15/08/2026
বন্ধু বেছে নেওয়া কি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ? কুরআন বলছে—হ্যাঁ, কারণ একজন বন্ধু আপনার আখিরাত পর্যন্ত প্রভাবিত করতে পারে।
একটু নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোর কথা ভাবুন। যাদের সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলেন, যাদের সঙ্গে বসলে সময় দ্রুত চলে যায়, যাদের কথাকে আপনি গুরুত্ব দেন। তাদের সঙ্গে থাকার পর আপনার ভেতরে কী বাড়ে? ভালো কাজের আগ্রহ, সালাতের গুরুত্ব, সত্য কথা বলার সাহস—নাকি গীবত, অশ্লীলতা, অহংকার, হারামকে হালকা মনে করা আর সময় নষ্ট করার অভ্যাস?
বন্ধুত্বের প্রভাব সাধারণত একদিনে বোঝা যায় না। প্রথমে আপনি শুধু শুনলেন। পরে হাসলেন। তারপর একদিন নিজেও একই কথা বলতে শুরু করলেন। যে কাজটা আগে ভুল মনে হতো, কিছুদিন পর সেটাই স্বাভাবিক লাগতে শুরু করল।
এই কারণেই কুরআনে বন্ধুত্বকে খুব হালকাভাবে দেখা হয়নি।
আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনের এক ভয়ংকর অনুশোচনার কথা বলেছেন:
“হায়! আমি যদি অমুককে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করতাম! আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে আমাকে তা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল।”
— সূরা আল-ফুরকান, ২৫:২৭–২৯
একটু আয়াতটার জায়গায় নিজেকে বসান।
কিয়ামতের দিন একজন মানুষ আফসোস করবে যে সে এমন কাউকে নিজের খুব কাছে এনেছিল, যার প্রভাবে আল্লাহর স্মরণ ও সত্যের পথ থেকে দূরে চলে গিয়েছিল।
তাহলে বন্ধুত্বের আসল প্রশ্ন শুধু এটা নয়, “ওর সঙ্গে আমার খুব ভালো লাগে কি না?”
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—
“এই মানুষটার সঙ্গে থাকতে থাকতে আমি কেমন মানুষ হয়ে যাচ্ছি?”
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“মানুষ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকে যেন দেখে, সে কাকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করছে।”
— সুনান আবু দাউদ, ৪৮৩৩; জামে আত-তিরমিযি, ২৩৭৮
এর মানে এই নয় যে বন্ধুর সব অভ্যাস হুবহু আপনার মধ্যে চলে আসবে। কিন্তু যাকে আপনি খুব কাছে রাখেন, তার চিন্তা, ভাষা, মূল্যবোধ এবং কোন বিষয়কে সে স্বাভাবিক মনে করে—এসব ধীরে ধীরে আপনাকেও প্রভাবিত করে।
ধরুন, আপনার বন্ধুমহলে আযান হলে কেউ বলে, “চলো আগে সালাত পড়ে আসি।” কিছুদিন পর আপনার কাছেও আযানের সময় উঠে দাঁড়ানো স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আবার যদি এমন circle হয় যেখানে সালাত পিছিয়ে দেওয়া, গীবত করা, হারাম relationship নিয়ে হাসাহাসি করা বা অশ্লীল content নিয়ে কথা বলা খুব সাধারণ—তাহলে প্রথমদিকে অস্বস্তি হলেও একসময় বিবেকের সেই অস্বস্তিটাই কমে যেতে পারে।
সঙ্গ মানুষের ভুলকে শুধু বাড়ায় না, কখনো ভুলের সংজ্ঞাটাই বদলে দেয়।
তাই আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
“যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের রবকে ডাকে, তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে, তাদের সঙ্গে নিজেকে ধৈর্যের সঙ্গে রাখুন।”
— সূরা আল-কাহফ, ১৮:২৮
একই আয়াতে এমন ব্যক্তির অনুসরণ থেকে সতর্ক করা হয়েছে, যার হৃদয় আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল এবং যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে।
আবার আল্লাহ বলেন,
“আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।”
— সূরা আত-তাওবা, ৯:১১৯
তাহলে কেমন মানুষকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে বেছে নেবেন?
