22/08/2026
ভিসকস ফেব্রিক
১. কাঁচামাল
ভিসকস মূলত প্রাকৃতিক সেলুলোজ থেকে তৈরি একটি সেমি-সিন্থেটিক ফাইবার। কাঠের মণ্ড (সাধারণত ইউক্যালিপটাস, বাঁশ, বিচ বা স্প্রুস গাছ থেকে) এর প্রধান উৎস। তাই একে প্রায়ই "রেয়ন" বা "আর্টিফিশিয়াল সিল্ক"ও বলা হয় — কারণ এর গঠন প্রাকৃতিক হলেও প্রক্রিয়াকরণ রাসায়নিক পদ্ধতিতে হয়।
২. উৎপাদন প্রক্রিয়া
প্রথমে কাঠের মণ্ডকে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড দিয়ে ট্রিট করে অ্যালকালি সেলুলোজে রূপান্তর করা হয়।
এরপর কার্বন ডাইসালফাইডের সাথে বিক্রিয়া করিয়ে তৈরি হয় সেলুলোজ জ্যানথেট, যা একটি সান্দ্র (viscous) দ্রবণে পরিণত হয় — এখান থেকেই "ভিসকস" নামটি এসেছে।
এই দ্রবণকে স্পিনারেট দিয়ে সুতার আকারে বের করে সালফিউরিক অ্যাসিড বাথে চুবিয়ে ফাইবারে রূপান্তরিত করা হয়।
এরপর ধোয়া, ব্লিচিং ও ফিনিশিং করে সুতা বা ফেব্রিক তৈরির উপযোগী করা হয়।
এই প্রক্রিয়াটি তুলনামূলক জটিল এবং প্রচুর পানি ও রাসায়নিক ব্যবহার করে, যা পরিবেশগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
৩. ব্যবহার উপযোগিতা
ভিসকস অত্যন্ত নরম, মসৃণ ও সিল্কের মতো ফল (drape) দেয়, তাই একে "গরিবের সিল্ক"ও বলা হয়।
এটি শ্বাসপ্রশ্বাসযোগ্য (breathable) এবং গরমে আরামদায়ক — গরমকালীন পোশাক, শাড়ি, ব্লাউজ, ড্রেস, লাইনিং ফেব্রিক হিসেবে ব্যাপক ব্যবহৃত হয়।
রং ভালোভাবে গ্রহণ করে বলে উজ্জ্বল ও গাঢ় রঙের ডিজাইনে এটি জনপ্রিয়।
তবে ভিসকসের একটি বড় দুর্বলতা হলো — ভেজা অবস্থায় এর শক্তি (strength) কমে যায় এবং সহজে কুঁচকে যায়, তাই যত্নের প্রয়োজন বেশি।
সাধারণত ড্রাই ক্লিন বা হালকা হাতে ধোয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
৪. টেকসই সম্ভাব্যতা (Sustainability)
ভিসকসের কাঁচামাল প্রাকৃতিক ও নবায়নযোগ্য (কাঠ), কিন্তু উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত রাসায়নিক (কার্বন ডাইসালফাইড, সালফিউরিক অ্যাসিড) পরিবেশ দূষণের কারণ হতে পারে যদি সঠিকভাবে ট্রিটমেন্ট না করা হয়।
বন উজাড়ের ঝুঁকিও একটি বড় উদ্বেগ, বিশেষত অনিয়ন্ত্রিত সোর্সিং থেকে।
তবে বর্তমানে "লায়োসেল" ও "মোডাল" এর মতো নতুন প্রজন্মের ভিসকস-জাতীয় ফাইবার তৈরি হচ্ছে, যেগুলো ক্লোজড-লুপ সিস্টেমে উৎপাদিত হয় এবং রাসায়নিক পুনঃব্যবহার করে — এগুলো তুলনামূলক বেশি টেকসই।
FSC বা PEFC সার্টিফায়েড কাঠের উৎস ব্যবহার করলে ভিসকসকে আরও পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব।
৫. দাম
ভিসকস তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী — সুতি বা সিল্কের চেয়ে অনেক কম দামে সিল্কের মতো অনুভূতি দেয় বলেই এটি ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে এত জনপ্রিয়।
তবে মানভেদে দাম ভিন্ন হয় — নিয়মিত ভিসকসের তুলনায় লায়োসেল বা মোডালের দাম কিছুটা বেশি, কারণ উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিবেশবান্ধব হওয়ায় খরচ বাড়ে।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে ভিসকস ব্লেন্ড ফেব্রিক (যেমন ভিসকস-কটন, ভিসকস-পলিয়েস্টার) ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় কম কস্টে ভালো ফিনিশিং পাওয়ার জন্য।
ভিসকস প্রকৃতি ও প্রযুক্তির এক মেলবন্ধন। এটি সাশ্রয়ী, আরামদায়ক ও স্টাইলিশ হলেও এর টেকসই ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে উৎপাদন প্রক্রিয়ার দায়িত্বশীলতার ওপর — যত বেশি ক্লোজড-লুপ ও সার্টিফায়েড উৎপাদন হবে, ততই এটি পরিবেশবান্ধব ফ্যাব্রিক হিসেবে টিকে থাকবে।