22/07/2026
শুরুতেই একটা কথা বলি ভাই - এই লেখাটা দেখে স্ক্রল করে চলে যাইয়েন না। ২ মিনিট দাঁড়ান। হয়তো আপনার আব্বু, আম্মু বা আপনি নিজেই ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছেন, টেরও পাচ্ছেন না।
গত পরশু আমার এক পরিচিত ছোট ভাইয়ের মেসেজ। বয়স মাত্র ৩২। লিখছে, "ভাই, ডাক্তার বলছে আমার দুইটা কিডনিই নাকি 70% ড্যামেজ। অথচ আমার তো কোনোদিন ব্যথাই করে নাই!"
ছেলেটা সারাদিন দোকানে বসে থাকে, দিনে ৩-৪ বার চা, দুপুরে বাইরের বিরিয়ানি, রাতে ব্যথা হইলেই নিজে নিজে পেইনকিলার খায়। ভাবতো, "আমি তো ইয়াং, আমার আবার কিসের রোগ!"
আরেকটা ঘটনা শোনেন। আমার এক মামা, বয়স ৪৮। ডায়াবেটিস আছে ৮ বছর ধরে। ওষুধ খায় মাঝে মাঝে, মাপে না। গত মাসে হঠাৎ মুখটা ফুলে গেছে, পায়ে পানি। ভাবছে এলার্জি। হাসপাতালে নিয়ে ক্রিয়েটিনিন টেস্ট করাইতেই মাথায় হাত। ক্রিয়েটিনিন 4.8! ডাক্তার বললো, "আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন? আপনার কিডনি তো প্রায় বিকল হওয়ার পথে।"
দুইটা মানুষ, দুইটা বয়স, কিন্তু ভিলেন একটাই। আর এর নাম - ক্রনিক কিডনি ডিজিজ, CKD।
ভাই, কিডনি কোনো ব্যথা ছাড়া নষ্ট হয় কেমনে?
এইখানেই সবচেয়ে বড় ধোঁকা। আমাদের কিডনি হইলো আল্লাহর দেওয়া নীরব ফ্যাক্টরি। শরীরের সব ময়লা, লবণ, পানি ফিল্টার করে। মজার ব্যাপার হইলো, কিডনির 80% নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত সে আপনাকে কোনো সিগন্যালই দিবে না। চুপচাপ কাজ করে যাবে।
আপনি ভাবতেছেন, "আমি তো দিব্যি আছি, প্রস্রাবও ঠিক আছে।" কিন্তু ভিতরে ভিতরে ফিল্টারগুলা একটু একটু করে বন্ধ হইতেছে। যেদিন 20% বাকি থাকবে, ওইদিন হঠাৎ মুখ ফুলবে, বমি আসবে, প্রেশার 200 ছুঁইবে। তখন ডাক্তারের কাছে গিয়ে শুনবেন, "ডায়ালাইসিস লাগবে।" এই জন্যেই লোকে বলে, কিডনি হইলো সাইলেন্ট কিলার।
তাইলে অল্প বয়সে কিডনি খাওয়ার আসল ভিলেন কারা?