প্রথমত, যে আল্লাহর দ্বীন ও বিধানকে তুচ্ছ করে না। সে নিখুঁত মানুষ নাও হতে পারে। তার নিজেরও ভুল থাকবে, দুর্বলতা থাকবে। কিন্তু সে ভুলকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করবে না। আপনি ভালো হতে চাইলে আপনাকে নিয়ে ঠাট্টা করবে না। সালাত ঠিক করতে চাইলে বলবে না, “এত ধার্মিক হওয়ার কী দরকার?”
দ্বিতীয়ত, যে আপনার ভুলকে প্রশ্রয় দেওয়াকেই বন্ধুত্ব মনে করে না। আমরা অনেক সময় এমন বন্ধুকে বেশি পছন্দ করি যে সব সিদ্ধান্তে বলে, “তুই যা করিস ঠিক করিস।” কিন্তু সত্যিকারের বন্ধু কখনো এমন কথাও বলে যা শুনতে ভালো লাগে না। কারণ সে শুধু আজ আপনাকে খুশি রাখতে চায় না, আপনার ক্ষতি হোক সেটাও চায় না।
তৃতীয়ত, যার কাছে আপনার সম্মান ও গোপন বিষয় নিরাপদ। আপনার দুর্বলতা জেনে অন্যের কাছে গল্প করে না, আপনার ব্যক্তিগত বিষয়কে entertainment বানায় না। ভুল ধরিয়ে দিতে হলে একান্তে বলে, মানুষের সামনে অপমান করে নয়।
চতুর্থত, যার সঙ্গে থাকার পর আপনি একটু ভালো মানুষ হয়ে ফেরেন। আপনার ভেতরে কি মানুষের প্রতি দয়া বাড়ে? নিজের ভুল নিয়ে ভাবতে শিখেন? সময়ের মূল্য বুঝতে পারেন? আল্লাহকে একটু বেশি মনে পড়ে? বন্ধুত্বের মান শুধু একসঙ্গে কত হাসলেন তা দিয়ে মাপবেন না; সেই সময় কাটানোর পর আপনার চরিত্র কোন দিকে যাচ্ছে সেটাও দেখুন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ভালো ও খারাপ সঙ্গীর একটি অসাধারণ উদাহরণ দিয়েছেন। ভালো সঙ্গীকে তিনি সুগন্ধি বিক্রেতার সঙ্গে এবং খারাপ সঙ্গীকে কামারের হাপরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সুগন্ধি বিক্রেতার কাছে গেলে কিছু না কিনলেও সুন্দর গন্ধ পাওয়া যায়, আর কামারের কাছে গেলে আগুনে কাপড় পুড়তে পারে অথবা অন্তত দুর্গন্ধ লাগে।
— সহিহ আল-বুখারি, ২১০১; সহিহ মুসলিম, ২৬২৮
বন্ধুত্বও অনেকটা এমন। কিছু মানুষ আপনার জীবনে এসে আপনাকে সরাসরি কোনো নসিহত না করেও ভালো করে দেয়। তাদের সততা, সালাত, ভাষা, বিনয় দেখে নিজের ভেতর পরিবর্তনের ইচ্ছা জাগে। আবার কিছু মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন থাকতে থাকতে আপনি এমন কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে যান, যা একসময় নিজের কাছেই অস্বস্তিকর ছিল।
তবে এখানে ভারসাম্যও জরুরি।
ভালো বন্ধু মানে নিষ্পাপ বন্ধু নয়। আপনি যেমন ভুল করেন, আপনার বন্ধুও করবে। তাই কারও একটি ভুল দেখেই সম্পর্ক ছিন্ন করে দিতে হবে—এটা এই আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। বরং দেখুন তার জীবনের দিক কোনদিকে। ভুল করলে সে ফিরে আসতে চায়, নাকি ভুলটাকেই normal বানিয়ে দেয়? আপনাকে ভালো হতে সাহায্য করে, নাকি ভালো হওয়ার চেষ্টাকে দুর্বল করে?
