24/11/2024
শাহানা, ইউরোপ ট্যুরে যাবে?
আমি চশমার ফাঁক দিয়ে ঘোলাটে চোখে তাকাই। ম্লান হেসে বলি
-যাব
আমার স্বামী মুখ বেঁকিয়ে বলেন,
- ইস বুড়ো বয়সেও বেড়ানোর শখ মিটে না।
আমি তাকিয়ে থাকি। বড় ক্লান্তি লাগে। দোতলা বাড়ির উপর থেকে নিচতলায় যেতে পারিনা হাঁটুর ব্যথায়; ইউরোপ ট্যুর তো কোন ছার। খাবারটা পর্যন্ত উপরে এসে দিয়ে যেতে হয়। মাঝে মাঝে ভুলে যায় ওরা। তাই নিজের জন্য একটু শুকনো খাবার মজুত রাখি। এই বিস্কিট, ড্রাই কেক এইসব আরকি। এ আমিও জানি ইউরোপ ট্যুর তো দূরে থাক, এখান থেকে ভাইয়ের বাসা অবধি যাওয়ার জোর নেই আমার। রিক্সায় উঠতে পারিনা। গাড়ি সবসময় ফ্রি পাওয়া যায় না। ছেলের অফিস, নাতনির কোচিং, আমার স্বামীর ক্লাব; সব মিলিয়ে গাড়ি সব সময় ব্যস্ত। তাছাড়া গাড়িতে উঠতেও পারিনা; হাঁটু মুড়ে
বসতে কষ্ট হয়। সঙ্গে একজনের বেশি আর কাউকে নিতেও পারি না। সবাই বিরক্ত হয় আমার সঙ্গে যেতে। তবে ভাইয়ের বউটা বেশ আদর যত্ন করে। মেয়েটা বড় ভালো। গরিব ঘরের মেয়ে সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতো। আমি যখনই যেতাম ওকে ভরসা দিতাম, সাহস দিতাম। মনে রেখেছে মেয়েটা। ওর সঙ্গে দুটো কথা বলে শান্তি পাই। আর কেউ তেমন একটা কথা বলতে আসে না।
ওর নাম রত্না। ময়মনসিংহে বাড়ি। একবার নিয়ে গিয়েছিল আমাকে। ভীষণ ভাল লেগেছিল। বিরিশিরিতে নদীর জলে গা ডুবিয়ে মনে হয়েছিল সব কষ্ট ধুয়ে মুছে গেল। এর বাইরে আর খুব একটা বেশি কোথাও যাওয়া হয়নি। ও হ্যাঁ একবার কক্সবাজারে নিয়ে গিয়েছিল ছেলে, ছেলের বউ সঙ্গে করে। মেয়ে এসেছিল আমেরিকা থেকে। সবাই মিলে বেড়াতে গিয়েছিল। আমাকেও সঙ্গে নিল। তখন আমার শরীরে জোর ছিল। ভেবেছিলাম কোনোদিন কোথাও যেতে পারিনি, হয়তো ছেলেমেয়েরা সে অভাব পূরণ করতে নিয়ে যাচ্ছে। হোটেলে গিয়ে বুঝতে পারলাম আসলে তা না। যেন স্বাধীন ভাবে বেড়াতে পারে আট মাসের নাতি শুভ্রকে হোটেলে রেখে, তাই আমাকে নেয়া। মজার ব্যাপার হলো সবাই সী ভিউ রুম পেল। আমি বারান্দায় গিয়ে দেখলাম শুধুই দেয়াল। নাতিকে আমার কাছে রেখে ওরা বেড়ালো। রুমে খাবার পাঠিয়ে দিত। খাবার নিয়ে কার্পণ্য করেনি কেউ। ছেলেমেয়েরা ভালো ভালো খাবার পাঠিয়ে দিয়েছে। ক্ষুধা মিটে ছিল হয়তো আমার। তবে সেটা মনের কিংবা আমার চোখের নয়।
