19/10/2024
যারা বলে বেশির ভাগ উম্মত আশআরী বা মাতুরিদী, তাদের কাছে প্রশ্ন
প্রথমত, আমাদেরকে এটি বিশ্বাস করতে হবে যে সর্বদা বেশির ভাগ মানুষের পক্ষেই হক্ক থাকবে তা নয়। পূর্ববর্তী নবীদের অনুসারীরা সংখ্যায় বেশি ছিল না, তারপরও হক তাদের সাথে ছিল।
দ্বিতীয়ত, বেশিরভাগ যদি হকের মাপকাঠি ধরা হ্য় তাহলে সেটা সাহাবায়ে কিরামের যুগ, তাবেঈদের যুগ ও তাবে তাবেঈদের যুগকে ধরা হোক,
- যাদের হকের উপর থাকার ব্যাপারে রাসূলের পক্ষ থেকে ঘোষণা এসেছে।
- যারা হকের উপর ছিলেন বলে উম্মতের ইজমা বা ঐকমত্য রয়েছে।
যদি তারপরও বিতর্ক করে যান, তাহলে আমরা বলবো,
১- আশআরী ও মাতুরিদীর জন্মের আগে যারা চলে গেছে তারা আকীদার মৌলিক বিষয়গুলোতে কোন আকীদা পোষণ করত?!!
যেমন,
- আল্লাহ কোথায় আছেন?
- আল্লাহর সত্তাগত গুণগুলো কি সাব্যস্ত হবে?
- আল্লাহর কর্মগত গুণগুলো কি সাব্যস্ত হবে?
- আল্লাহর কর্ম তিনি যখন ইচ্ছা করেন?
- আল্লাহর উপর ঈমান বলতে কী বুঝায়?
- আল্লাহর তাওহীদ বলতে কী বুঝায়?
এ জাতীয় প্রশ্নগুলোর উত্তর কি কুরআনে কারীমের বাণীতে, রাসূলের হাদীসে, সাহাবায়ে কিরামের উক্তিতে, তাবেঈদের বক্তব্যে, তাবে তাবেঈদের আকীদা ও বিশ্বাসে ছিল না? তারা যে আকীদা পোষণ করত সে আকীদা বিশ্বাসে আমাদের অবস্থান থাকলে কী সমস্যা?!!
২- আশআরী ও মাতুরিদীর আগে বিখ্যাত যে সব ইমামগণ চলে গেছেন তাদের মধ্যে কেউ কি কোনো আকীদা পোষণ করে কোনো বক্তব্য কিংবা গ্রন্থ রচনা করেননি? তাদের সেসব বক্তব্য ও আকীদা গ্রহণ না করে তৃতীয় শতাব্দীতে আলোচিত আকীদা কেন গ্রহণ করতে হবে?
৩- নিম্নলিখিত ইমামগণের কেউ কি আশআরী ও মাতুরিদীদের আকীদা জানতেন? তারা সেগুলো না জেনে যদি জান্নাতের পথে যেতে পারেন তাহলে আমাদের সে পথে চলে জান্নাত খুঁজতে অসুবিধা কোথায়?
