06/06/2023
#অনুধাবন
আমি বরাবরই স্বাবলম্বী, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পছন্দ করি। এসএসসি পরীক্ষার পর থেকেই টিউশনি শুরু করি, যদিও তার কোন প্রয়োজন ছিল না। আমার বাবা সরকারি একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কাজেই টাকা পয়সা আমার কাছে কোন সমস্যা না। কিন্তু আমি বরাবরই চেষ্টা করেছি নিজে কিছু করতে। আমরা তিন ভাই বোন, বড় ভাই ভাবী বিয়ের পর থেকে আলাদা ভাবে নিজেদের সংসার গুছিয়ে নিয়েছেন যদিও একই শহরে বসবাস আর আমার একমাত্র ছোট বোন বিথী কলেজে পড়ছে। জানিনা কিভাবে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করার সঙ্গে সঙ্গেই মোটামুটি মানের একটা চাকরি পেয়ে গেলাম। এ বাজারে চাকরি পাওয়া ভীষণ কঠিন, যেখানে মাস্টার্স কিংবা এমবিএ করা অনেক ছেলেমেয়ে চাকরি পাচ্ছে না সেখানে আমার চাকরি পেয়ে যাওয়াটা অনেকটাই কল্পনার মতো। বেতন খুব একটা বেশি না মাত্র ২৫ হাজার টাকা। হাজার পাঁচেক টাকা হাতে রেখে মায়ের হাতে বাকি টাকা তুলে দিতাম, এমন না যে আমার পরিবার আমার টাকার উপর নির্ভরশীল। আমার পরিবার সচ্ছল এটা আগেই বলেছি কিন্তু এতে আমি এক ধরনের আত্ম তৃপ্তি পেতাম। মাস্টার্স পড়তে পড়তেই আমার বিয়ে হয়ে গেল । বুয়েট থেকে পাশ করা এক ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সঙ্গে, সভ্য সুন্দর ছোট ফ্যামিলি। ও বাড়ির মোটামুটি সবাই আমাকে আপন করে নিল।
বিয়ের মাসখানেক পরে স্যালারির টাকা হাতে পেয়ে মাকে ফোনে বললাম
-মা, আমাকে একটু সাহায্য করো না
-কি?
-দেখো, আমি এই বাড়িতে বউ হয়ে এসেছি, সবাই আমাকে অনেক ধরনের উপহার দিয়েছে, আমারও ইচ্ছে করছে ওদেরকে কিছু একটা দিই কিন্তু কাকে কি দেবো কিছুই বুঝতে পারছিনা
-তুই কি বেতন পেয়েছিস?
-হ্যাঁ মা
-যা খুশি দে, মেয়ে বড় করেছি, শ্বশুর বাড়ি গিয়েছে। এখন তো আমরা পর, শ্বশুর বাড়ির লোকজনের জন্যই তো সব করবে। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম মা ফোন কেটে দিলো।
পরমুহূর্তেই অনুধাবন করলাম নিয়মিত উপহার কে মানুষ নিজের প্রাপ্য হিসেবে বিবেচনা করে। তাই যত কাছের মানুষই হোক মাঝে মাঝে তাকে বুঝতে দেওয়া উচিত এটা তোমার প্রাপ্য নয়, আমি খুশি হয়ে দিচ্ছি।
ভাইয়ার চাকরির সুবাদে প্রায় সারা সপ্তাহেই তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়, শুধুমাত্র শুক্রবার বন্ধ। আর ওই শুক্রবারে ভাইয়া ভাবীকে একটু সময় দেয় মানে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, একাকী একটু সময় কাটানো , যদিও তারা আলাদা বাসাতেই থাকে। আমিও বিয়ের আগে প্রায় প্রতি শুক্রবার তাদেরকে ছুটি দিয়ে একমাত্র ভাতিজিকে সঙ্গ দিতাম। আমার ভালই লাগতো কিন্তু বিয়ের পর সেটি তো আর সম্ভব না। আমার নিজের এখন পরিবার আছে। আস্তে ধীরে লক্ষ্য করলাম ভাবী আমাকে ফোন করা কমিয়ে দিয়েছে, না ভুল বললাম আসলে ফোন করেই না। নিজে থেকে ফোন করলেও ব্যস্ত আছি বলে রেখে দেয়। শেষবার যখন কথা বলেছিলাম তখন বলেছিল,
- এখন তো আর আমাদের জন্য তোমার সময় হবে না নিজের সংসারটাই মনোযোগ দিয়ে করো, আর আমি সারা সপ্তাহ চুলা ঠেলবো আর বাচ্চা পালবো, কপাল আমার! বলার সময় খুব বলবে আমার ভাতিজি, আমাদের রক্ত। আরো নানান আজেবাজে কথা বলে নিজ থেকেই লাইনটা কেটে দিলো।
