07/10/2022
ধনাঢ্য চর্চা থেকে বারো ইয়ার হয়ে সার্বজনীন দুর্গা মা
শারদীয় দুর্গাপূজার ধর্মীয় তাৎপর্যতা অথবা পূজার প্রারম্ভিক ইতিহাস নিয়ে অনেক জ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ অনেক কিছু লিখেছেন আমাদের জন্য। তাদের লেখা থেকে সামান্য কিছু পড়ে যা জানতে পারি তা থেকেই আমার মত করেই আমি কিছু বলার চেষ্টা করছি। শরৎ কালে শারদা মায়ের আগমনে হিন্দু ধর্মাবলম্বী জনগণ এই ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে আসছে শত শত বৎসর আগে থেকেই। প্রথম দিকে এই উৎসব টা ছিল শুধুই ধর্মীয় এবং তৎকালীন কুলীন সমাজের বিত্ত, প্রভাব আর কৌলিন্য প্রকাশের অন্যতম বাহক। তখন শারদীয়ায় সর্ব শ্রেণির অংশগ্রহন ও সামাজিক , সাংস্কৃতিক উৎসবের আধুনিক রূপ ছিল অচিন্তনীয়। তখনকার সময়ের রাজা, জমিদার সমাজ তাদের সামাজিক প্রতিপত্তি ও আর্থিক বৈভবের প্রতিযোগিতায় মত্ত থেকে সবার দুর্গা মা কে শুধুই নিজেদের করার অপচেষ্টা খুব বেশি দিন ধরে রাখতে পারেন নি। ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারো জন ব্রাহ্মণ বন্ধু মিলে দুর্গা পূজা করার মনস্থ করেন। এই বারো ইয়ার ( বন্ধু) থেকেই বারোয়ারী পূজার উৎপত্তি। এই প্রচেষ্টা থেকেই মা কে নিয়ে ধনীক শ্রেনীর দুর্গা পূজা নিয়ে কুলীনত্ব আস্তে আস্তে বিলীন হতে থাকে। ধর্মীয় উৎসবের উঠানে জায়গা হতে শুরু করে সর্বসাধারণের। দুর্গা পূজার আত্মীক রং হয়ে যায় আরো বর্ণীল। রাজা জমিদারের মন্ডপ থেকে দাম্ভিকতার দেয়াল ধ্বসে পরে সর্বসাধারণের পূজা অর্চনার উলুধ্বনিতে। এভাবে আস্তে আস্তে দুর্গা পূজার প্রসার পেতে থাকে এলাকা থেকে এলাকায়, নিজস্ব মন্ডপ থেকে উন্মুক্ত অস্থায়ী মন্ডপে। ধর্মীয় আচার থেকে ভূমিষ্ঠ হতে থাকে সার্বজনীনতা, সামাজিকতা ও অসাম্প্রদায়িকতার দেবশিশু।
সব ধর্মের মূল বাণী মানুষের কল্যান, সম্প্রীতি, সহাবস্থান, শান্তি, মানবিকতা। আচার ও রীতির ভিন্নতা থাকবে, বিশ্বাসের প্রকৃতি ও অভিন্ন হবে না। কিন্তু লক্ষ্য ও সারমর্ম এক ই।মুসলিম ভাইরা ঈদে নামাজ পড়বে, আমি সঞ্জীব ঈদের আনন্দে তার সাথে কোলাকুলি করব, এক সাথে সেমাই খাব। পূজায় হিন্দুরা তার আচার করবে, উলুধ্বনি দেবে, আমার অন্য ধর্ম বিশ্বাসী ভাই বোনেরা পূজার নাড়ু সন্দেশ খেয়ে আমাদের সাথে আনন্দে মেতে উঠবে। এতে বিশ্বাসে আঁচড় লাগার কোন সুযোগ নেই। এই অসাম্প্রদায়িকতাই ঈদ , পূজা, বৌদ্ধ পূর্নিমা , বড়দিনের প্রতিপাদ্য। ধর্মীয় উৎসব কে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকতা মিলিয়ে এক সুতায় না বাঁধতে পারলে, এটা আর যাই হোক শুদ্ধ ধর্মীয় আচরণ হতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না। সার্বজনীনতা, সামাজিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা, শ্রেণি বৈষম্যতা মুক্ত, সাংস্কৃতিকতা ছাড়া কোন কিছুই আর যাই হোক উৎসব হতে পারে না, হলেও তা কখন ও মানুষের জন্য কল্যাণকর হওয়ার সুযোগ নেই। এখানে ধর্ম বিশ্বাসের পার্থক্যকে প্রধান