17/06/2026
আলহামদুলিল্লাহ, আবারও আমাদের সামনে এসেছে একটি নতুন হিজরি বছর। আগামীকাল ১লা মুহররম, ১৪৪৮ হিজরি।
নতুন বছর মানেই শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা বদলানো নয়। একজন মুমিনের জন্য এটি নিজের জীবনকে নতুন করে পর্যালোচনা করারও একটি উপলক্ষ। গত বছরের ভুল-ত্রুটি, গুনাহ ও অবহেলার কথা স্মরণ করে আল্লাহর দিকে আরও একবার ফিরে আসার সুযোগ।
আর এ নতুন বছরের শুরুই হচ্ছে এমন একটি মাস দিয়ে, যাকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আল্লাহর মাস' বলে অভিহিত করেছেন।
তাই মুহররম শুধু বছরের প্রথম মাস নয়; এটি সম্মান, বরকত, তাওবা ও নেক আমলের একটি বিশেষ সময়।
▫️ মুহররম কী?
“মুহররম শব্দের অর্থ হলো— সম্মানিত, পবিত্র বা নিষিদ্ধ। এটি হিজরি বছরের প্রথম মাস এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ চারটি মাসের অন্যতম।
আল্লাহ বলেন,
“নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারোটি... তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।”
(সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৩৬)
এই কারণেই মুহররমকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয়।
▫️ মুহররম মাসের গুরুত্ব
মুহররম এমন একটি মাস, যার প্রতি ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“রমাদানের পর সর্বোত্তম রোজা হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহররমের রোজা।”
(সহিহ মুসলিম)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, এই মাসে নফল রোজা, তাওবা, ইস্তিগফার ও অন্যান্য নেক আমলের বিশেষ ফজিলত রয়েছে।
▫️ আশুরার তাৎপর্য :
ইসলামের ইতিহাস ও শিক্ষার এক স্মরণীয় দিন ও
মুহররম মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো ১০ মুহররম, যা ‘ইয়াওমে আশুরা’ নামে পরিচিত।
এই দিনটি ইসলামের ইতিহাসে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মৃতি বহন করে। এগুলো হলো-
▫️১. মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলের মুক্তি
আশুরার দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ভয়াবহ জালিম ও অহংকারী শাসক ফিরআউনের জুলুম থেকে মুক্তি দেন এবং ফিরআউনকে সাগরে ডুবিয়ে ধ্বংস করেন। এই কৃতজ্ঞতায় মুসা (আ.) এ দিনে রোজা রাখতেন।
▫️২. নূহ (আ.)-এর নৌকা স্থির হওয়া
অনেক আলেমের মতে, এই আশুরার দিনেই নূহ (আ.)-এর নৌকা জুদি পাহাড়ে এসে স্থির হয়েছিল; যা ছিল এক মহা নাজাতের দিন।
▫️৩. কাবা শরিফের গিলাফ পরিবর্তন
ইসলামপূর্ব যুগেও আরবরা আশুরাকে সম্মান করত, এ দিনে কাবা শরিফে গিলাফ পরানো হতো। ইহুদিরা এ দিনে রোজা রাখতো।
▫️ ৪. কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা
এই মাসেরই এক করুণ অধ্যায় হলো কারবালা। সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থেকে ইমাম হুসাইন (রা.) এবং তাঁর সঙ্গীরা শহিদ হন। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় প্রকৃত মুসলিমের দায়িত্ব -
▫️ সত্যের পথে দৃঢ় থাকা
▫️জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া
▫️ আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বাগ্রে রাখা।
কিন্তু শোককে কেন্দ্র করে ইসলামবিরোধী কোন আচরণ করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
▫️ কেন আশুরার রোজা রাখা হয়?
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন তিনি দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখে।
তারা বলল, এ দিনে আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তাঁর কওমকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফিরআউনকে ধ্বংস করেছিলেন। এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুসা (আ.) রোজা রাখতেন। তখন রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
“মুসা (আ.)-এর অনুসরণের ক্ষেত্রে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।”
(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
অতঃপর তিনি নিজেও আশুরার রোজা রাখেন এবং উম্মতকে উৎসাহিত করেন।
▫️ আশুরার রোজার ফজিলত
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।”
(সহিহ মুসলিম)
একজন মুমিনের জন্য এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ রহমত।
▫️ সাহাবীদের আমল ও শিশুদের প্রশিক্ষণ
আশুরার রোজার প্রতি সাহাবীদের কতটা গুরুত্ব ছিল, তা একটি চমৎকার ঘটনা থেকে বোঝা যায়।
রুবাই’ বিনতে মুআওয়িয (রা.) বলেন,
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরার সকালে ঘোষণা দিলেন--
“যে রোজা রেখেছে সে যেন রোজা পূর্ণ করে, আর যে খেয়েছে সে যেন বাকি দিন না খায়।”
তিনি আরও বলেন, "আমরা সাহাবীগণ নিজেরা রোজা রাখতাম, এমনকি আমাদের ছোট বাচ্চাদেরও রোজায় অভ্যস্ত করাতাম।
ছোট শিশুদের জন্য আমরা খেলনা বানিয়ে দিতাম,
যখন তারা খাবারের জন্য কাঁদত, তখন সেই খেলনা দিয়ে তাদের ব্যস্ত রাখতাম-- এভাবে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময় পার করতাম।"
(সহিহ বুখারি: ১৯৬০, সহিহ মুসলিম: ১১৩৬)
এ ঘটনা আমাদের শেখায় যে, সাহাবাগণ ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের ইবাদত ও দ্বীনের সঙ্গে পরিচিত করাতেন।
▫️ আশুরার রোজা কীভাবে রাখবেন?