আর আমি অনুধাবন করলাম আমার আদরের ভাতিজিকে আমার সময় দেওয়া, আদর যত্ন ভালোবাসা দেয়ার ঘটনাটাকে তারা সার্ভিস হিসেবে বিবেচনা করেছে যেটাকে বলা হয় বিনামূল্যে সার্ভিস। এজন্যই বোধহয় মাঝে মাঝে স্বার্থপর হতে হয়, নিজেও সারা সপ্তাহ ক্লান্তিকর ক্লাস কিংবা অফিসের ফাঁকে একটা দিন বোধহয় আমার নিজেকে দেয়া উচিত ছিল।
বিয়ের বছর খানেক পর মায়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। ছোট বোন বিথী ছুটে এসে শরবত বানিয়ে দিল । অবশ্য আমি একাই এসেছি, আমার সঙ্গে সৈকত মানে আমার স্বামী আসেনি, আমি অফিস থেকে সরাসরি এসেছি।
-আরে আপা, তোর গলার চেইনটা তো খুব সুন্দর আর লকেটটাও।দে না আমাকে, আমি কিছুদিন ব্যবহার করি।
বিয়ের আগে আমার সবকিছুই বিথীর অধিকারে ছিল তাই ও যখন বললো আমি কিছু মনে করিনি বরং সুন্দর করে বুঝিয়ে বললাম,
- আরে এটা আমার অ্যানিভার্সারি গিফট রে, তোর ভাইয়া আমাকে দিয়েছে আর সবসময় গলায় রাখতে বলেছে তোকে বরং একই রকম আমি একটা বানিয়ে দেব।
বিথী মুখ কালো করে উঠে চলে গেল এবং আমি প্রায় ঘন্টাখানেক ছিলাম ও আর আসেনি। আমি অনুধাবন করলাম কাউকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিয়ে মাথায় তোলাটা এক ধরনের বোকামি, প্রথম থেকেই ওকে বুঝিয়ে দেয়া উচিত ছিল সবকিছু চাইলেই পাওয়া যায় না, কিছু ক্ষেত্রে লিমিটেশন থাকে , এই ক্ষেত্রে বোধহয় একটু স্বার্থপর হওয়াই যায়।
বিয়ের পর প্রতিদিন সকালে আমার রুটিন হচ্ছে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা তৈরি করে সৈকতকে জাগিয়ে তুলে ওকে খাইয়া অফিসে পাঠিয়ে নিজে রেডি হয়ে অফিসে যাওয়া। আগের রাত্রে ঘুম আসছিল না, ঘুমোতে ঘুমোতে ভোর হয়ে গেছে উঠতেও তাই দেরি হয়েছে। প্রচন্ড জোরে ধাক্কায় ঘুম ভাঙলো। তাকিয়ে দেখি সৈকত রাগী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে
-কয়টা বাজে খেয়াল আছে? আমি অফিসে যাব না! নাস্তা বানাবে কে, কখন খাবো, কখন যাবো, নাকি তোমার জন্য চাকরিটাও ছেড়ে দেবো?
এত ছোট একটা ঘটনায় এই ধরনের বাড়াবাড়ি আমার কাছে পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল। আমি অনুধাবন করলাম বছরে ৩৬৪ দিন যে মানুষটার জন্য আমি শ্রম দিচ্ছি একদিন যখন সেই শ্রমটা দিতে পারছি না সেটাই বিশাল ডাইনোসরের মত আমাকে গিলে খেতে আসছে তাই বোধহয় মাঝে মাঝে নিয়ম ভাঙ্গতে হয়, আমি মানুষ রোবট নই, আমারও ঘুম প্রয়োজন আমারও ক্লান্তি আসে এই জিনিসগুলো বোধ হয় আগেই বুঝিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। হয়তো তাতে আমাকে কিছুটা স্বার্থপর মনে হবে তারপরেও সেটাই বোধহয় সৈকতের প্রাপ্য।
আমার শাশুড়ির হাই প্রেসার, ডায়বেকটিস । নিয়মিত ওষুধ খেতে হয় । কোন বেলায় কোন ওষুধটা খেতে হবে সব দায়িত্বই আমি পালন করি। একদিন ভুল করে এক বেলার ওষুধ সাজিয়ে রাখতে ভুলে গেলাম। অফিসে প্রচন্ড ব্যস্ত ছিলাম তার মাঝে বাসা থেকে ছয়টা ফোন, কোনভাবে ফোনটা ধরলাম
-বৌমা এখনই বাড়িতে আসো
-কেন মা কি হয়েছে?
