12/07/2020
জিলবাব পরে ভার্সিটি যাওয়ার দিন টা এতো সহজ ছিল না। সেদিনের সেই দিনটা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে।
কেও আমাকে দেখে প্রশ্ন করেছিল, কালো ভূতের মতন এটা কি পরেছিস? কেও জিজ্ঞেস করেছিল, হঠাৎ এটা পরেছিস কেন?
কেও বলেছিল, আমি নাকি নতুন ডিস্কো হুজুর হয়ে গিয়েছি। আমার নাকি বিয়ে হয়ে গেছে তাই আমি এসব পরেছি। আমাকে নাকি বাসা থেকে জোরজবরদস্তি করে এই পোশাক পরানো হয়েছে। আমাকে বলা হয়েছিল, ঘোমটার নিচে শয়তানি করতে এসব পরেছি আমি। আমি খারাপ কাজ করার সুবিধার জন্য এসব পরেছি৷ অথচ আলহামদুলিল্লাহ আমি এর আগেও হিজাব পরতাম বাহিরে সবসময়। আমার অনেক বান্ধবি আমাকে বলছিল, আমি নাকি এক্সট্রিম করে ফেলছি ধর্মকে। ধর্ম এতো কঠিন নয় যেমন আমরা তথাকথিত সেকেলে রা একে বানাচ্ছি। বহু কথা একদম অন্তরে বিঁধে যাচ্ছিল কাটার মতন। এই কথার আঘাত আমাকে মারার চেয়ে তীব্র ছিল। এই কথা আমাকে মুহূর্তেই আমার জায়গা থেকে পথচ্যুত করতে চেয়েছিল। হ্যা, এই কথা গুলো আমাকে কাঁদিয়েছে বহুবার। তবে এই কান্নার প্রতিটি ফোঁটা ছিল আমার আর আমার রবের মধ্যে। নিকাবের মধ্যের সেই কান্না কেও বুঝেনি হয়তো। নয়তো কেও বুঝেছে কিছুটা। সেই কাঁপা কাঁপা কন্ঠ কেও হয়তো তেমন শুনেনি। আমার আল্লাহকে বলেছিলাম, "ও আল্লাহ! আমাকে এই পথে অটল রেখো তুমি ইন শা আল্লাহ। "
আচ্ছা বিয়ের পরেই কেন পর্দা করতে হবে? আমরা অনেকেই ভাবি বিয়ের পরে শুরু করব। একটা সময় আমিও ভেবেছিলাম এমন। যৌবনের এই সময়টুকুতে আল্লাহর হুকুম না মেনে চলে কত গুনাহগার না জানি হচ্ছি আমরা!! বয়স হলে আমরা ভাল হতে শুরু করি, অথচ যৌবনটা আল্লাহর সন্তুষ্টির রাস্তায় কাজে লাগানোর কথা ছিল আমাদের। আপনি বিয়ের পরে দ্বীনি কাউকে পাবেন কিনা কে জানে! কিংবা আপনার বেদ্বীন হওয়ার চ্যান্স থাকবেনা এটার কতটা গ্যারান্টি?! আর বিয়ের আগের করা গুনাহ এর জন্য তওবা করার সুযোগ হবে কি? আমার মৃত্যু বিয়ের আগে কিংবা যৌবনে যে হবেনা এমন কোনো কথা আছে কি?