আমার যখন বিয়ে হয়, তখন আমার বয়স কত হবে ২১ বা ২২। সবে বিএ পরীক্ষা দিয়েছি। সেইসময়ই মামা এই বিয়ের প্রস্তাবটা আনেন। ছেলে খুব ভালো ছাত্র। জাপানে পিএইচডি করছেন। দেশে এসেছে বিয়ে করবে বলে। একমাস পর ফিরে যাবে এরপর ছয় মাস পরে এসে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। বাড়ির সবাই মহা খুশি। খুব দ্রুতই সব ঠিকঠাক হয়ে গেল। ভাই বোন নিয়ে বিশাল যৌথ পরিবার। খারাপ লাগেনি আমার। একটা মাস কোথা দিয়ে চলে গেল টেরই পেলাম না। আমার স্বামী জাপানের অনেক ছবি দেখাল আমাকে। তখন থেকেই মনের মধ্যে স্বপ্ন বুনতে শুরু করলাম। চেরি ব্লসোম, মাউন্ট ফুজি সব দেখব বলে। আমার স্বামীর একটা ছবি মাউন্ট ফুজির সামনে; বাঁধাই করে রাখা আছে ড্রইং রুমে। প্রায়ই তাকিয়ে থাকতাম ওটার দিকে, মনে হত কখন তোমাকে দেখব। স্বপ্ন স্বপ্ন বোধ হতো। অপেক্ষার প্রহর গুনতাম। ছয় মাস পর যখন আমার স্বামী এলেন তখন আমি সন্তান সম্ভবা। শেষের দিকে তাই আর জার্নি করে আমাকে নেওয়া হলো না। আমার স্বামী ছিলেন বেশ কয়েক মাস সেবার। ছেলের মুখ দেখে আমাকে দামি উপহার দিয়েছিলেন। গয়নাগাটিতে আমার খুব একটা শখ নেই। তবু খুশি হয়েছিলাম। উনি জানতে চাইছিলেন
-বল কি চাও?
আমি বললাম
-একবার মাউন্ট ফুজি দেখতে চাই।
উনি হেসে কুটিপাটি। হীরের আংটি পেয়েও তোমার তৃষ্ণা মিটলো না। আবার মাউন্ট ফুজি?
আমি হাসি কিছু বলি না। কার তৃষ্ণা কিসে মেটে-সে বোধহয় সবাই বোঝে না।
আমার স্বামী পিএইচডি শেষ করে ফিরে এলেন। আমার আর জাপান যাওয়া হলো না। ছেলের পর কোল আলো করে মেয়ে এলো। আমি ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। আমার স্বামী তাঁর বাবার ব্যবসায় জয়েন করলেন। তারও অনেক ব্যস্ততা।
ছেলে মেয়ে শ্বশুর-শাশুড়ির যত্ন নিয়ে নিজের দিকে তাকানোর সময় পেতাম না। একান্ত নিজের বলে কিছুই ছিল না। মাঝে মাঝে যখন খুব হাঁপিয়ে উঠতাম, ড্রইংরুমের ছবিটার দিকে তাকিয়ে বিশাল মাউন্ট ফুজিকে দেখে ভাবতাম, কি শান্ত-স্নিগ্ধ সৌন্দর্য। কোনদিন কি দেখতে পাবো?