উপপাদ্য করাটা শুধুই ধর্মান্ধতাকে পুজি করে একটা রাজনৈতিক অস্ত্র। যেই অস্ত্রের আঘাতে রক্তাক্ত হয়েছে আদি ভারতবর্ষ। যা সেই সময়ের কুলীন আর ব্রিটিশদের কৌশলের ফসল। আম জনতার এতে মোটেও ছিল না কোন সম্পৃক্ততা। আমার বাবার অপারেশনের সময় রক্ত দিয়ে জীবন বাঁচিয়েছিল রাহাত ফেরদৌস নামের এক মানুষ, ধর্ম বিশ্বাসে যে মুসলিম। রক্ত কিন্তু ধর্মের পরিচয় জানতে চায় নি। গিরিশ চন্দ্র সেনের বাংলায় অনুদিত পবিত্র কোরান পড়তেও কোন মুসলিমের ধর্ম বিশ্বাস কমে নি, গিরিশ বাবুর ধর্ম বিশ্বাসে ও কমতি পরেনি। এখন ও আমার মত অনেকেই রোজদার মানুষদের সাথে একসাথে ইফতারি করার চর্চাটাকে শানিয়ে রাখতে ভুলি না। প্রবাস কালীন সময় আমার সাথের যারা থাকত তাদের সিয়াম সাধনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমি ও না খেয়ে ( রোজা বলছি না ইচ্ছে করেই) থেকেছি। তাতে করে আমার জীবন ও ধর্মীয় বিশ্বাসের কোন বিচ্যুতি তো হয়নি, বরং আমাদের সহাবস্থান ও ভাতৃত্ব হয়েছে আরো গভীর। রাজনৈতিক দুষ্টাচারের কারনে এদেশে বহু মন্দিরে অনেক মুসলিম ভাইয়েরা পাহারা দেয় যাতে কেউ অপ্রীতিকর কিছু করতে না পারে। এখন ও আমার বাসার মত অনেক বাসায় রোজায় অন্যধর্মাবলম্বী ঘরের সাহায্যকারী মেয়েদের জন্য তৈরি করা হয় ইফাতার, তারপর আয়োজন করে একসাথে চলে ইফতারি। আমার বন্ধুরা ঈদের দিন রান্না করে আমাদের বাসার জন্য পাঠাতে ভুলে না কখন ও। পূজা মন্ডপে যত মানুষের শ্রোত তা শুধুই কি সনাতনী ধর্মাবলম্বী মানুষের? এই স্রোতে আছে অন্যান্য ধর্ম বিশ্বাসী হাজার হাজার আমাদের ভাই বোন। সৈরাচার পতনের কিছু দিন আগে এদেশে রাজনৈতিক ভাবে সংখ্যালঘুদের উপর কিছুটা নিপীড়নের অপচেষ্টা চালিয়ে অস্থিরতা করা হয়েছিল। আমাদের বাসায় আমার অসুস্থ মাসি ছিলেন। রাতের বেলা মাসি অনেক অসুস্থ হয়ে গেলে আমার মাসতুতো বোন ভয়ে চিৎকার করে উঠে। প্রতিবেশিরা ভেবছিলেন কোন সাম্প্রদায়িক অপচেষ্টা। সেই গভীর রাতে আশে পাশের সব বাসা থেকে যার কাছে যা ছিল তা নিয়ে সবাই ছুটে এসে আমাদের বাসা চারদিকে ঘেরাও করে রাখে, আমাদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য। যারা এসেছিলেন তাদের একজন ও হিন্দু না। আমাদের প্রতি তাদের ভালবাসা হিন্দু মুসলিম চিনে না, চিনে শুধু প্রতিবেশি আর মানুষ হিসাবে, এটাই সত্যিকারের ধর্ম শিক্ষা বা চর্চা। আমার বাবা চাকরির সময় ময়মনসিংহের গফরগাঁও ছিলেন কিছু দিন। আমি বেড়াতে গিয়ে সেই এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবের সাথে গল্প করেছিলাম। ইমাম সাহেব বললেন যে আমার বাবা যদি এই মসজিদের ইমাম হতেন তাহলে মুসল্লিরা আরো ভাল শিখতে পারত। সেই ইমাম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব বেশি শিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু জ্ঞান আর প্রজ্ঞায় তার কাছে আমরা অনেকেই নস্যি, ধর্ম বিশ্বাস আর ধারনে ও তার ধারে কাছেও নেই হয়ত অনেকে। বিখ্যাত দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছিলেন " আমি তোমার কথার সাথে বিন্দুমাত্র একমত না হতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য আমি জীবন দেব"। ধর্ম চর্চা, ধর্মের আচার ও পালন যার যার ন্যায্য অধিকার। শাহ আব্দুল করিম ও তার গানে বলে গিয়েছেন " গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান মিলিয়া বাংলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম"। এখানেও আছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মের মেলবন্ধন। কাজী নজরুল তার সাম্যবাদী কবিতায় বলেছেন " গাহি সাম্যের গান
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাঁধা-ব্যবধান
যেখানে মিশেছে হিন্দু - বৌদ্ধ - মুসলিম - ক্রীশ্চান "। সাম্যের প্রতীক কাজী নজরুল সে কারনের সবচেয়ে বড় মন্দির আর কাবা খুঁজে পেয়েছেন মানুষের অন্তরে। ভলতেয়ার থেকে, নজরুল, নজরুল থেকে শাহ আব্দুল করিম , গংগা থেকে পদ্মা , সব মত, সব স্রোত কিন্তু অধিকার, সহাবস্থান, সহমর্মিতার শ্লোগানে মুখরিত। আর এই কারনেই নানা ধর্মীয় পার্বন যার যার বিশ্বাস কে ধারন করে হয়ে পেয়েছে এক বিশাল সার্বজননীতা।
বাপ্পি, মুন্না, দুলাল, বাহার, মারুফ, মৃধা, শামিম, পিন্টু, ইব্রাহিম, চঞ্চল, নুরুদ্দিন, ইরশাদ, রিপন, বকুল, কায়সার, ফেরদৌসী , বাবুল, শিল্পি সহ অগনিত বন্ধুদের সাথে আমার পথ চলা। ধর্ম বিশ্বাসে কেউ সনাতনী নয়, কিন্তু জীবন চলার পথে কখনও এদের কারনে আমায় নি:স্ব তো মনেই হয় নি, বরং বুক উচিয়ে বলতে পারি এই দেশ আমার দেশ। সূর্য সেন, প্রীতিলতার বিপ্লব কিন্তু শুধুই হিন্দুদের স্বাধীনতার জন্য ছিল না, তারামন বিবি আর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীদের যুদ্ধ ও কিন্তু শুধু মুসলিমদের স্বাধীনতার জন্য ছিল না। আমরা আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এই ভাব ও ভাবনাকে ধারন করে জীবনকে করে তুলতে পারি আরো আনন্দময় ও শান্তির। রাজনৈতিক কারনে অষ্টম সংশোধনী এনে সংবিধানের কাগজে কিছু কাটা ছেড়া করা হলেও মানুষের মনের সংবিধানে আঁচর কাটতে পারে নি মোটেও। শারদা মায়ের আগমনে মৃত্যু ঘটুক সব অশুভ শক্তির, অসুরীয় অপশক্তি নিপাত যাক ঢাক, ঢোল আর উলুধ্বনির আওয়াজে। ধর্ম , বর্ণ, শ্রেণি ভুলে বরন করে নেই দেবী মাকে। সব ধর্মের তীর্থবাস এই বাংলাদেশ মেতে উঠুক শারদীয় উৎসবে। সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা। ভাল থাকুক আমাদের বাংলাদেশ।
পুনশ্চঃ আমার মেয়ের জন্মদিনের কোন আনুষ্ঠানিকতা করা হয় নি এই বছর। মেধার জন্য শুভ কামনা। মেধা সংগত কারনেই আমার উপর ক্ষুব্ধ। আমায় ক্ষমা করো মেধা। আজকের বাসার মিলন মেলা টা আমার বাবার ইচ্ছা পূরনের একটা প্রয়াস মাত্র। আমাদের পরিবারের মানচিত্র টা দুইদিন পর থেকে একটু হলেও বদলে যাবে। বাস্তবতা আর আবেগের সংঘাতে আমরা পারিবারিক ভাবে একটু বিপর্যস্ত। কষ্ট আর যন্ত্রণার সুস্পষ্ট বলিরেখাকে মুছে ফেলার সাধ্য আমার নেই। আমার বাবা মায়ের জন্য সবাই আশীর্বাদ করবেন।
Sanjib kumar dey