পরিণত হয়।
১৩) এ দিনেই হযরত রাসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র, বেহেশতি যুবকদের সরদার হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেন।
১৪) এ দিনে আল্লাহ্ তায়ালা লাওহে মাহফুজ এবং যাবতীয় সৃষ্ট জীবের রূহ পয়দা করেন।এছারা পৃথিবী ও নদনদী,সাগর-মহাসাগর পাহার,গাছপালা সৃষ্টি করেন।
১৫) এ দিনে আদম (আঃ) কে পয়দা করে,তাকে বেহেশতে দাখিল করেন এবং পরবর্তীতে দিনেই পৃথিবিতে নির্বাসনে দেয়ার তিনশ বছর পর তাঁর দুয়া কবুল করেন।
মহররম মাসে মুসলিম উম্মাহর করণীয়:
১। অধিক পরিমাণে নফল রোযা পালন: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রমযানের পর সর্বোত্তম রোযা হচ্ছে আল্লাহর মাস মহররম (মাসের রোযা)। (সহীহ মুসলিম-১১৬৩, জামে তিরমিযী-৪৩৮,৭৪০, ইবনে মাজাহ-১৭৪২)। এ হাদীসে মহররম মাসে বেশি পরিমাণে নফল রোযা রাখার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ গোটা মহররম মাসই নফল রোযার জন্য উত্তম। (তোহফাতুল আহওয়াজী-৩/১৬৪)
২। বেশি বেশি নেক আমল করা: মহররম মাসের ফযিলত বিবেচনা করে নফল রোযার পাশাপাশি গোটা মাসে বেশি বেশি নফল নামায আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া-দরুদ, যিকির-আযকার,তাসবীহ-তাহলীল ও দান-সাদকা করা যেতে পারে। এছাড়া আশুরার দিনকে কেন্দ্র করে হামদ-নাত পরিবেশন ও ওয়াজ-নসিহতমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে।
৩। আশুরার রোযা পালন: মহররমের ১০ তারিখ তথা আশূরার রোযা রাখা মুস্তাহাব। আশূরার রোযার ব্যাপারে হযরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আশূরার দিনের রোযার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, তিনি পূর্ববর্তী এক বছরের পাপ ক্ষমা করে দিবেন। (সহীহ মুসলিম-১১৬২, জামে তিরমিজী-৭৫২, ইবনে মাজাহ-১৭৩৮)
তবে কোনো সক্ষম, সুস্থ-সবল ব্যক্তির জন্য শুধু আশুরার দিন রোযা রাখা মাকরুহ, তার আগে অথবা পরে অর্থাৎ মহররমের ৯ বা ১১ তারিখ রোযা রাখতে রাসূল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, যা রাখা মুস্তাহাব। এ সম্পর্কে এক হাদীসে এসেছে যে, ‘তোমরা আশুরার রোযা রাখ এবং ইহুদীদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ করে আশুরার আগে বা পরে আরো একদিন রোযা রাখ।’ (মুসনাদে আহমদ ১/২৪১, ইবনে খুযাইমা-২০৯৫)
কোনো কোনো আলেম এ বিষয়ে বর্ণিত সব হাদিসের ওপর আমল করার জন্য মহররমের ৯, ১০ ও ১১ তারিখ তিন দিনই রোজা রাখার কথা মুস্তাহাব বলেন।
৪। বিদয়াতী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা: মুহাররম মাসে আশুরাকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে এমন কিছু কাজ সংঘঠিত হয়, যা শরীয়ত সমর্থিত নয়। আলোকসজ্জা, আতশবাজি, দুটি কবুতর জবাই, কালো কাপড় পরিধান, সত্তরদানা ভাত পাকানো, জারিগান, তাজিয়া, মিছিল, মর্সিয়া, হাহুতাশ, আহজারী ও শোক প্রকাশ করা, শোক প্রকাশার্থে বক্ষে ও পিঠে ছুরিকাঘাতের মাধ্যমে রক্তাক্ত করা সম্পূর্ণ শরীয়ত বিরোধী কাজ। এ সমস্ত বিদয়াতী কর্মকাণ্ড থেকে মুসলিম উম্মাহর পরহেয থাকা ইমানী দায়িত্ব।