Md OMAR FARUk

Md OMAR FARUk Omar faruk

আমার বাবা প্রায়ই রাতে বাড়ি ফেরেন না। এই নিয়ে মায়ের তেমন মাথা ব্যথা নেই। উনি দিব্যি রাঁধেন বাড়েন আমাদের খেতে দেন। কিন্তু ...
31/07/2024

আমার বাবা প্রায়ই রাতে বাড়ি ফেরেন না। এই নিয়ে মায়ের তেমন মাথা ব্যথা নেই। উনি দিব্যি রাঁধেন বাড়েন আমাদের খেতে দেন। কিন্তু নিজে না খেয়ে থাকেন। আমরা ঘুমাতে গেলে আম্মা চুপিচুপি কাঁদেন।
হয়তো ভাবেন আমরা ঘুমিয়ে গেছি। কিন্তু আমরা জেগে থাকি। আমরা চার ভাইবোন। আমি, তিতলি, বুবন আর তন্ময়।

আমাদের তিন ভাইবোনের নামের আগে ত আছে।
শুধু বুবন বাদে। বুবন আমাদের ভাই। তবে আমাদের ভাই না। আব্বা একদিন একটা লাল সোয়েটারের সাথে ঢিলা হাফ প্যান্ট পড়া দুই বছরের এক বাচ্চাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। ওর নাক দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছিল।
বাচ্চাটা সোয়েটারের হাতায় সেই পানি মুছছিল
আর হালকা ফোঁপাচ্ছিল। আম্মা ওকে কোলে নিয়েই চিৎকার করে উঠলেন - বাচ্চাটার তো গায়ে জ্বর!
সেই থেকে বুবন আমাদের সাথে আছে। বুবনের বয়স এখন আট। বুবন এখন ক্লাস টু'তে পড়ছে।

আমি এবার ক্লাস নাইনে উঠেছি। এই বয়সে অনেকের নাকের নিচে গোঁফের রেখা দেখা দেয়। আমার সে সবের বালাই নেই। আমাকে অনায়াসে ক্লাস সিক্স সেভেন বলে চালানো যায়। কিন্তু আমি জানি, আমি বড় হয়ে যাচ্ছি। ব্যাপারটা খুব গোপন। কাউকে বলা যাবে না। আম্মা এখনো আমাকে গোসল করাতে চান এটা আমার কাছে খুব অস্বস্তিকর ব্যপার। ইচ্ছে করে আম্মার হাত খিঁমছে দিয়ে দৌঁড়ে পালাই। মাঝে মাঝে যখন আম্মা জোড় করে গায়ে পানি ঢেলে দেন। আমি
চোখ বুজে পাশের বাড়ির তনুকে অনুভব করি । যেন তনুই আমার গায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছে। আমি জোড়ে নাক টেনে তনুর গায়ের গন্ধ নিতে চাই। আম্মা গালে ঠাশ করে থাপ্পড় দিয়ে বলেন। কী করছ হারামজাদা। নাকে পানি ঢুইকা
মরবি।

আজ তিনদিন পরে আব্বা এসেছে । আব্বার বাম চোখটা বিশ্রী ভাবে ফুলে আছে। আম্মা চুপচাপ আব্বার গায়ে রসুন তেল গরম করে ডলে দেন। চুপিচুপি চোখের পানি ফেলেন। আব্বা বিশ্রী ভাবে আম্মাকে গালি দিয়ে বসেন - আহ ফ্যাঁচফ্যাঁচানির কী আছে? এইটা কি নতুন?

পকেটে নগদ ট্যাকা আছিলো না। তাই অল্প ডলা খাইতে হইছে। এই নিয়া এতো মন খারাপের কী আছে।
এরপরে আব্বার মন নরম হয়ে আসে। ভাত খাইছো!
আম্মা চুপ থাকেন। আব্বা কখনো জিজ্ঞেস করেন না
আমরা খেয়েছি কী না ! বছরে অন্তত একবার - দুইবার, এমন ঘটবেই । আব্বা কাৎরাতে কাৎরাতে উঠে আম্মার মুখে ভাত তুলে দেন। আম্মা লাজুক কিশোরীর মতো হা করেন। দুজনের এই ভালোবাসাবাসি আমরা এতো দেখেছি যে আমাদের কাছে এখন পানিভাত মনে হয়।

