29/10/2022
যে বাড়িতে তাঁর জন্ম, সেখানে ছিল না কোনো দেয়াল। ছায়া সুনিবিড় এক বাড়িতে বেড়ে ওঠা। ধানমন্ডি লেকের বন্য পরিবেশ যাঁকে কাছে টানত, তিনি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষায় থাকেন অগ্রভাগে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও সেই লড়াইয়ের সঙ্গে অঙ্গীভূত, যেখানে ছয় দিনের শিশুকে নিয়েও তিনি আদালতে দাঁড়িয়েছেন। সেই লড়াকু জীবন নিয়ে লিখেছেন হিল্লোল চৌধুরী
'আমার কাছে সত্য অনেক বেশি শক্তিশালী। মিথ্যার আওয়াজ অনেক জোরে বাজে; কিন্তু সত্যের শক্তিকে সে অস্বীকার করতে পারে না। আমি যে লড়াই করি, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে তো হেরে যাওয়ার ভয়ে সেটুকুও করেন না। হেরে যাওয়ার ভয় না করে, সত্যের ওপর ভরসা রেখে যদি আমি লড়াইটা করে যাই, তাহলে আরও অনেককে লড়াই করতে দেখি- আমার কাছে এটা অনেক বড় প্রতিশ্রুতির জায়গা মনে হয়। বিশ্বব্যাপী মিথ্যার একটা প্রচার-প্রচারণা ও নিয়ন্ত্রণ চলছে। কিন্তু মিথ্যা কখনোই শান্তিতে থাকবে না। সে জানে, একটা সময়ে সত্য তার ওপর জিতে যাবে।'
জীবন সম্পর্কে এমনই উপলব্ধি বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের। পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষায় বরাবরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। আইনি লড়াইকে অ্যাক্টিভিজমে রূপ দিয়ে গড়েছেন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পেয়েছেন বহু দেশি-বিদেশি পুরস্কার ও সম্মাননা। ২০০৯ সালে টাইম সাময়িকীর 'হিরোজ অব এনভায়রনমেন্ট' খেতাবপ্রাপ্ত এ আইনজীবী ও পরিবেশকর্মী ২০১২ সালে র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার পান। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক নারী সাহসিকা (ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ) পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এসব পুরস্কার তাঁকে আরও বেশি নিবেদিত হয়ে মানুষ ও প্রকৃতির পক্ষে লড়াইয়ে তৎপর করেছে।
প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের আগ্রহের শুরু 'বেলা'য় যুক্ত হওয়ার পর। এ ক্ষেত্রে তাঁর দেখা প্রকৃতিঘেঁষা ঢাকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আমরা যখন বেড়ে উঠেছি, তখনকার ঢাকা এমন মেগা সিটি ছিল না। তখন ঢাকায় অনেক গাছ ছিল, পুকুর ছিল, লেক ছিল, পার্ক ছিল। সেটা খুব একটা কঠিন শহুরে আবহে ছিল না। প্রকৃতির অনেক সান্নিধ্য পেয়েছি। কিন্তু যখন আমি বেলায় জয়েন করি তখন বিভিন্ন কাজে মাঠে যেতাম। দু-তিন বছর বেলায় কাজ করার মধ্য দিয়ে প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষায় নিজের ভেতর এক ধরনের তাগিদ অনুভব করি। মানুষের সান্নিধ্যে, মানুষের জন্য যখন কাজ করলাম তখন মনে হলো, আমি এই ওকালতিটাই করতে চাই।'
রিজওয়ানা হাসান স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'আমার বেড়ে ওঠা ধানমন্ডিতে। সে সময় ধানমন্ডির বাড়িগুলোয় অনেক গাছ ছিল। প্রত্যেকের বাড়ির সামনে বাগান ছিল। আমাদের বাড়ির সঙ্গে পাশের বাড়ির কোনো দেয়াল পর্যন্ত ছিল না। গাছ দিয়ে একটা সীমানা ছিল। এখনকার ঢাকা শহরে তো বাগান বলতে তেমন কিছু নেই। এখনকার ধানমন্ডি লেকে অনেক সংস্কার করা হয়েছে। তবে আমি ধানমন্ডি লেকের সেই বন্য প্রকৃতিটা
মিস করি।'
'বেলা' বাংলাদেশের অন্যতম বেসরকারি অলাভজনক আইনজীবী সংগঠন। আইনজীবী মহিউদ্দিন ফারুক ১৯৯৩ সালে বেলা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনিই শুরু থেকে এর প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী প্রধান ছিলেন। ১৯৯৭ সালে মহিউদ্দিন ফারুকের মৃত্যুতে বেলার কার্যক্রম থমকে যাওয়ার উপক্রম হলে এর দায়িত্বভার বর্তায় সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের ওপর। তাঁর নেতৃত্বে বেলার পুনর্জাগরণ ঘটে। ২০০৩ সালে জাতিসংঘের এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম ঘোষিত গ্লোবাল ৫০০ রোল অব অনার পুরস্কারে ভূষিত হয়। ২০০৭ সালে বেলা বাংলাদেশ সরকারের 'পরিবেশ পুরস্কার' লাভ করে।