ইহুদিদের সাথে ব্যতিক্রম করার জন্য ৯ ও ১০ মুহররম রোজা রাখা উত্তম। অথবা ১০ ও ১১ মুহররম রোজা রাখতে পারেন।
শুধু ১০ তারিখের একটি রোজা রাখার চেয়ে এভাবে দুই দিন রোজা রাখাই অধিক উত্তম ও সুন্নাহ।
▫️মুহরমমে বিশেষ কী করবো?
সম্মানিত মাস মুহররমে আমরা যে আমলগুলো করার চেষ্টা করতে পারি--
▫️ বেশি বেশি নফল রোজা রাখা।
▫️ তাওবা ও ইস্তিগফার করা।
▫️ কুরআন তিলাওয়াত বাড়িয়ে দেওয়া।
▫️ নফল ইবাদতে মনোযোগী হওয়া।
▫️ গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা।
▫️ আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধিতে মনোযোগ দেওয়া।
▫️বর্জনীয় বিষয়
মুহররম মানেই তো হারাম, নিষিদ্ধ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের আদেশ করেছেন এ মাসে নিজেদের ওপর জুলুম না করতে। আর নিজের ওপর সবচেয়ে বড় জুলুম হচ্ছে মহান আল্লাহর অবাধ্যতা করা।
আসলে আল্লাহর অবাধ্যতা শুধু মুহররমেই নয়, বান্দার জন্য সারাবছরই হারাম ও ক্ষতিকর।
কিন্তু এই সম্মানিত মাসে আমাদের দায়িত্ব হলো আরও বেশি সতর্ক থাকা। আমরা অনেক বেশি ইবাদত করতে না পারি, তবুও আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে যেন দূরে থাকতে পারি-- এ চেষ্টাটাই জরুরি।
কারণ গুনাহ ছেড়ে দেওয়াটাই একটি বড় ইবাদত। তাই এই সময়টা হোক নিজের জীবনকে গুনাহমুক্ত করে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে ফিরে আসার আরেকটি সুযোগ।
▫️আশুরার বিদআত
ইসলামে নেই, অথচ ইবাদতের নিয়্যাতে সওয়াবের আশায় যেগুলো করা হয় সেগুলোই বিদআত। আশুরাকে কেন্দ্র করে সমাজে কিছু বিদআত ও ভিত্তিহীন প্রথা প্রচলিত রয়েছে। যেমন--
▪️ বিশেষ সুরমা লাগানোকে ফজিলতপূর্ণ আমল মনে করা।
▪️ বিশেষ গোসল বা মেহেদিকে ধর্মীয় আমল মনে করা।
▪️ খিচুড়ি বা নির্দিষ্ট খাবার রান্নাকে ইবাদত মনে করা।
▪️ আনন্দ-উৎসব বা বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করা।
▪️ মাতম, বিলাপ ও শোকের অনুষ্ঠান করা।
▪️ ‘হায় হুসাইন’ বলে চিৎকার-চেঁচামেচি ও ইসলামবিরোধী আচরণ করা।
▪️ তাযিয়া মিছিল বের করা।
এসব কাজের কোনো সহিহ ভিত্তি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবাগণ বা সালাফে সালেহীনের আমলে পাওয়া যায় না। তাই এগুলো কোনটিই গ্রহণযোগ্য নয় বরং গুনাহের কাজ।
ফজিলতের সময়গুলোতে সওয়াব অর্জন করতে গিয়ে উল্টো হারামে লিপ্ত হওয়ার গুনাহ থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
▫️ শেষ কথা
তাই আমরা সম্মানিত মুহররম মাসে আল্লাহর অবাধ্যতা ও বিভিন্ন বিদআত থেকে দূরে থাকার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। পাশাপাশি বেশি বেশি নেক আমল করারও চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ ।
আসুন, আমরা এই সম্মানিত মাসকে শুধু ইতিহাস স্মরণের মাস না বানিয়ে এর বিশেষ শিক্ষাগুলো জীবনে প্রয়োগ করি। মুহররমকে তাওবা- ইস্তিগফার, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাস হিসেবে গ্রহণ করি।
|| মুহররমে নিষেধ ||
ইসমত আরা
~রৌদ্রময়ী
#জুওয়াইরিয়াসাফিয়্যাসাওদা