আজ কয়েকদিন বৃষ্টি, আব্বা বাইরে বের হন না। আব্বা বাইরে না গেলে আমাদের সংসারে টানাটানি লেগে যায়। আব্বা আসলে কী করেন আমরা কেউই তেমন খোলাসা করে কিছু জানি না। আম্মাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম উনি চিল্লায়ে উত্তর দিয়েছিলেন -

'দুই আঙুইল্লা পুলার সাহস কতো! বাপে কী করে জানতে চায়! " আব্বা কী করে এটা জানতে চাওয়ার মাঝে কী অন্যায় আছে আমি বুঝিনা।

রমজান মাস এসে গেছে। আব্বার ইনকাম আজকাল একদম কমে গেছে। একদিন আম্মা আমাদের সেহরিতে ডাকলেন না। সারাদিন না খেয়ে থাকার অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। আম্মা বললেন - তুমরা তো রোজা আছো তাইনা? আমার পুলা মাইয়ারা কত্তো ভালা। সেদিন আব্বা সন্ধ্যায় ফিরে দেখলেন আম্মা ইফতারি বানাচ্ছেন না । স্বভাবমতো আম্মাকে একটু বকাঝকা করে বেড়িয়ে গেলেন। আব্বার সাথে গেল বুবন। এই প্রথম আব্বা আমাদের কাউকে হাত ধরে নিয়ে বাইরে গেলেন। রাতে আমরা সবাই খেতে বসেছি। আম্মা মুখ শক্ত করে বসে থাকলেন।

আমরা চার ভাইবোন গলা ধরে ঘুমাতে গেলাম। আমার পরে তুলতুল তারপর তিতলি সবার ছোট বুবন। মাঝরাতে শুরু হয়। আম্মা আব্বার মান অভিমানের পালা।

- এইভাবে আর কয়দিন। আমি তো বাচ্চাদের নিয়ে আর পারি না। বাচ্চাদের ঈদের কাপড় লাগবো। বাজার তো কিচ্ছু নাই। আম্মা তার স্বভাবমতো কেঁদে ফেলেন।

- কাইল একটা বড় কিছু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে যাইতে হবে সদরঘাট। ব্যবসায়ীরা আসা যাওয়া শুরু করেছে।

রমজানের শেষের দিকে আমাদের অভাব মোটামুটি দূর হয়। দোকানের বাকি শোধ হয়। প্রায়ই আম্মা মুরগী রাঁধেন।

আম্মা মুরগির রান ঘুরে ফিরে আমাদের পাতে দেন। যেদিন বুবনের পালা না থাকে। আম্মা ঘ্যান ঘ্যান করেন আমাদের সাথে। দাওনা রানডা বুবনরে। ছোট্ট একখান মানুষ, রান ছাড়া ভাত খায় কেমনে!

তিতলি ফট করে বলে ওঠে । আর যেদিন ভাত রানছিলেন না সেইদিন তো দেখলাম ওরে গোল পাউরুটি খাওয়াইতেছেন চুপচাপে। তখন রান লাগে না! আম্মা প্রথমে বুঝতে পারেননি। পরে যখন বুঝলেন ওর পিঠে দুর্দার কিল শুরু করলেন।

আমরা সবাই জানি ছোট বলে আম্মা বুবনকে একটু বেশি ভালোবাসেন। একটু বেশি আগলে রাখেন। আমাদের কারো এই নিয়ে হিংসে নেই। তিতলি কেন সেদিন এমন বলতে গেল জানিনা।

আজকাল একটা লোক প্রায়ই আমাদের বাড়ি আসে।
সে আসলেই আম্মা আমাদের ঘরের ভেতরে রেখে বাইরে থেকে দরজা আঁটকে দেন। আমরা ঘরে বসে কাটাকুটি খেলি। আমাদের বরং আনন্দ হয়।
একদিন মাঝরাতে শুনি আম্মা কাঁদছেন। আব্বা কী একটা বারবার বুঝাচ্ছেন আম্মাকে - তুমি না কইরো না। বিশ্বাস করো আমি সঠিক জায়গাই খুঁজে বের করবো। আম্মা বারবার বলেন " না না।"

পরদিন আম্মা বুবনকে সাথে করে স্কুলে গেলেন আমাদের ভরসায় আর ছাড়লেন না। স্কুল শেষ করে একেবারে বাসায় এলেন। আমরা তিন ভাইবোন তখন ক্ষুধায় চোখে আঁধার দেখছি ।

আমরা সবাই প্রাইমারি স্কুলে পড়া শুরু করলেও আব্বা বুবনকে কে জি স্কুলে দিয়েছেন। আব্বা বলেন - বুবন বড় হয়ে মস্ত বিজ্ঞানী হবে। ডা. না ইঞ্জিনিয়ার না, এমনকি পাইলটও না। আব্বার এমন শখের আমি কোন কারণ খুঁজে পাই না।

টাকা না থাকলে আমাদের খাওয়ায় টান পড়ে এটা ঠিক। তবে আব্বা কখনো আমাদের বই খাতা পেন্সিল কম কিনে দেন না। আমি আজকাল স্কুলের এক শিক্ষকের কাছে অংক ইংরেজী দুটোই পড়ি।

এমন সময়ে এলো কোরবানি ঈদ। বুবন আব্বাকে বলল - আব্বা গরু কিনবেন না ? আমরা কি কোরবানি দেবো না?

আব্বা বুবনের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। মশলাপাতি, পোলাউ চাউলের সাথে বুবন আর তিতলির কাপড় এলো। সস্তা কাপড়। তবুও তো নতুন।
বুবন ঘুরেফিরে ওর শার্টটা গায়ে দিয়ে দেখতে লাগল।
ছোট ভাইকে হিংসে করতে নেই। তাই আমি উদাস নয়নে বই নিয়ে বসলাম। আম্মা মশলা বাটছেন। এমন সময়ে একটা লোক দৌঁড়ে আম্মার কাছে এলো। একমুঠ একশো টাকার নোট আম্মাকে দিয়ে বলল - ভাবি আমার খুব তাড়া আছে। আপনি কোরবানি দিয়েন। ভাইয়ের আসতে দেরি হবে।

আম্মা হাহাকার করে উঠলেন। এতোগুলো টাকা হাতে পেয়ে কেউ কাঁদে আমি এই প্রথম দেখলাম। সেদিন বুবন রাতে ভাত খেলো না। আব্বা কখন আসবে। আব্বা কখন ভাত খাবে এসব বলতে বলতে ঘুমিয়ে গেল।

আব্বা ফিরলেন একমাস পরে। আব্বার পাঠানো সেই টাকা দিয়ে কোরবানি না দিয়ে টাকাটা আম্মা আব্বার পেছনে খরচ করেছেন বলে আব্বা খুব রাগারাগি করলেন। বুবন এতো শুকিয়ে গেছে বলে রাগারাগি করলেন। দোকান থেকে ডিম কিনে এনে আম্মাকে ডিম রান্না করতে বললেন।

সবার জন্য আস্ত ডিম। আব্বা আগেই হুকুম দিলেন।
ডিম আলু সেদ্ধ হওয়া মাত্র আব্বা সেখান থেকে একটা ডিম তুলে ছিলিয়ে যত্ন করে বুবনকে খাইয়ে দিলেন।

বুবন সেখান থেকে একটুকরো ডিম আব্বার মুখে তুলে দিল। এই প্রথম আমি আব্বাকে কাঁদতে দেখলাম। আব্বা বলে উঠলেন। আজ সবাই এখন ডিম সিদ্ধ খাও। আমি

একদিন দুপুরে আম্মা ঘুমিয়ে আছেন। আব্বা হঠাৎ বুবনকে হাত ইশারায় কাছে ডাকলেন। নিজ হাতে ওর ধোয়া শার্টটা পরিয়ে ওকে বাইরে নিয়ে গেলেন। আম্মা ঘুম ভেঙে বুবন কে না দেখে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন।

আব্বা ফিরলেন সন্ধ্যার পরে, কিন্তু একা। বুবন সাথে নেই। আম্মা দৌঁড়ে গিয়ে আব্বাকে এলোপাথাড়ি কিল ঘুসি মারতে মারতে জ্ঞান হারালেন। এমন কাণ্ড আমরা কখনো দেখিনি। ভয়ে আমরা তিন ভাইবোন ও কাঁদতে লাগলাম। আম্মার জ্ঞান ফিরলো মাঝরাতে। আমরা সবাই আম্মাকে ঘিরে বসে আছি। আব্বা ঘরে নেই।

আম্মা বিছানা থেকে উঠে বসে আবার জিজ্ঞেস করলেন বুবন আসে নাই। আমরা না বললাম।

বুবন নেই এটা আমাদের তিন ভাইবোনের মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আম্মাকে কী করে সান্ত্বনা দেবো। আমরা কেউই ভালো বুঝি না। আম্মার প্রতিটা রাত কাটে বুবনের জন্য হাহাকার করে। আম্মা আজকাল একদম খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। আব্বা ভাতের লোকমা পাকিয়ে মুখে তুলে দিতে চাইলে ' উনি বটি দা এনে নিজের গলায় চেপে ধরেন। আমরা ভয়ে চিৎকার করে কান্না শুরু করি। আব্বা বাইরে বের হয়ে যান।

আব্বা ডুব দিয়েছেন। বাড়ি ফিরছেন না প্রায় একমাস হয়ে গেছে। একদিন রাতে আমাদের বাসায় পুলিশ এলো। আমাদের ঘরের সব জিনিসপত্র উলটে পালটে দেখে চলে গেলো। আম্মাকে ডেকে কী কী জিজ্ঞেস করলো কে জানে? এর দুদিন পরেই আমরা আমাদের এলাকা ছেড়ে জুড়াইন চলে এলাম। আম্মা এক রাতে
চুপচাপ মারা গেলেন। আমি তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি। আম্মার খুব শখ ছিল আমি কলেজে পড়ি।
তার আগেই আম্মাকে কবরে শুইয়ে দিয়ে এলাম।

আমার রেজাল্ট বের হবার দুইদিন আগে আব্বা ফিরলেন। আব্বা এবারে একটা দোকান দিলেন। ছোট্ট ষ্টেশনারী দোকান। আমরা এখন জানি আব্বা কী করেন। আমাদের দোকান বেশ ভালো চলছিল। আমি কলেজ ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করলাম। তন্ময় কলেজ পাশ দিয়ে এখানে ওখানে ব্যবসা করে বেড়ায়।
তনিমাকে সে ধুমধাম করে বিয়ে দিল।

আমার চাকরিবাকরি কিছু হয়নি। আব্বার দোকানে বসছি আজকাল। এই সময়ে সদ্য গোঁফের রেখা ওঠা এক তরুণ আমার দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো।
সাথে এক বয়স্ক ভদ্রলোক। সে আব্বাকে খুঁজছে।

আমি কী ভেবে জিজ্ঞেস করলাম - উনাকে কীভাবে
চেনেন? ছেলেটি একবারও দ্বিধা না করে উত্তর দিল।
উনি আমার আব্বা। আম্মা মারা যাওয়ার পরে আমার অবাক হবার ক্ষমতা চলে গিয়েছিল। আমি ছেলেটির মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে বুঝলাম। ছেলেটা 'বুবন। '

আমি বুবনের হাত ধরলাম। ওর ঠোঁট কাঁপছে। আমি বুবনকে আব্বার কাছে নিয়ে গেলাম।

পিরদিন এয়ারপোর্ট দাঁড়িয়ে আছি। আব্বা থরথর করে কাঁপছেন।

বুবন আব্বাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।

- আব্বা আপনি না চাইতেন, আমি বিজ্ঞানী হই !
আমি আপনার স্বপ্ন পূরণ করতে আমেরিকায় পড়তে যাচ্ছি আব্বা। আমি আপনার স্বপ্ন পূরণ করে ফিরে আসবো আব্বা। ততদিন আপনি শুধু বেঁচে থাকবেন।
আমাকে কথা দিন আব্বা।

আমার আব্বা কথা দিলেন, তিনি বেঁচে থাকবেন।
এই হচ্ছে আমাদের আব্বা। যিনি অভাবের তাড়নায়
অন্যের পকেট কাটতেন। ধরা পড়ে মাঝেমাঝে গণপিটুনি বা পুলিশের মার খেতেন। বছরে অন্তত দুইবার কারাবাস করতেন। একদিন তিনি একটি শিশু কুড়িয়ে পান। তারপর বহু কষ্টে সেই ছেলের ঠিকানা খুঁজে তার বাবা মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেন।

ভদ্রলোক এসে বুবনের হাত ধরেন। আব্বাকে বলেন -
দোয়া করো।

আমার আব্বা তার পবিত্র দুই হাত তুলে 'তার সন্তানদের জন্য দোয়া করলেন। '

বাবার_হাত
নিতু ইসলাম।
ছবি: সংগৃহীত

যারা প্রতিদিন এমন অসাধারণ সব গল্প পড়তে চান,,তারা পেজটা ফলো করে রাখতে পারেন। আমি কথা দিলাম পেজের গল্পগুলা আপনাদের মন ছুঁয়ে যাবে ❤️

Address

Gaffargaon

Telephone

+8801733302533

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Md OMAR FARUk posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share