07/03/2023
শবে বরাত : গুরুত্ব, ফযীলত, করণীয় ও বর্জনীয়:
শা’বানের পঞ্চদশ রজনী তথা শবে বরাত একটি তাৎপর্যমন্ডিত ও ফযীলতপূর্ণ রাত। ইসলামের শ্রেষ্ট ও সোনালী যুগসমূহেও শবে বরাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং এর ধারাবাহিকতা এ পর্যন্ত জারী রয়েছে। পবিত্র হাদীস গ্রন্থসমূহে শবে বরাতের সমর্থনে দশজন সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং শবে বরাতকে বিদ’আত বা ভিত্তিহীন আখ্যা দেয়ার কোন সুযোগ নেই।
১) হযরত মু’য়াজ ইবনে জাবাল (রাঃ) রাসুলুল্লাহ (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ তা’আলা শা’বান মাসের পনের তারিখ দিবাগত রাতে সৃষ্টিকূলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দান করে সকলকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া। (ইবনে হিব্বান: ১২/৪৮১, বায়হাকী: ৫/২৭২, তারবানী: ২০/১০৮)।
আলোচ্য হাদীসটির মূল বক্তব্য ও সূত্র উভয়টি সহীহের অন্তর্ভূক্ত, যেমনটি মন্তব্য করেছেন শায়খ আলবানীসহ অন্যান্য হাদীস বিশারদগণ। (সিলসিলাতুল আহাদীস-আস সাহীহাহ্: ১৩৮/৩)
২) হযরত আয়েশা (রা.) বলেন একরাতে আমি নবীজী (সাঃ) কে বিছানায় পেলাম না। তাই তাঁকে খোজ করার উদ্দেশ্যে বের হলাম। আমাকে দেখে তিনি বলে উঠেন, তুমি কি আশংকা করছো যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার সাথে অবিচার করবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আমি ধারণা করেছিলাম আপনি অন্য কোন স্ত্রীর ঘরে তাশরীফ নিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, শা’বানের পনের তারিখ রাতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে তাশরীফ আনেন এবং বনূ কাল্ব গোত্রের ভেড়া বকরীরর পশমগুলোর চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে তিনি মা’ফ করে দেন। (বায়হাক্বী: ৩/৩৭১, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব: ৪/২৩৮)
উপরোক্ত হাদীসের বিষয়ে বড় বড় মুহাদ্দিসীনদের মধ্য থেকে কেউই হাদীসটি জাল বলেননি কিংবা অত্যাধিক দূর্বল বলেন নি। বরং হাদীসের সমস্ত বর্ণনাকারী
নির্ভরযোগ্য এবং অন্য আরও হাদীসের সহযোগীতায় হাদীসটি শক্তিশালী হয়ে যায়। সুতরাং হাদীসটি শবে-বরাতের ফযীলতের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য।
৩) রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি পাঁচটি রাতে জাগ্রত থাকবে তাঁর জন্য জান্নাত অবধারিত।
১) যিলহজ্জের অষ্টম রাত
২) যিলহজ্জের নবম রাত
৩) ঈদুল আজহার রাত
৪) ঈদুল ফিতরের রাত
৫) শা’বানের পঞ্চদশ রজনী।
শবে বরাতে করণীয়
১) শবে বরাতে রাত জেগে ইবাদাত বন্দেগী করা। (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব: ২/১৫২)
২) দু’আ ও তাওবার মাধ্যমে গুনাহসমূহের ক্ষমা প্রার্থনা করা (বায়হাক্বী: ৩/৩৮৪)
৩) সম্ভব হলে কবর যিয়ারত করা (বায়হাক্বী: ৩/৩৮৪)
৪) ১৫ তারিখের দিনে রোযা রাখা (ইবনে মাজাহ: ২/১৬০) উক্ত আমলটি যদিও দূর্বল হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু যেহেতু আমলের ফযীলতের ক্ষেত্রে দূর্বল হাদীস গ্রহণযোগ্য তাই এদিনে রোযা রাখা যেতে পারে।
শবে বরাতে বর্জনীয়
১) আতশবাজী। কারণ এতে মূল্যবান সময় ও সম্পদের অপচয় হয় এবং অপর মুসলমানের কষ্ট সাধন ও ইবাদাতে বিঘ্নতা ঘটে যা কুরআন-হাদীসের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
২) আলোকসজ্জা করা। এটাও অর্থের অপচয়সহ কাফিরদের সাদৃশ্য হওয়ার দরুণ নিষিদ্ধ।
৩) হালুয়া, রুটি ও মিষ্টির আয়োজন করা। কারণ এর সাথে শবে বরাতের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এর দ্বারা অনেক ক্ষেত্রে শবে বরাতে ইবাদাতে বিঘ্নতা ঘটে।
শবে বরাতেও যাদের ক্ষমা করা হয় নাঃ
মহান রাব্বুল আলামীন সর্বস্তরের মুসলমান, ঈমানদার নারী-পুরুষকে এই পবিত্র রজনীতে ক্ষমা করে থাকেন কিন্তু কতিপয় দূর্ভাগা, হতভাগা এমনও আছে যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে না, যতক্ষণ না তারা স্বীয় অপরাধ ও অপকর্ম থেকে ফিরে এসে খালেস নিয়তে তাওবাহ করে। তারা হলো:
১) মুশরিক (যে আল্লাহ সাথে শিরক করে)
২) হিংসুক
৩) আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্নকারী
৪) টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী
৫) মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান
৬) মদ্যপ
৭) অন্যায়ভাবে হত্যাকারী
৮) ব্যাভিচারী
(বায়হাক্বী: ৩/৩৮৩-৩৮৪, মুসনাদে আহমাদ: ৬/১৯৮)