জিলবাব পরার সেই প্রথমদিন রীতিমতো আমাকে পুরোনো কথা মনে করিয়ে খোঁচা দেওয়া হয়েছিল অনেকবার। আমার আশেপাশের কাউকে গানবাজনায় দেখলে মানা করতাম ভয়ে ভয়ে। কথা শুনার ভয়ে একদম জোর গলায় বলতে পারতাম না; তবুও আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব মানতে গিয়ে তাদের ভালো কাজের আদেশ দিতাম। এর বিনিময়ে পেতাম হুজুর ট্যাগ, বলতো বেশি বুঝিস। কিংবা কখনো বলত আগে নিজেই গানটান গাইতো আর এখন আসছে হুজুর হয়ে আমাদের বুঝাতে! তাদের কথা শুনতাম, "এসব ভন্ডামি কত দেখেছি, এসব লোকদেখানো কত মানুষ দেখলাম।"
সেই জাহেলিয়াত এর জগতের মানুষ থেকে কিছুটা সরে আসা কষ্টকর ছিল। তাদের গানবাজনার আসর কখনো আমাকে টানতে চাইতো তাদের কাছে, তবু মনকে বাধা রেখেছি একমাত্র আল্লাহর জন্য। কখনো ফ্রি মিক্সিং ডাকতো আমায় পথভ্রষ্ট করতে, আমি আঁটকে রয়ে গেছি এক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। ভুল পথ ডেকেছে, শয়তান ওয়াসওয়াসা দিয়েছে তবু আল্লাহর ভয় আমাকে এই পথে অটল রেখেছে। আমি একা চলতে শিখেছি তবে আল্লাহ আমাকে তার নিকটেই নিতে চেয়েছিলেন বোধহয় একাকীত্বের মাধ্যমে।
মানুষের কথায় আমি ভেঙে পড়তাম। আমি আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতাম যেন লোকদেখানো ইবাদত আমাকে ধ্বংস করে না দিতে পারে। শয়তানের ওয়াসওয়াসার থেকে সাহায্য চাইতাম।
লোকের সন্তুষ্টির জন্য জীবনে কতকিছুই তো করেছিলাম, পারলে বোধহয় কিছু মানুষকে এই কলিজাও দিয়ে হলেও সন্তুষ্ট করতে চাইতাম। দিনশেষে লোকের সন্তুষ্টি তো মিললো না। বরং এতটুকু ভুলে দূরত্ব বাড়িয়ে দেওয়া হতো, অপমান করা হতো। এই হলো আমাদের প্রিয় মানুষ!! আমরা এদের সন্তুষ্টির জন্য রবের বহু দূরে চলে যাই। তবুও অসন্তোষ এদের কমাতে পারিনা।
আমার রব আমায় বলেন, "আমি জানি যে আপনি তাদের কথাবর্তায় হতোদ্যম হয়ে পড়েন।
অতএব আপনি পালনকর্তার সৌন্দর্য স্মরণ করুন এবং সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যান। (সূরা হিজর ৯৭,৯৮)
হেদায়েতের পথ এক নতুন যুদ্ধ যেখানে শয়তান মনে বারবার ঢুকাতে চায় বহু কুমন্ত্রণা৷ হেদায়েত পাওয়ার চেয়ে ধরে রাখা বেশ কষ্টের।
লোকের কথায় পিছিয়ে যাবেন না আর। আপনার কবরের হিসাব লোক দিবে না ;আপনাকেই দিতে হবে। হাশরের ময়দানে আপনার কাজের জন্য আল্লাহর মুখোমুখি আপনিই হবেন, তারা নন। দিনশেষে লোকেদের কাছে আপনি প্রিয় হতে পারবেন কিনা সন্দেহ আছে; কিন্তু আল্লাহ তার সেইসব বান্দাকে ভালবাসেন যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এক পা হলেও আগায়। মৃত্যুর কয়েকদিন পরেই এই লোকেরাই লাশ বলে আপনাকে ভুলে যাবে। আল্লাহ কি বলবে এটাই ভাবার সময় এখন। পুরোনো সেই ভাবনা কে ঝেড়ে ফেলে দিন আজই, রবের নিকট আমাদের প্রত্যাবর্তন হোক আজই। হে রব, আমাকে কবুল করে নিন আপনার তাওবার দরজায় হাত তুলেছি আজ আমি।
>~~লিখেছেন~কামরুননাহার মীম
(আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন)