01/10/2025
শিশুটি ছোট্ট, আমাদের টেবিলের পাশে এলো। আমরা ১৫ জন বিশালদেহী বাইকার, শহরে-শহরে ঘুরি। পথিমধ্যের একটি রেস্তোরাঁয় বসেছিলাম, খেতে।
শিশুটি এলো, পেছনদিকে ভয়ার্ত চোখে তাকালো, পুনরায় আমাদের দিকে ফিরে ফিসফিসিয়ে বললো— "আমার সৎবাবাকে মেরে ফেলতে পারবে তোমরা?"
আমরা হতভম্ব হয়ে গেলাম।
শিশুটির চোখে অশ্রু।
ডাইনোসর আঁকা টিশার্ট, নিষ্পাপ, ভীত, পরনে জিন্স, টেবিলে রাখা হাতটি কাঁপছে। কাঁদছে। বাবাকে হ'ত্যা করার অনুরোধটি এমন নির্লিপ্ততায় করলো, যেন একপ্যাকেট চিপ্স চাইছে সে!
তার মা তখন রেস্তোরাঁর বাথরুমে। এই সুযোগেই ছেলেটা এসেছে আমাদের কাছে, অনুরোধটি নিয়ে। মা এসে পড়ার ভয়ে বারবার বাথরুমের দিকে তাকাচ্ছে সে, আর তাকাচ্ছে আমাদের দিকে, আমরা খু'ন করতে রাজি কিনা তার বাবাকে!
"প্লিজ"— আবার ফিসফিসিয়ে উঠলো সে, তারপর জিন্সের পকেট থেকে বের করে আনলো দুমড়ানো ৭টি টাকা। "এর চেয়ে বেশি আর নেই আমার কাছে।"
এবার রেস্তোরাঁর দরজার দিকে তাকালো সে, ভয়ার্ত চোখে। তার বাবা কি বাইরে আছে?
আমাদের বাইকার-দলের লিডার ষণ্ডা মাইক, ঝুঁকলো তার দিকে— "তোমার নাম কী ব্যাটা?"
"টাইলার"— জবাব দিলো শিশু। "মা এক্ষুনি বেরিয়ে আসবে, তোমরা আমাকে হেল্প করবে নাকি করবে না?" সে তাড়া দিচ্ছে আমাদেরকে।
মাইক আস্তে করে জানতে চাইলো— "বাবাকে কেন মারতে বলছ?"
টাইলার তার জামার গলাটি নামালো একটুখানি, ওখানে নীল হয়ে আছে আঙুলের ছাপ! গলা টিপে ধরেছিলো কেউ, বাচ্চাটার!
"সে বলে, আমি যদি আমাকে মারার কথা কাউকে বলি, মাকে আরও বেশি মারবে সে। তোমরা তো বাইকার, অনেক শক্তি, তোমরা পারবে তাকে থামাতে। মাকে খুব মারে রোজ, লোকটা। পারবে না?"— ডুকরে উঠলো টাইলার।
তখনই আমরা লক্ষ্য করলাম, তার হাতের কব্জিতেও ক্ষত, তার থুতনি ফোলা!
ওসময়েই বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো তার মা। টাইলারের দিকে তাকিয়ে, ভীত চোখে, আমাদের দিকে এগিয়ে এলো। সে এমন ধীরে হাঁটছে, খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে, বোঝা যায়— সেও আহত। প্রসাধনী গলে বেরিয়ে এসেছে তারও মুখের ও হাতের ক্ষতের দাগগুলো।
"ম্যাম, চিন্তার কিছু নেই"— আশ্বস্তের স্বরে বললো মাইক। "যদি কিছু মনে না-করেন, আপনারা দু'জনেই আমাদের সাথে বসুন প্লিজ। একসাথে খাই সবাই।"
ভদ্রমহিলার দু'চোখ গড়িয়ে অশ্রু নেমে এলো। আমরা সব বুঝে নিলাম, আর কোনো প্রশ্ন না-করেই।
এক লোক ঢুকে এলো রেস্তোরাঁয়, তার চোখেমুখে ভয়ানক ক্রোধ! "সারাহ্! এদের সাথে করছটা কী তুমি? ফালতু মেয়েছেলে! এই ছেলে, উঠে আয়!"— রাগে গজরাচ্ছে লোকটা।
আমাদের বস মাইকই উঠে দাঁড়ালো, তার পেশিবহুল বিশাল বপু নিয়ে, শান্তভাবে, অটল শিরে। "তুমি তোমার বিল পে করে এক্ষুনি বেরিয়ে যাও এখান থেকে। এরা যাবে না তোমার সাথে। এবং এদের জন্য বাইরে অপেক্ষা করবে না তুমি। আমি বোঝাতে পেরেছি?"— মাইকের ক্ষুরধার শব্দগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো পুরো রেস্তোরাঁ!
আমরা ১৫ জন বাইকার দাঁড়িয়ে আছি, সোজা লোকটার দিকে তাকিয়ে। তার চেহারায়, অল্প আগের ক্রোধের স্থলে ধীরেধীরে জায়গা করে নিলো ভয়ের ফ্যাকাশে আভা। এইসব লোক সবসময় কাপুরষই হয়। সে বেরিয়ে গেলো দ্রুত।
আমরা টাইলার ও তার মা সারাহ্কে নিয়ে পুলিশস্টেশনে গেলাম। চার্জ ফাইল করলাম। আমাদের একজনের ভাই ছিল আইনজীবী, তার সহায়তা নিলাম আমরা। সেদিন, প্রথমবারের মতো আমরা দেখলাম, শিশু টাইলার হাসছে! চোখ ভিজে এসেছিলো আমাদের মতো রূঢ় মানুষেরও।
না, আমরা শিশুটির সৎবাবাকে হ'ত্যা করিনি। তাকে স্রেফ নেই করে দিয়েছি অত্যাচারিত দু'টি মানুষের জীবন থেকে, আইনগতভাবেই। এরকম লোকের থাকার চেয়ে না-থাকাই ভালো, সুস্থ কারও জীবনে।
টাইলাররা এখন ভালো আছে, নিজেদের অ্যাপার্টমেন্ট হয়েছে। শিশুটি স্কুলে যায়, খেলে হাসে প্রাণ খুলে; তার মা কাজ করে মন দিয়ে। মাঝেমাঝে খোঁজখবর নিই আমরা।
শিশুটি জানলো— প্রকৃত পুরুষ মূলত কেমনঃ পুরুষ নিরাপত্তা দেয়, অত্যাচার না।
আমাদের দলনেতা— মাইক— শিশুটির দেওয়া দুমড়ানো-মোচড়ানো সেই ৭-টাকা এখনও রেখে দিয়েছে তার ওয়ালেটের ভিতরে। "আমার এইজীবনে পাওয়া শ্রেষ্ঠতম মজুরি"— টাকাগুলোর দিকে তাকিয়ে মাইক প্রায়ই ফিসফিস করে, আর, চোখ মোছে।🥲