যেমন,
- সাহাবায়ে কিরাম, বিশেষ করে যারা ফিতনার যুগ পেয়েছেন, ইবন মাসঊদ, ইবন আব্বাস, ইবন উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম।
- তাবেঈনে ইযাম, বিশেষ করে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যেব মৃত্যু ৯৪ হিজরী, উমার ইবন আব্দুল আযীয মৃত্যু ১০১ হিজরী, হাসান বসরী মৃত্যু ১১০ হিজরী।
- ইমাম আবু হানীফা মৃত্যু ১৫০ হিজরী।
- ইমাম আওযাঈ মৃত্যু ১৫৭ হিজরী।
- ইমাম সুফইয়ান সাওরী, মৃত্যু ১৬১ হিজরী।
- ইমাম মালেক মৃত্যু ১৭৯ হিজরী।
- ইমাম সুফইয়ান ইবন উয়াইনাহ, মৃত্যু ১৯৮ হিজরী।
- ইমাম শাফেঈ মৃত্যু ২০৪ হিজরী।
- ইমাম ইসহাক ইবন রাহওয়িয়াহ, মৃত্যু ২৩৮ হিজরী।
- ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল মৃত্যু ২৪১ হিজরী।
- ইমাম আহমাদ ইবন সাঈদ আদ- দারেমী, মৃত্যু ২৫৩ হিজরী।
- ইমাম আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুর রহমান আদ-দারেমী, মৃত্যু ২৫৫ হিজরী।
- ইমাম বুখারী, মৃত্যু ২৫৬ হিজরী।
- ইমাম মুসলিম, মৃত্যু ২৬১ হিজরী।
- ইমাম ইবন মাজাহ, মৃত্যু ২৭৩ হিজরী।
- ইমাম আবু দাঊদ, মৃত্যু ২৭৫ হিজরী।
- ইমাম তিরমিযী, মৃত্যু ২৭৯ হিজরী।
- ইমাম নাসাঈ, মৃত্যু ৩০৩ হিজরী।
- ইমাম তাবারী, মৃত্যু ৩১০ হিজরী।
এরা সবাই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইমাম বলে সর্বজন স্বীকৃত। এমনকি ইমাম ইবন জারীর আত তাবারীকে বলা হয় সর্বশেষ মুজতাহিদে মুতলাক। এরা সকলে যে আকীদা পোষণ করতেন তা আমাদের জন্য আকীদার পথের মাইলফলক হলো না কেন?
৪- আশআরী আকীদার ইমাম আবুল হাসান আশআরী নিজে যে আকীদা বাদ দিয়ে জীবনের শেষ সময়ে তিনটি গ্রন্থ রচনা করেছেন সে ইমামের শেষের গ্রন্থগুলোতে কেন আশআরীরা থাকলো না? তিনি বাগদাদে আসার পরে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস যাকারিয়া আস-সাজী এর দরবারে বসে আলোচনার পরে ইমাম আহমাদ ও মুহাদ্দিসগণের আকীদা কী তা জানার পরে নিজের মতগুলোকে পরিশীলিত করে নিন্মোক্ত তিনটি গ্রন্থ রচনা করেন,
- আল ইবানাহ আন উসূলিদ দিয়ানাহ।
- মাকালাতুল ইসলামিয়্যীন।
- রিসালাতুন ইলা আহলিস সাগার।
যা এখনো বিদ্যমান, যার বেশির ভাগই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদার সাথে মিলে যায়, আশআরীরা সে আকীদা কেন গ্রহন করে না?
৫- যে সব আকীদা না জেনে সাহাবা, তাবেঈ, তাবে তাবেঈ ও ইমামগণ চলে গেছেন, আমাদেরকে সেসব আকীদা-বিশ্বাস কেন পোষণ করতে হবে?
- সাহাবায়ে কিরামের কেউ কি জাওহার কিংবা আরাদ্ব নিয়ে কথা বলেছেন?
- সাহাবায়ে কিরামের কেউ কি কাদীম ও হাদেস নিয়ে কথা বলেছেন?
- সাহাবায়ে কিরামের কেউ কি আল্লাহকে উপরে বলা যাবে না বলেছেন?
- সাহাবায়ে কিরামের কেউ কি আল্লাহকে সর্বত্র বিরাজমান বলেছেন?
- সাহাবায়ে কিরামের কেউ কি কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যকে প্রকাশ্য অর্থে নেয়া যাবে না বলেছেন?
- সাহাবায়ে কিরামের কেউ কি আল্লাহর কালামকে বর্ণহীন, ধ্বনীহীন বলেছেন?
- সাহাবায়ে কিরামের কেউ কি আল্লাহর কথাকে শুধু নফসে সীমাবদ্ধ করে কালামে নাফসী বলেছেন?
- সাহাবায়ে কিরামের কেউ কি আল্লাহর “ইস্তেওয়া আলাল আরশ” বা আরশের উপর উঠার গুণটিকে পরিবর্তন করে ইস্তীলা বা আরশ দখল করার অর্থ করতে বলেছেন?
- সাহাবায়ে কিরামের কেউ কি আল্লাহর হাতকে নেয়ামত বা কুদরত বলেছেন?