আর সৎ সঙ্গ বেছে নেওয়া মানে অন্যদের সঙ্গে রূঢ় বা অন্যায় আচরণ করা নয়। যারা দ্বীনের কারণে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা নিপীড়ন করে না, তাদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে কুরআন নিষেধ করেনি; বরং ন্যায় ও সদাচরণের শিক্ষা দিয়েছে।
— সূরা আল-মুমতাহিনা, ৬০:৮
এখানে কথা হচ্ছে আপনার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ circle নিয়ে—যাদের কথার ওজন আপনার সিদ্ধান্তে পড়ে, যাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে আপনার চিন্তার ধরন বদলে যায়।
হয়তো এখন আপনার মাথায় নির্দিষ্ট একজনের নাম চলে এসেছে।
আপনি তাকে খুব ভালোবাসেন। অনেক বছরের বন্ধুত্ব। খারাপ সময়েও পাশে ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে আপনি জানেন, তার সঙ্গে থাকলে বারবার এমন কিছু করেন যা পরে নিজের কাছেই ভালো লাগে না।
এক্ষেত্রে প্রথম কাজ সবসময় সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া নয়। সম্ভব হলে ভালো দিকে ডাকুন। নিজের সীমা পরিষ্কার করুন। যে পরিবেশে গুনাহ হয়, সেটাকে এড়িয়ে চলুন। কিন্তু যদি কোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বারবার আপনার ঈমান, সালাত, চরিত্র বা পবিত্রতাকে দুর্বল করে এবং আপনি নিজেকে রক্ষা করতে পারছেন না, তাহলে কিছু দূরত্ব তৈরি করার প্রয়োজন হতে পারে।
কারণ কিছু সম্পর্ক পৃথিবীতে হারালে কষ্ট হয়।
কিন্তু এমন কোনো সম্পর্ক ধরে রাখা আরও বড় কষ্টের কারণ হতে পারে, যার জন্য একদিন বলতে হয়—
“হায়! আমি যদি তাকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু না বানাতাম।”
আর কুরআন বন্ধুত্বের আরেকটি ছবিও দেখিয়েছে:
“সেদিন ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা একে অপরের শত্রু হবে, মুত্তাকিরা ছাড়া।”
— সূরা আয-যুখরুফ, ৪৩:৬৭
ভাবুন, কী সুন্দর সেই বন্ধুত্ব—যেখানে দুজন শুধু একসঙ্গে হাসেনি, ঘুরেনি, গল্প করেনি; বরং একজন আরেকজনকে এমনভাবে বাঁচতে সাহায্য করেছে যে কিয়ামতের দিন তাদের বন্ধুত্ব অনুশোচনার কারণ হবে না।
আর শেষ প্রশ্নটা বন্ধুকে নিয়ে নয়।
আপনাকে নিয়ে।
আপনি অন্য মানুষের জন্য কেমন বন্ধু? আপনার সঙ্গে থাকলে সে আল্লাহর কথা বেশি মনে করে, নাকি ভুলে যায়? সে ভালো হতে চাইলে আপনি তাকে উৎসাহ দেন, নাকি হাসাহাসি করেন? তার গোপন বিষয় আপনার কাছে নিরাপদ? সে ভুল করলে তাকে মানুষের সামনে ছোট করেন, নাকি একান্তে ধরে ফিরিয়ে আনেন?
আমরা সবাই জীবনে ভালো বন্ধু চাই।
কিন্তু হয়তো আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো—কারও জীবনে সেই ভালো বন্ধুটি আমি নিজে হব।
আল্লাহ আমাদের এমন সঙ্গ দান করুন যারা আমাদের ঈমান, চরিত্র ও আমলকে সুন্দর করবে। ক্ষতিকর সঙ্গের প্রভাব থেকে হেফাজত করুন এবং আমাদেরও এমন বন্ধু বানান, যার কারণে কোনো মানুষ কিয়ামতের দিন আফসোস করবে না।