১. "প্রেশার আর ডায়াবেটিস তো বুড়াদের রোগ" - এই ভুল ধারণা: ভাই, বাংলাদেশে CKD এর ৭০% কারণই এই দুইটা। আপনার বয়স ৩০, কিন্তু প্রেশার 150/95 নিয়ে ঘুরতেছেন, আপনি টেরও পান না। এই হাই প্রেশার প্রতিদিন কিডনির ভিতরের ছোট ছোট রগগুলাকে কেটে ফেলে। ডায়াবেটিসও সেম, চিনি জমে জমে ফিল্টার জ্যাম করে দেয়।
২. মুড়ির মতো পেইনকিলার আর গ্যাসের ওষুধ খাওয়া: মাথা ব্যথা, কোমর ব্যথা হইলেই Napa Extra, Rolac, Diclofenac? ভাই, এই NSAID গ্রুপের ওষুধ কিডনির জন্য সরাসরি বিষ। আর বছরের পর বছর ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া গ্যাসের ওষুধ Omeprazole খাওয়া - এটাও কিডনি ড্যামেজ করে। আমি নিজে দেখছি, এই কারণে ২৮ বছরের মেয়ের কিডনি ফেইল।
৩. পানি না খাওয়া আর বাইরের লবণ: সারাদিনে ১ বোতল পানিও খান না, কিন্তু ৩ কাপ চা, ২ টা কোল্ড ড্রিংকস ঠিকই খান। আবার রাস্তার ফাস্টফুড, চিপস, আচার, শুটকিতে ভরা লবণ। কিডনি পানি না পেয়ে শুকায় যায়, আর লবণ প্রেশার বাড়ায় দেয়। ডাবল আঘাত।
একদম শেষ মুহূর্তে যে সিগন্যালগুলা আমরা পাত্তা দেই না:
√ সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ, বিশেষ করে চোখের নিচটা ফুলে থাকা।
√ পায়ের গোড়ালিতে চাপ দিলে গর্ত হয়ে থাকা, জুতা টাইট লাগা।
√ প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা হওয়া, মনে হবে শ্যাম্পু দিছেন। এটা প্রোটিন লিক করার লক্ষণ।
√ রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভাঙা, মুখে রুচি না থাকা, বমি বমি ভাব।
√ সারাদিন ক্লান্ত লাগা, কোনো কারণ ছাড়াই প্রেশার হাই থাকা।
ভয় পাইয়েন না ভাই, খবরটা খারাপ হইলেও সমাধানটা কিন্তু একদম সহজ।
কিডনি রোগ 1st বা 2nd স্টেজে ধরা পড়লে কোনো ডায়ালাইসিস, ট্রান্সপ্লান্ট কিছুই লাগে না। শুধু প্রেশার-ডায়াবেটিস কন্ট্রোল, খাওয়া-দাওয়া আর একটু লাইফস্টাইল। এইটুকু করলেই আপনি সারাজীবন এই কিডনি নিয়ে চলতে পারবেন।
তাই আজকে থেকেই ৩টা কাজ পাক্কা করেন:
১. বয়স ৩০ পার হইলে বছরে ১ বার KUB রিপোর্ট না, এই ২ টা টেস্ট করান: Serum Creatinine আর Urine ACR। সাথে একবার প্রেশারটা মাপান। খরচ? 500-700 টাকা। একটা বার্গার খাওয়ার টাকা। কিন্তু এই ২ টা টেস্ট আপনার কিডনির আগামী ২০ বছরের গ্যারান্টি কার্ড।
২. পেইনকিলারকে না বলুন, পানিকে হ্যাঁ বলুন: ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ব্যথার ওষুধ না। আর প্রতিদিন 2-2.5 লিটার পানি খান। হিসাব সোজা - প্রস্রাবের রং সাদা বা হালকা হলুদ থাকলে বুঝবেন পানি ঠিক আছে।
৩. লবণ আর চিনিকে কন্ট্রোল করেন: কাঁচা লবণ একদম বাদ। ভাতের পাতে আলাদা লবণ নিবেন না। ফাস্টফুড, সফট ড্রিংকস সপ্তাহে ১ দিন করেন। আর ডায়াবেটিস-প্রেশার থাকলে ওষুধ মিস দিয়েন না ভাই, ওইটাই আপনার কিডনির রক্ষাকবচ।
ভাই, আমরা বাইকের ইঞ্জিনে সময়মতো মবিল চেঞ্জ করি, যাতে ইঞ্জিন নষ্ট না হয়। আর শরীরের যে ফ্যাক্টরি ২৪ ঘণ্টা বিনা শব্দে আপনার রক্ত পরিষ্কার করতেছে, তার খবর রাখি না।
পোস্টটা নিজের টাইমলাইনে শেয়ার করে রাখেন। আর যেই বন্ধুটা কথায় কথায় পেইনকিলার খায়, পানি খায় না, বা ফ্যামিলিতে ডায়াবেটিস-প্রেশার আছে - তারে মেনশন দেন। আপনার একটা শেয়ারে যদি একটা মানুষও কালকে গিয়ে ক্রিয়েটিনিন টেস্টটা করায়, বিশ্বাস করেন ভাই, আপনি একটা পরিবারকে পথে বসা থেকে বাঁচায় দিলেন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুস্থ রাখুক। বুকে হাত দিয়ে বলেন তো, আব্বু-আম্মুর টেস্টটা এই সপ্তাহেই করাবেন?
সুস্থ থাকুন ভাল থাকুন। শুভকামনা। নিয়মিত হেলথ টিপস পেতে ফলো করে রাখুন।