-তুমি জানো না আমাকে সব সময় ওষুধের উপরে থাকতে হয়, এবেলার ওষুধ কোথায়? আমাকে মেরে ফেলতে চাও! আমি কি চিরাচরিত শাশুড়ির মত যে বউয়ের পেছনে লেগে থাকি? আমাকে মেরে ফেলে নিজের সংসার সাজাতে চাও? আরো অনেক কথা বললেন উনি ফোনে, আমার কান ঝাঝা করছিল। উনি শক্ত সমর্থ একজন মহিলা,এমন নয় চোখে কম দেখেন, নিজের ওষুধ নিজেই নিয়ে খেতে পারেন, তাছাড়া আমি আসার আগেও তো নিজেরটা নিজেই খেতেন। সাথে সাথে আমি অনুধাবন করলাম ভুল আমারই ছিল, হাজারটা দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে অযাচিত দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে হয়, ঝাড়া হাত পা নিয়ে তথাকথিত স্বার্থপর হয়ে ভালো থাকতে হয়।
আমি অনুধাবন করেছি কিছুটা স্বার্থপর হয়ে যদি ভালো থাকা যায় তাহলে সমস্যা কোথায় ? যার যেটা প্রাপ্য শুধুমাত্র সেটুকুই তাকে দেয়া উচিত। অকৃত্রিম ভালোবাসাকে কেউ যদি তার অধিকার মনে করে সেটা এক সময় কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমি এখন মা-বাবাকে বিভিন্ন উপলক্ষ্যগুলোতে উপহার দেই, তাছাড়াও বাড়িতে যাওয়ার সময় এটা সেটা টুকটাক জিনিসপত্র, ফলমূল নিয়ে যাই, বিথীকে মাঝে মাঝে হাত খরচ দেই তবে অবশ্যই সেটা নিয়মিত না, ওর বার্থডে কিংবা কোন স্পেশাল ডে তে উপহার দেই। ভাই ভাবীর বাসায় মাঝে মাঝে বেড়াতে যাই তাদেরকেও দাওয়াত করি । সকালে সৈকতের যেমন অফিস থাকে আমারও তেমন অফিস থেকে আর দুজনই টায়ার্ড হয়ে অফিস থেকে ফিরি। তাই মাঝে মাঝে ইচ্ছে হলে রান্নাবান্না করি, অবশ্য সৈকত নিজেও এখন মাঝে মাঝে আমাকে সাহায্য করে বাকিটা কাজের মেয়ে সামলে নেয়। শাশুড়ি মাকেও সারা মাসের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধগুলো একেবারে বুঝিয়ে দিই, উনি এখন অভ্যস্ত এবং নিজেই বুঝতে পারেন। আমি অনুধাবন করেছি এক জীবনে সবাইকে খুশি রাখা কখনোই সম্ভব না, এমনকি নিজের সর্বোচ্চ টুকু দিয়েও। তাই নিজেকে ভালো রাখার জন্য মাঝে মাঝে হয়তো কিছুটা স্বার্থপর হওয়া জরুরি হয়ে পড়ে । যদিও সমাজের চোখে এটা তথাকথিত স্বার্থপরতা কিন্তু আমার কাছে এটা হচ্ছে নিজেকে ভালো রাখার মূল মন্ত্র আর নিজে ভালো না থাকলে কাছের প্রিয় মানুষগুলোকে ভালো রাখা কখনোই সম্ভব না।
#কালেক্টেড
হ্যা, আমিও মনে করি, কারো উপকার করলে সেটা টানা করতে নেই, মানুষ উপকার কে অধিকার মনে করে বসে। যেমন অতিরিক্ত ভালবাসা কে মানুষ দুবলতা মনে করে এবং নিজেকে অনেক কিছু ভেবে অপরপক্ষ কে অবজ্ঞা অবহেলা দেয় সেই রকম।
কখনোই কারো জন্য ই মন প্রাণ উজার করে করার কিছুই নাই 😊। যে যেটার যতটুকু যোগ্য তাকে ততটুকু দেয়াই শ্রেয়। ৯৯% মানুষ ভালবাসা উপকার এগুলোকে গুলিয়ে ফেলে এবং অসম্মানিত ও আহত করে ফ্লেএ সুন্দর অনুভূতি গুলোকে। তাই যত আপন ই হোক, তাজে বুঝানো উচিত যা তোমাকে দিয়েছিলাম, এটা আমার ভালবাসা বা সম্মান ছিল,যা স্পেশাল কিছু,
যা এত সহজে কেউ পায় না। মুল্যায়ন করতে শিখো।