এ সংগঠনে যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও এক রকম কাকতালীয়। রিজওয়ানা হাসান বলেন, 'ধানমন্ডিতে আমার বাবার বাড়িতে বেলার অফিস ভাড়া নিতে এসেছিলেন মহিউদ্দিন ফারুক। কোনো কারণে সেখানে তিনি অফিস ভাড়া নেননি। তবে তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। তিনি বললেন, আপনি তাহলে বেলায় জয়েন করেন না কেন? আমাদের তো নতুন অনেক আইনজীবী লাগবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের ওখানে কি গবেষণার সুযোগ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আছে। আমি তখন খুশি মনে বললাম, তাহলে আমি সেখানে জয়েন করতে চাই। কারণ আমার কিছু প্রকাশনা থাকলে আমি উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে পারব। তবে বাস্তবতা এমন হলো, আমার আর উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া হয়নি।'
বেলার কাজের ধরন সম্পর্কে রিজওয়ানা হাসান বলেন, 'আমরা যে ওকালতিটা করি, সেটা একটা দর্শনের ওপর বিশ্বাস করে। আমাদের দর্শন হলো, আমরা পরিবেশগত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করব। এ দর্শনের কারণে আমরা একটা ঝুঁকিও নেব। সেটা কোনো আইনজীবী হিসেবে নেব না; ওই দর্শনকে সমৃদ্ধ করতে, তাকে রক্ষা করতে এ ঝুঁকি নেব। একটা সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আমরা কাজটা করি।' এ লড়াইয়ে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের ব্যক্তিগত জীবন যেন একাকার। সেখানে তাঁর পরিবারের সমর্থন, আন্তরিকতা ও ত্যাগ রয়েছে। তিনি বলেন, 'আমি পরিবার থেকে যে সমর্থন পাই, তার সিকি ভাগও যদি আমাদের দেশের নারীরা পান তাহলে নিজের পায়ে দাঁড়ানো, নিজের কাজটা করার সুযোগ প্রসারিত হতো।
আমার তৃতীয় সন্তান তখন গর্ভে। সিজারিয়ান অপারেশন যেদিন হবে, সেদিনও আমি বিবাদীপক্ষের সঙ্গে মিটিং করেছি। ওর যখন ছয় দিন বয়স, তখন আমি আমার সন্তানকে নিয়ে উচ্চ আদালতে গিয়েছি মামলা লড়তে। আমি যে কাজটা করি, তা একেবারে ঝুঁকিমুক্ত নয়। সেখানে অনেক ব্যক্তিগত হুমকি, গালাগাল, আক্রমণ হয়েছে। তারপরও আমার স্বামীকে কখনও বলতে শুনিনি- তোমার কাজটা তুমি ছেড়ে দাও। কারণ সে জানে, এটা আমার একটা শক্ত আবেগের জায়গা। সে বোঝে- আমি কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে কাজটা করি না। তার মধ্যে ওই উপলব্ধিটুকু আছে- সমাজের জন্য এসব কাজ করার এমন কিছু লোক থাকা দরকার। তার জন্য আমার পরিবারকে অনেক ত্যাগও করতে হয়। যেমন- সন্তানরা আমাকে সবসময় পায় না।
তাদের প্রয়োজনের সময়ে হয়তো আমাকে পায় না। সারাদিনে হয়তো তাদের সঙ্গে আধঘণ্টা বসে কথা বলার সময়ও থাকে না। বাসায় ফিরলেও কাজের বাইরে থাকা হয় কমই। তখন হয়তো ফোন বা কম্পিউটারে ব্যস্ত। এ ত্যাগটা কিন্তু আমার সন্তানরাও করছে। বেলায় কাজ না করে অন্য কোথাও করলে হয়তো আমার সাংসারিক স্বাচ্ছন্দ্য বেশি হতো। আমার সন্তানদের মধ্যে এই মূল্যবোধটুকু এসেছে- আমরা একটা সম্মানজনক জীবনেই আছি। অনেক কিছু পেতে হবে জীবনে; অনেক কিছু চাইতে হবে জীবনে- তারা সে পথে ধাবিত হচ্ছে না। প্রয়োজন অনুযায়ী পেলেই তারা খুশি থাকছে। তাই আমি আমার সন্তান, স্বামী, মা, ভাইয়ের কাছ থেকে ব্যাপক সমর্থন পাই। বেলায় জয়েন করার তিন মাস পর আমার বিয়ে হয়। আমার শ্বশুরবাড়ির কাছ থেকেও অনেক সমর্থন পেয়েছি।'
রিজওয়ানা হাসান জানান, তিনি একদম অবসর পান না। যেটুকু পান, সে সময়টা পত্রিকা পড়ে কাটে। মাথার কোনো অবসর নেই। সময় বের করতে পারলে সন্তানদের সঙ্গে কথা বলেন এবং গান শোনেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘরানার নয়, সব ধরনের গান তাঁর পছন্দ। বই পড়ার ক্ষেত্রেও তাঁর সময় নেই। বই কেনা হয় কিন্তু সেভাবে পড়া হয় না। কাজের প্রয়োজনেই যেটুকু পড়তে হয়, তা পড়েন। া