30/04/2023
শ্রমিকদের আত্মত্যাগের মে দিবস....
আজ আমরা সবাই মে দিবসকে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন, আত্মত্যাগের দিন হিসেবে পালন করি। অথচ আপনারা জানেন কী, একটা সময় এই দিনটির ইতিহাস ছিল একেবারেই অন্যরকম
প্রাচীন কাল থেকে মে দিবস ছিল প্যাগান সম্প্রদায়ের বাৎসরিক উৎসবের দিন। এখনও ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে ১লা মে শ্রমিক দিবস পালনের পাশাপাশি মে দিবসে উৎসব করা হয়।
কিন্তু মে দিবসে শ্রমিকদের আত্মত্যাগের দিবস হয় কীভাবে?
এর পিছনে রয়েছে এক বিশাল ইতিহাস। ১৮ শতকে (১৮ শতক মানে ১৭০০-১৭৯৯ সাল) পৃথিবীতে শিল্প বিপ্লবের পর যান্ত্রিক সভ্যতার এত উন্নতি হয়েছিল যে, কৃষিজীবী মানুষ হয়ে যায় যন্ত্রনির্ভর। বিশাল বিশাল কল-কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিককে মালিকপক্ষ বেশি মুনাফার আশায় অমানুষিকভাবে খাটাতে লাগে। দিনে ১৮ ঘণ্টা-২০ ঘণ্টা কাজ করাতে থাকে, কিন্তু বেতন দিতো খুবই কম। শ্রমিকরা প্রতিবাদ করতে শুরু করে। আর মালিকরাও বিদ্রোহী শ্রমিকদের উপর শুরু করে অত্যাচার।
এই শ্রমিক বিদ্রোহে সেই সময় অকাতরে প্রাণ দিয়েছিলেন অসংখ্য শ্রমিক। তাদের আন্দোলনের মূল দাবি ছিল—একজন শ্রমিক দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা কাজ করবে, এর বেশি নয়। মালিকরা শ্রমিকদের দাবি উপেক্ষা করায় ১৮৮৬ সালের ১লা মে আমেরিকার শিকাগোতে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল এই শ্রমজীবী মানুষেরা।
প্রথম দিনে পুলিশ বাধা দিলেও প্রায় সাড়ে ৩ লাখ শ্রমিকের প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছিল নির্বিঘ্নেই। কিন্তু ৩রা মে ধর্মঘট আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। ম্যাক করমিক নামের এক প্রতিষ্ঠানের ফসলকাটা শ্রমিকরা পুলিশের মোকাবেলা করেই শ্রমিক সভা করে। আর সভা চলার সময়ে পুলিশ সভাস্থলে নির্বিচারে গুলি করে। ওখানেই মারা যায় ৬ জন শ্রমিক, এবং আহত হয় অনেকেই।
এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ৪ঠা মে ‘হে’ মার্কেট চত্তরে বিশাল এক শ্রমিক সমাবেশ ডাকা হয়। আর সেখানে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের উপর কে বা কারা রহস্যজনকভাবে বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ নির্বিচারে গুলি আর লাঠিচার্জ করতে লাগে। এতে ৪ জন শ্রমিক নিহত হন। পুলিশ আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ১৬ জনকে গ্রেফতার করে, বিচারের নামে প্রহসনে তাদের ৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৬ জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। ফলে পুরো বিশ্বের শ্রমিকরাই এবার ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। শিকাগোর এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী।
১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের একটি সম্মেলন। তাতে শ্রমিকদের দৈনিক কাজের সময় ৮ ঘণ্টা ও সপ্তাহে ১ দিন ছুটির বিধি রেখে তৈরি হয়েছিল প্রথম শ্রম আইন। আর ১৮৮৯ সালের ১৪ই জুলাই আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত হয় ১লা মে শিকাগোর আন্দোলনে প্রাণ দেয়া শ্রমিকদের স্মরণে মে দিবস পালন করার। তারপর থেকেই ১লা মে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে শিকাগোতে আত্মত্যাগ করা শ্রমিকদের স্মরণে মে দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
মহান মে দিবসে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে আত্মউৎসর্গকারী শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা...
(সংগ্রহীত)