- সাহাবায়ে কিরামের কেউ কি আল্লাহর কোনো গুণ অস্বীকার করেছেন?
- সাহাবায়ে কিরামের কেউ কি আল্লাহর গুণগুলোকে অর্থহীন বলতেন?
- সাহাবায়ে কিরামের কেউ কি বলতেন যে মানুষের ক্ষমতা আছে তবে সেটার কোনো প্রভাব নেই?
- সাহাবায়ে কিরামের কেউ কি খবরে ওয়াহিদ (এমন হাদীস যার বর্ণনাকারীরা অগণিত অসংখ্য হয়নি) আকীদার জন্য গ্রহণ করা হবে না বলে কোনো শর্ত লাগিয়েছেন? নাকি তারা বিশুদ্ধ হওয়াই যথেষ্ট মনে করেছেন?! বস্তুত তারা তো সনদ বিশুদ্ধ হওয়াই গ্রহণ করার মাপকাঠি নির্ধারণ করতেন।
৬- ইমাম আবুল হাসান আল আশআরীর জন্ম যদি ২৬০ হিজরী সালে হয়, (মৃত্যু ৩২৪ হিজরীতে হয়) তাহলে তার আগের লোকেরা কী আকীদা পোষণ করত? তাদের কি আকীদা বিশ্বাস ছিল না? তাদের জন্য যা যথেষ্ট ছিল আমাদের জন্য তা যথেষ্ট হতে বাধা কোথায়?
৭- আকীদার মৌলিক মাসআলাগুলো এমন নয় যা পরে এসেছে। বরং রাসূল স্বয়ং সেগুলো সুসংহত করেছেন। সাহাবায়ে কিরাম সেগুলোর দাওয়াত সর্বাগ্রে প্রদান করতেন। তাবেঈগণ সেগুলো বিস্তারিত আলোচনা করতেন। তাবে তাবেঈগণ সেগুলো নিয়েই প্রথম আলাদা গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাহলে পরে সেখানে ইজতিহাদ করে বলার সুযোগ কি আশআরী বা মাতুরিদীর কারো থাকে?
৮- এখনো বিশ্বের বেশিরভাগ মুসলিম স্বাভাবিক অর্থেই কুরআন ও সুন্নাহ গ্রহণ করে আমল করে থাকে। যেমন
- তারা আল্লাহর উপর ঈমান নিয়ে সন্দেহে থাকে না।
- তারা আল্লাহর কথা মনে হলেই উপরের দিকে অন্তর ধাবিত করে।
- তারা দোআ করতে গেলেই দু হাত উপরে তুলে দেয়।
- তারা আল্লাহর গুণাবলীর স্বাভাবিক প্রকাশ্য অর্থ করে।
- তারা বিশ্বাস করে নবীজীর সাথে আল্লাহ আরশের কাছে কথা বলেছেন।
- তারা বিশ্বাস করে আল্লাহর কাছ থেকে ওহী অবতরণ করে।
- তারা বিশ্বাস করে ফিরিশতাকুল রূহ নিয়ে আল্লাহর কাছে উপরের দিকে নিয়ে যায়।
- তারা বিশ্বাস করে আরশ সবকিছুর উপরে। আর আল্লাহ আরশের উপরে।
তাহলে আশআরী মাতুরিদীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম হওয়ার দাবী সম্পূর্ণ মিথ্যা।
প্রিয় ভাই সকল!
সুতরাং আসুন আমরা ইনসাফ করি, নিজেদেরকে পরিশুদ্ধ করি। সাহাবা, তাবেঈ, তাবে তাবেঈ ও প্রথম তিন যুগের সম্মানিত ইমামগণের আকীদার দিকে ফিরে যাই, তাদের আকীদা গ্রহণ করি। আশআরী ও মাতুরিদী আকীদা হিসাবে যা প্রচলিত আছে তা পরিত্যাগ করি।
আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক পথের দিশা দিন, আমীন।
✍️ প্রফেসর ড. আবূ বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
পিএইচডি, আকীদাহ্ ও দাওয়াহ্ অনুষদ,
মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়