20/10/2020
মসলিন ও জামদানি- হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস
যাদুকরী ঢাকাই মসলিন হারিয়ে গেছে শতবছর আগে। বাঙালিরা তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের যে সামান্য কিছু বিষয় বা বস্তু নিয়ে গর্ববোধ করত এবং এখনো করে তাদের মধ্যে প্রধানতম হল মসলিন কাপড়।
মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদীতীরবর্তী এলাকার ফুটি কার্পাস তুলা থেকে তৈরি এ কাপড় তার সূক্ষ্ণতার জন্যই সারা বিশ্বে বিখ্যাত ছিল। ভারতের মুঘল রাজপরিবার এমনকি ব্রিটিশ রাজরানীদেরও নাকি প্রথম পছন্দের কাপড় ছিল ঢাকাই মসলিন।
মধ্যযুগে ঢাকাই মসলিন তৈরির প্রধান উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয় সোনারগাঁও এবং আধুনিক যুগে পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনাবেষ্টিত ১৯৬০ বর্গমাইল জুড়ে ঢাকা, সোনারগাঁও, ডেমরা, তিতবদ্ধী, বালিয়াপাড়া, নাপাড়া, মৈকুলি, বাছারক, চরপাড়া, বাশটেকি, নবীগঞ্জ, শাহপুর, ধামরাই, সিদ্ধিরগঞ্জ, কাচপুর প্রভৃতি জায়গাগুলো উৎকৃষ্ট মসলিন তৈরির প্রধান কেন্দ্র ছিল।
পোশাকসমূহ এতই সুক্ষ্ণ ছিলো যে ৫০ মিটার দীর্ঘ মসলিনের কাপড়কে একটি দিয়াশলাই বাক্সে ভরে রাখা যেতো।
জামদানী:
প্রাচীনকালের মিহি মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি শাড়ি বাঙ্গালী নারীদের অতি পরিচিত। জামদানি বলতে সাধারণতঃধ শাড়িকেই বোঝান হয়। তবে জামদানি দিয়ে নকশী ওড়না, কুর্তা, পাগড়ি, রুমাল, পর্দা প্রভৃতিও তৈরি করা হত। তবে আগেকার যুগে `জামদানী` বলতে বোঝানো হতো নকশা করা মসলিনকে।
মুঘলদের পরাজিত করে বাংলা দখল করল ব্রিটিশ বেনিয়ারা। রাজ্য ক্ষমতা দখলের পূর্বেই তারা বুঝতে পেরেছিল যে তাদের বিলেতি শাড়ীর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হল ঢাকার মসলিন। তাই তারা মসলিনকে চিরতরে দূর করে দিতে চাইল। প্রথমেই তারা মসলিন কাপড়ের উপর অত্যধিক শুল্ক বা ট্যাক্স চাপিয়ে দিল। বিলেত থেকে আমদানী করা কাপড়ের উপর শুল্ক ছিল ২-৪%। কিন্তু মসলিনসহ দেশি কাপড়ের উপর তারা ট্যাক্স বসাল ৭০-৮০%। তাই দেশে যেমন বিলিতি কাপড় সুলভ হল, একই সাথে ব্যয়বহুল হয়ে উঠল মসলিনসহ দেশি কাপড়। প্রতিযোগিতায় তাই মসলিন টিকতে পারছিল না। কিন্তু তারপরও টিকেছিল মসলিন।
এবার ইংরেজ শাসকগণ নিষেধাজ্ঞা জারি করল মসলিন তৈরির উপর। তাদের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেও চলল মসলিনের উৎপাদন। তখন তারা মসলিন কারিগরদের ধরে ধরে তাদের হাতের আঙ্গুল কেটে দেয়া শুরু করল যাতে গোপনে গোপনে তারা মসলিন তৈরি করতে কিংবা এর নির্মাণকৌশল অন্যদের শিক্ষা দিতে না পারে। আর এভাবেই একদিন বাঙালিরা হারিয়ে ফেলল