সেবার ডিসেম্বর এর ফাইনাল পরীক্ষার পর ঠিক হলো সবাই মিলে দার্জিলিং যাব। ভাবলাম যাক মাউন্ট ফুজি না হোক কাঞ্চনজঙ্ঘা তো দেখতে পারি। যাওয়ার কদিন আগে ছেলেটা অসুখে পরল। এত আয়োজন করে সব ঠিক হয়েছে। না গেলে সবার মন খারাপ হবে। তাই যাওয়া হয়েছিল ঠিকই; শুধু আমি আর আমার ছেলে টা বাদে।
আমার সময় কেটে যেত। ব্যস্ততায় নিঃসঙ্গতা টের পেতাম না। তবে বুকের ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগতো। কিসের যেন একটা আকাঙ্ক্ষা; বুঝতাম না।
শশুর-শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর অবশ্য আমি সত্যিই একা হয়ে গেলাম। ততদিনে ছেলেমেয়েরাও বড় হয়ে গেছে। ওদের নিজের জগৎ হয়েছে। সেবার আমি বললাম
-চলো কোথাও থেকে বেরিয়ে আসি।
স্বামী বললেন
-এবছর টা থাক। গাড়ির মডেল চেঞ্জ করবো। খরচ আছে , বোঝো তো।
আমি আর কিছু বলতে পারলাম না।
পরের বছর বাড়ি কেনা হলো; উনি বললেন
-আগামী পাঁচ বছর খুব বুঝে শুনে খরচ করতে হবে।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি। ডুপ্লেক্স বাড়ির সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে বড় ক্লান্ত লাগে। ততদিনে হাঁটুর ব্যথা শুরু হয়েছে। কিছু বলি না। উনার বহু দিনের শখ ডুপ্লেক্স বাড়ি হবে।
ছেলে মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। মেয়ে আমার আমেরিকায়। দিব্যি আছে। মাঝে মাঝে ছবি পাঠায়। আমি দেখি। কত পাহাড়-জঙ্গল সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়। বড় শান্তি পাই দেখে।
সেবার মেয়ে অ্যামেরিকাতে নিয়ে যেতে চাইল। মনে হল ভুল শুনছি বোধহয়। না সত্যিই। মেয়ে আমার সন্তান সম্ভবা। মা হয়ে তার জন্য এটুকু করা তো আমার কর্তব্য। আমি গেলাম। যতদিন ছিলাম সাধ্যমত মেয়ে, নাতনির জন্য করলাম। মেয়েটা আমার খুব চেয়েছিল আমাকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাবে। ছোট বাচ্চা নিয়ে পেরে ওঠেনি। ওর মন খারাপ দেখে বড় কষ্ট হল। বললাম
-থাক না। আমি তো আছি কয়েক মাস।
কিন্তু থাকা হলো না। আমার স্বামী স্ট্রোক করলেন। ফিরে আসতে হলো। এয়ারপোর্ট ছাড়া আমেরিকাতে আর কিছুই দেখা হয়নি।
ফিরে এসে স্বামীর সেবা যত্ন করলাম যতদূর সম্ভব। স্ট্রোক টা মাইল্ড ছিল। উনি সেরে উঠলেন। কিন্তু আমি অসুস্থ হয়ে গেলাম। অযত্নে অযত্নে হাড়ের রোগ বাধিয়ে বসলাম। ডাক্তার অনেক ধরনের বিধিনিষেধ দিলেন। যতদূর সম্ভব চেষ্টা করলাম। আমার যত্ন নেওয়ার তো কেউ নেই।
হাঁপানির টান টা খুব বেড়েছে। সেইসঙ্গে ব্লাড প্রেশারও কনট্রোলে থাকছে না। হঠাৎই শরীরটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। একটু বোধ হয় বেশিই খারাপ। তা না হলে তো আর মেয়ে আমেরিকা থেকে ছুটে আসতো না। আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল। ছেলেমেয়েরা চারদিক থেকে ঘিরে আছে। আমি শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখি। কিছু বুঝতে পারি না। মেয়েটা আমার বড় কাঁদছে। অস্পষ্ট শুনি
-মা, মাগো। আমি তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব। আর তোমার কোন অযত্ন হবে না।
আমি হাসার চেষ্টা করি। হাসিটা বোধ হয় ফোটে না। মেয়েটা ডুকরে কেঁদে ওঠে। হঠাৎই ভেতরটা বড় শূন্য লাগে। চোখ বুজে আসে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল মাউন্ট ফুজি। কি স্নিগ্ধ, শান্ত সৌন্দর্য বাইরে থেকে; অথচ ভেতরে তার দগদগেঘা।